ব্যাগ গোছাতে গোছাতে মোহনা জীবনটাকে কবিতার মতো ভাবে। গানের কলি গুনগুন করে। এখানে কোনো অঙ্ক নয় ভূগোল নয়। নব্বই ভাগ আবেগে যার জীবন চলে। যদিও মাঝে মাঝে সে খুব একরোখা। সিদ্ধান্ত নেওয়ার বেলায় একাই নেয়। দুই বোনের মধ্যে মোহনা ছোট। আহ্লাদী। অন্যের পরামর্শ শোনে কিন্তু নেয় না। মাস্টার্স শেষ করে নতুন চাকরি পেয়ে মন ফুরফুরে দিন কাটছে তার। কষ্ট যে কিছু নেই তা না। সেগুলো তার মেঘলা দিন। মেঘগুলো খুশির হাওয়ায় উড়িয়ে দেয়। খুব তাড়াতাড়ি সব কষ্ট আনন্দের জোয়ারে ভাসিয়ে দেয়। তার সঙ্গে যোগ হয়েছে ফেসবুক। বাতাসে বাতাসে বেশ কিছু সময় কাটে। বাতাস থেকে পাওয়া গেল সুদর্শন বন্ধু চমক নজরকে। নামটা অদ্ভুত লেগেছিল বলেই রিকোয়েস্ট একসেপ্ট করেছিল কিন্তু পরে জেনেছে সে নামটা ছদ্ম নয়। তারপর কত কথা কত দিন রোদে মেঘে মাখামাখি। চাকরি নিয়ে চমক বিষন্ন থাকে মাসের ঊনত্রিশ দিন। একদিন ফোনে কথা বলে কয়েকদিন খবর নেই। দেখা খুব একটা হয় না তাদের বিশেষ কোনো দিন ছাড়া। মোহনার তবু কেন যেন মায়া জন্মেছে এই নির্লিপ্ত মনোভাবের মানুষটাকে। আজকাল তো মানুষের ওপর নির্ভর করা যায় না। মুহূর্তের মধ্যে মন বদলে ফেলে। সেদিক থেকে মনে হয় নজর অতটা খারাপ হবে না। মোহনার রাগ ভাঙায়। বাইরে বেড়াতে নিয়ে যায় হঠাৎ কখনো। অতটা যুগ চলতি নয় সে। বয়সের চেয়ে চলনে বলনে ভারীক্কি ভাব বেশি। ওর প্রেমটা উচ্ছ্বাস নয় বন্ধুত্বপূর্ণ। একটু যেমন রাখো ঢাকো ভাব। মোহনার এটাও ভালো লাগে। অত হ্যাংলামো তারও পছন্দ নয়। দুজন কবিতা ভালোবাসে। এটা তাদের সবচেয়ে বড় মিল।
হঠাৎ মনে হলো সম্পর্কটা স্থায়ী হলে কেমন হয়? দুজনে এটা নিয়ে কথা বলেছে। মা-বাবা এই ডিভোর্সি ছেলেকে পছন্দ যে করবে না এটা জানা কথা। তবুও মোহনা মাকে বলেছে সব।
মা তো সবটুকু শোনার আগেই পানির কল বন্ধ করে দেওয়ার মতো বলেছেন, এবার থামো। একটু বাস্তবতা শেখো।
মানে? তুমি ছেলেটা সম্পর্কে আগে জানবে তো নাকি?
