‘তথ্য চাইতে গিয়েছিলাম ভিক্ষা চাইতে নয়’

আপডেট : ১৮ মার্চ ২০২৪, ০৫:৫১ পিএম

তথ্য চাইতে গিয়ে কারাবাসে যাওয়া দেশ রূপান্তর পত্রিকার শেরপুরের নকলা সংবাদদাতা শফিউজ্জামান রানা বলেছেন, ‘সরকারি অর্থের খরচের তথ্য চাওয়া তো কোনো অপরাধ নয়, সাহায্য বা ভিক্ষা নয়। কিন্তু একজন সংবাদকর্মী হিসেবে তথ্য চাইতে গিয়ে কারাগারে পাঠিয়ে আমার সঙ্গে অবিচার করা হয়েছে।’

গত ৫ মার্চ নকলায় একটি প্রকল্পের ক্রয়সংক্রান্ত তথ্য পেতে তথ্য অধিকার আইনে স্থানীয় নকলা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সাদিয়া উম্মুল বানিনের কাছে আবেদন করেন রানা। রিসিভ কপি না দিয়ে তার বিরুদ্ধে অসদাচরণের অভিযোগ তোলে ভ্রাম্যমাণ আদালত বসিয়ে দন্ডবিধির দুটি ধারায় ছয় মাসের কারাদন্ড দেন নকলা উপজেলা সহকারী কমিশনার শিহাবুল আরিফ। এ সাজার বিরুদ্ধে জেলা প্রশাসনে আপিল ও জামিনের আবেদনের পর গত ১২ মার্চ তিনি জামিন পান। তাকে কারাবাসে পাঠানোর ঘটনায় দেশ জুড়ে সমালোচনার ঝড় ওঠে।

কারামুক্তির পর গতকাল রবিবার দেশ রূপান্তরের বাংলা মোটর কার্যালয়ে আসেন রানা। কার্যালয়ে প্রতিষ্ঠানটির সব পর্যায়ের কর্মীদের সঙ্গে মতবিনিময় ও গত ৫ মার্চ থেকে তার সঙ্গে ঘটে যাওয়া বিভিন্ন পরিস্থিতি তুলে ধরেন। তিনি ঘটনার পর থেকে তার পাশে থাকার জন্য দেশ রূপান্তরকে ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানান। এ সময় আরও উপস্থিত ছিলেন দেশ রূপান্তরের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক মোস্তফা মামুন, বার্তা সম্পাদক শাহ আলম বাবুল, প্রধান প্রতিবেদক আশরাফুল হক রাজীব, মফস্বল সম্পাদক খালিদ হাসান নিয়াজ, দেশ রূপান্তরের শেরপুর প্রতিনিধি শফিউল আলম সম্রাটসহ প্রতিষ্ঠানটির বিভিন্ন বিভাগের বিভাগীয় প্রধানরা।

রানা বলেন, “নানা প্রকল্পে কেনাকাটার নেতিবাচক সংবাদ পেয়ে আমি গিয়েছিলাম তথ্য চাইতে। কিন্তু তারা আমাকে তথ্য দেওয়া তো দূরে থাক, ন্যূনতম সহযোগিতা করতে ইচ্ছুক ছিল না। আমাকে জেলে পাঠানোর হুমকি দেওয়া হয়। সন্তানের সামনে আমাকে চোর সম্বোধন করা হয়। আমার এসএসসি পরীক্ষার্থী ছেলেকেও ‘বাপের মতো চোর হবি’ বলে মন্তব্য করেন ইউএনও। মনে হচ্ছিল, আমি যেন তথ্য চেয়ে বড় ধরনের অপরাধ করেছি। তাদের কাছে সাহায্যের জন্য এসেছি। আমি বললাম, আমি তো তথ্য চাইতে এসেছি, ভিক্ষা চাইতে নয়। আপনারা সরকারি অর্থের খরচ করবেন। কীভাবে করলেন, কোন উপায়ে সেগুলো জানা তো অপরাধ নয়। আমরা কি তা লিখতেও পারব না?”

