ইতিহাস ঐতিহ্যে সমৃদ্ধ এক দেশ। আফ্রিকার সোমালিয়া। শান্তি ও সমৃদ্ধিতে আফ্রিকার সুইজারল্যান্ড নামে পরিচিত ছিল সোমালিয়া। কিন্তু আজ সেই দেশ এক বিভীষিকার নাম। সোমালিয়ার নাম শুনলেই সবার চোখে ভাসে যুদ্ধ বিগ্রহ আর জলদস্যুদের কথা।
সোমালিয়ার ইতিহাস
প্রাচীনকালে সোমালিয়া ছিল একটি জরুরি বাণিজ্যিক কেন্দ্র। মধ্যযুগে বেশ কয়েকটি সোমালি সাম্রাজ্য আঞ্চলিক বাণিজ্যের নেতৃত্ব দিত। এর মধ্যে আজুরান সাম্রাজ্য, আদেল সালতানাত, ওয়ারসাংগালি সালতানাত ও গেলেদি সালতানাত উল্লেখযোগ্য।
ষাটের দশকে ‘আধুনিক সোমালিয়া’র কাহিনী ছিল স্বাধীনতা, সমৃদ্ধি ও গণতন্ত্রের।
কিন্তু ১৯৬৯ সালে দেশটির দ্বিতীয় প্রেসিডেন্ট আলী শারমার তারই দেহরক্ষীদের হাতে নিহত হন এবং সোমালিয়া পার্লামেন্টের স্পিকার মুখতার মোহামেদ হুসেইন প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব নেন। তবে ছয় দিনের মাথায় জেনারেল সিয়াদ বারের নেতৃত্বে সংঘটিত হয় এক সামরিক অভ্যুত্থান। মূলত তখনই অবসান ঘটে সোমালিয়ার গণতান্ত্রিক যুগের। দেশটিতে সামরিক স্বৈরাচারী শাসন চলে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত।
সামরিক স্বৈরাচারী শাসনের সময়েই দেশটিতে শুরু হয় গৃহযুদ্ধ। ছিন্নভিন্ন হয়ে যায় দেশটির সমাজ। লাখ লাখ মানুষ সর্বস্ব হারিয়ে আশ্রয় নেয় উদ্বাস্তুশিবির অথবা প্রতিবেশী বিভিন্ন দেশে। অনেকে শরণার্থী হয়ে চলে যায় বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে।
এরপর থেকেই উথান হয় সোমালিয়ার উপকূলে জলদস্যুতা।
সোমালিয়ার জলদস্যুদের উত্থান
১৯৯১ সালে সাবেক স্বৈরশাসক মোহাম্মদ সিয়াদ বারের পতনের পর থেকেই অরাজকতায় ভেঙে পড়ে সোমালিয়া। একবিংশ শতকের প্রথম দিকে সোমালিয়ার গৃহযুদ্ধের দ্বিতীয় পর্যায় থেকে আন্তর্জাতিক জাহাজগুলোর জন্য হুমকি হয়ে উঠেছে সোমালিয়ার জলদস্যুরা।
জাতসিংঘের ও বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের উৎস থেকে জানা যায় সোমালিয়া উপকূলে জলদস্যুতা মূলত এই উপকূলে অবৈধভাবে মাছ ধরার ফলে সৃষ্টি হয়েছিল। ডিআইডব্লিউ এবং মার্কিন হাউজ আর্মড সার্ভিসেস কমিটির মতে, বিদেশী জাহাজ থেকে সোমালি উপকূলে বিষাক্ত বর্জ্য ডাম্পিং করার ফলে স্থানীয়দের পরিবেশ বসবাসের জন্য হুমকি হয়ে উঠেছিল।
এর প্রতিবাদে স্থানীয় জেলেরা সশস্ত্র দলে বিভক্ত হয়ে বিদেশী জাহাজ এ অঞ্চলে প্রবেশ বন্ধ করার চেষ্টা করে। পরবর্তীতে বিকল্প আয় হিসেবে তারা বিদেশী বাণিজ্যিক জাহাজ মুক্তিপণের জন্য ছিনতাই শুরু করে।
২০০৯ সালের ওয়ার্ডিরনিউজ কর্তৃক পরিচালিত এক জড়িপে দেখা যায় প্রায় ৭০ শতাংশের মত উপকূলবর্তী সম্প্রদায় দেশের জলসীমার মধ্যে বিদেশী জাহাজের প্রবেশ বন্ধে জলদস্যুতাকে শক্তভাবে সমর্থন করে। এমনকি সোমালিয়ার কিছু কিছু সরকারি কর্মকর্তা জলদস্যুদের এ কুকর্মের সাথে জড়িত বলেও জানা গেছে।
উইকিপিডিয়ার তথ্যমতে, ২০১১-এর শেষ দিকে জলদস্যুরা এডেন অঞ্চল থেকে চারটি জাহাজ সোমালিয়ার উপকূলে জিম্মি করে নেয়। এছাড়া ১৮ই অক্টোবর ২০১৩ সালে জলদস্যুরা একটি বড় জাহাজ ছিনতাই করে এবং ৫২ জনকে বন্দি হিসেবে আটক রাখে।
২০০৫ সাল থেকে, ইন্টারন্যাশনাল মেরিটাইম অর্গানাইজেশন এবং বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচীসহ অনেক আন্তর্জাতিক সংস্থা সাগরপথে জলদস্যুতা ঘটনা বৃদ্ধির উপর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
জলদস্যুদের আক্রমণ ও মুক্তিপণ আদায়ের প্রক্রিয়া
২০০৫ সালের পর থেকে সোমালিয়ান জলদস্যুরা সংঘবদ্ধ হয়ে বৃহৎ পরিসরে আক্রমণ শুরু করে। সমুদ্র বিষয়ে পর্যাপ্ত জ্ঞান ও দক্ষতার কারণে তারা কেবল ক্ষিপ্রগতিতেই নয় বরং আধুনিক অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত হয়ে হানা দেয়। যা তাদের দস্যুবৃত্তিতে অনেকটাই এগিয়ে নিয়েছে।
আক্রমণের সময় হিসেবে তারা মূলত রাত কিংবা ভোরের দিকটাকেই বেছে নেয়। জলদস্যুরা বড় জাহাজগুলোর কাছে পৌঁছাতে ছোট ছোট মটর চালিত নৌকা ব্যবহার করত। যা দ্রুত গতির পাশাপাশি বড় জাহাজের রাডারে সহজে ধরা পড়ে না।
অতীতের আক্রমণগুলো বিশ্লেষণ করে জানা যায়, জলদস্যুরা সাধারণত জাহাজগুলোর পেছন দিক থেকে আক্রমণ চালায়। এক মাথায় হুক লাগানো লম্বা দড়িতে চেপে তারা দ্রুত জাহাজে উঠে যায়। যা মূলত জাহাজের পেছন দিকে লাগানো হুকের সঙ্গে আটকানো হয়।
এই কাজগুলো তারা এত দ্রুত করে যে জাহাজের ক্রুরা কিছু বুঝে ওঠা কিংবা এলার্ম বাজানোর আগেই তারা পরিস্থিতি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেয়। তাছাড়া গভীর সমুদ্রে আক্রমণ সাজানোর সময় তারা একটি মাদারশিপ থেকে অভিযান পরিচালনা করে।
বিদেশি সংবাদমাধ্যমগুলোর দাবি, জলদস্যুদের কার্যক্রম পরিচালনার জন্য দস্যুদের ব্যবহৃত অস্ত্রশস্ত্রের মধ্যে রয়েছে- AK47, AKM, Type56, TT33, RPK, RPG-7 এবং PK, তাছাড়া RGD-5 ও F1 এর মতো শক্তিশালী হাত বোমাও তারা ব্যবহার করে থাকে।
বন্দিদের কাছ থেকে জলদস্যুরা মূলত ইউএস ডলারের মাধ্যমে মুক্তিপণ আদায় করে। এসব মুক্তিপণের অর্থ পরিশোধের জন্য মূলত তা বস্তায় ভরে হেলিকপ্টার থেকে ফেলে দেওয়া হয় বা ছোট নৌকায় করে ওয়াটার প্রুফ ব্যাগের মাধ্যমে পাঠানো হয়। এমনকি মাঝে মধ্যে প্যারাসুটের মাধ্যমেও এই মুক্তিপণের টাকা জলদস্যুদের কাছে পৌঁছানো হয়।
জলদস্যুতা নাকি ব্যবসা
সেমালিয়াতে জলদস্যুতা এখন বিশাল বাণিজ্যে পরিণত হয়েছে। অন্যান্য দেশে থাকা সোমালিরা এই ব্যবসায় বিপুল পরিমাণে বিনিয়োগ করেও থাকে।
অভিযোগ রয়েছে সোমালিয়ার সেনাবাহিনী, কোয়ালিশন সরকারের মন্ত্রি ও নেতারা এমন কি অন্যান্য দেশের বড় বড় ব্যাবসায়ি এই লুটের টাকার ভাগ পেয়ে থাকে।
ধারণা করা হয়, জলস্যুদের মুক্তিপণের অর্থায়নে সেখানে উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে ঘটছে ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার। গড়ে উঠছে বিলাসবহুল হোটেল। দেশটির অন্যান্য অংশ থেকেও বিনিয়োগকারীরা সেখানে অর্থ খাটাচ্ছে। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, জলদস্যুতা এখন সোমালিয়ার অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি।
শুরুতে জাহাজ জিম্মির ক্ষেত্রে কিছু অস্ত্র ও মাছ ধরার নৌকা ব্যবহৃত হলেও পরবর্তীতে মুক্তিপণ থেকে অর্থ অর্জনের পাশাপাশি অভিজ্ঞতার সাথে সাথে সোমালিয়ান জলদস্যুরা স্পিডবোট, ট্র্যাকিং ডিভাইস এবং আরও শক্তিশালী অস্ত্র ব্যবহার করছে।
বিশাল মুনাফার কারণে সোমালিয়ার অনেক যুদ্ধবাজ গোত্র নেতারাই সুসংগঠিত উপায়ে শুরু করেছে জলদস্যু ব্যবসা। দলে দলে দরিদ্র জেলে ছেলেরা জলদস্যু দলে নাম লেখানোর জন্য উঠে পড়ে লেগেছে। তবে এই ব্যবসার আসল লোকজনেরা রয়েছে পর্দার অন্তরালে। অন্যসব ব্যবসার মতই সম্মুখসারির জলদস্যুদের হাতে টাকার খুব সামান্য অংশই যায়। বেশিরভাগ অংশটাই চলে যায় নেপথ্যের হোমড়া চোমড়াদের কাছে।
তথ্যসূত্র: উইকিপিডিয়া ও ইন্টারনেট
‘টাকা না দিলে আমাদের একজন একজন করে মেরে ফেলবে’
জিম্মি হওয়া বাংলাদেশি জাহাজে ২৫ দিনের খাবার আছে
যেভাবে জলদস্যুরা বাংলাদেশি জাহাজ নিয়ন্ত্রণে নেয়