এখানে আমার ‘না’ থাকল। অন্য চিন্তা করো। বাকিটুকু শোনার দরকার নেই। কয়দিন মুখ কালো। হতাশা। অফিসে মন বসে না বাসায়ও ভালো লাগে না। চমক শুনেছে। তারও নিশ্চয়ই ভালো লাগছে না। তবে সিদ্ধান্ত নিতে বলেছে। মাকে বোঝানো গেল না মনকেও শাসন করা গেল না। আপাতত বাবা এই ঘটনার নেটওয়ার্কের বাইরে। বড় বোন সোহানা অনেক বোঝালো। এমনকি নিজের জীবনের একটা অজানা কথাও এতদিনে বলল তাকে। শুনে মোহনা রাগ করল বোনের ওপর। তোমরা সব অঙ্ক এক ফর্মুলায় করতে চাও। এজন্যই হিসাব মেলে না। বিস্ময়ে ছোট বোনের দিকে তাকায় সোহানা, তুই আমাদের আদরের বোন। জীবনের একপিঠ শুধু দেখেছিস। আমতলা বটতলা আর ছাদ এক নয়।
: আমার সিদ্ধান্ত পাল্টাতে পারছি না সরি।
: ডিভোর্সের অনেক কারণ থাকে রে মোহনা যা বাইরে থেকে বোঝা যায় না। তবে ডিভোর্সটা বড় বিষয় নয়। তাকে চেনার জন্য তুই আরও সময় নে। সিদ্ধান্ত তোরটা তুইই নিস। ভালো বন্ধু হলেই ভালো স্বামী হবে এটা বলা যায় না। ডিভোর্সের অনেক কারণ থাকে। কিছু দোষের সঙ্গে সে জড়িত থাকেও বটে। গোপন করা মানুষের অভ্যাস। সব কথা মানুষ প্রকাশ করে না। সবকিছু তোকে বলেছে এটা তুই ভাবিস না। জীবনটা আবেগ নয়। একটু ভেবে দেখ। কারও সমর্থন না পেয়ে মোহনা খুব বিরক্ত হলো, রাগ হলো।
সিদ্ধান্ত নিয়েই বের হয়েছে মোহনা। দুজনই ছুটি নিয়েছে এক সপ্তাহ। দুজন কমলাপুর রেলস্টেশনে গিয়ে দুপুরে উপস্থিত হবে। টিকিট করা আছে। মোহনা সময়মতো পৌঁওছ গিয়েছে স্টেশনে। তখনো চমক আসেনি। বারবার ঘড়ি দেখে। যাত্রীদের ব্যস্ততা দেখে। চমককে ফোন করে জানতে পারল সে যানজটে পড়েছে। বারবার ফোন করছে ঘড়ি দেখছে । দুশ্চিন্তা বাড়ছে। না চমক আসেনি। ট্রেন ফেল। ট্রেন চলে যাওয়ার বেশ কিছুক্ষণ পর চমক স্টেশনে এসেছে। অনেকবার সরি বলল। মুখ ফুলিয়ে বসে আছে মোহনা। এখন কী হবে? যাওয়া হলো না। ব্রহ্মপুত্রের পাড়ে দুদিন কাটানোর কথা ছিল। বিয়ে করে বন্ধুদের বাড়িতে দুদিন কাটিয়ে রাঙ্গামাটি দুদিন। তারপর ঢাকা। সব ওলট-পালট হয়ে গেল।
: এখন কী হবে বলো?
মাথায় কোনো বুদ্ধি আসছে না, চমক বলে।
মোহনা ভাবছে মা-বাবা, বাসার পরিবেশ, রাতে না গেলে কী হতে পারে, ফিরলে কখন ফেরা উচিত। ব্যাগ নিয়ে দাঁড়ায়। রেলস্টেশনে এর চেয়ে বেশি আর বসে থাকা ঠিক হবে না। মোহনা দাঁড়াতেই চমকের অন্তরাত্মা কেঁপে উঠল। সে দাঁড়িয়ে খপ করে মোহনার হাতটা ধরে ব্যাগ ধরে, প্লিজ যেয়ো না।
: তো কী করব স্টেশনে বিয়েটা সেরে নেব? আগুন চোখে কথাটা বলে।
: দেখো অফিসে অনেক কাজ ছিল।
মোহনা দাঁড়ায়।
আমার দিকটা একবার ভাব।
: আর ভাবার দরকার নেই। এ পর্যন্ত যতদিন কোথাও যাওয়ার কথা হয়েছে ততদিন তুমি হয় দেরি করেছ। নয়তো প্রোগ্রাম ক্যান্সেল করেছ। এমনকি আসবে না এ কথাটা জানাওনি পর্যন্ত। তবু আমি কিছু মনে করিনি। কিন্তু আজ একটা চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়ে বের হয়েছি।
আজকের