তিনি বলেন, ‘আমাকে জেলে পাঠিয়েও তারা ক্ষান্ত হননি। আমার নামে নানা কুৎসা রটনা করা হয়েছে। বিভিন্নভাবে হেনস্তা করার চেষ্টা করা হয়েছে। মানববন্ধন হয়েছে। একটি নামকরা প্রতিষ্ঠিত পত্রিকার সংবাদদাতা হিসেবে কাজ করলেও আমাকে ভুয়া সাংবাদিক বলে দুর্নাম রটানো হয়েছে। আমার আশ্চর্য লেগেছে যে, আমি মফস্বলের সাংবাদিক। কিন্তু প্রশাসনের আচরণে মনে হয়েছে, আমি কত বড় সাংবাদিকে পরিণত হয়েছি! তারা আমাকে জেলে পাঠিয়েছে। দেশে কি আমার চেয়ে বড় সাংবাদিক নেই। এর মানে হলো, আমার তথ্য চাওয়াই তাদের কাছে অপরাধ বলে মনে হয়েছে। এখন তথ্য চাইলেও জেলে যেতে হবে। এই হলো সাংবাদিকতার পরিস্থিতি।’

রানা বলেন, ‘আমি খুব দ্রুত জামিন পাব, এমন সম্ভাবনা দেখছিলাম না। আবার আশাবাদীও ছিলাম যে, আমি নিজের অবস্থানে ঠিক থাকি তাহলে আমার প্রতিষ্ঠান পাশে থাকবে। যেহেতু নিজের বিষয়ে নিশ্চিত ছিলাম, আশাবাদী হওয়ার মতো আলোও দেখছিলাম। সবচেয়ে বড় কথা হলো, আমার প্রতিষ্ঠান দেশ রূপান্তর যেভাবে এগিয়ে এসেছে তাতে আমার আত্মবিশ্বাসটা বেড়ে যায়। এই কয়েক দিন প্রতিষ্ঠান আমার ও আমার পরিবারের সার্বক্ষণিক খোঁজ নিয়েছে। তাদের তৎপরতায় মাত্র ছয়-সাত দিনের মধ্যে আমি জামিনে ছাড়া পেয়েছি।’ তিনি জানান, সাজার বিরুদ্ধে জেলা প্রশাসনে করা আপিল এখনো বিচারাধীন। এটি যেন নিষ্পত্তি করে দ্রুত তাকে অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়।

দেশ রূপান্তরের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক মোস্তফা মামুন বলেন, ‘মফস্বল সাংবাদিকতায় নানা সমস্যার কথা আমরা শুনি। কিন্তু একজন মফস্বল সংবাদকর্মী তথ্যের জন্য আইনের বিধান মেনে আবেদন করেছেন। এটি আশাব্যঞ্জক ও দায়িত্বশীলতার পরিচায়ক হলেও অভিযোগ তুলে ভ্রাম্যমাণ আদালত বসিয়ে জেলে পাঠানো খুবই ভয়ংকর। এর মানে হলো, সাংবাদিকদের জন্য তথ্য চাওয়া বা আদায়ের পরিস্থিতিটি বিপজ্জনক পর্যায়ে রয়ে গেছে। এর মধ্যে ভ্রাম্যমাণ আদালত ব্যবহারের পদ্ধতি শঙ্কা আরও বাড়িয়ে দেয়।’ তিনি বলেন, ‘সাংবাদিকতায় সমস্যা ও বিপদ থাকবেই। তবে মোকাবিলার জন্য প্রয়োজন সততা ও ধৈর্য। একই সঙ্গে তথ্য আদায়ের ক্ষেত্রে অনাকাক্সিক্ষত পরিস্থিতি এড়াতে সাংবাদিকদের কৌশলীও থাকতে হবে।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত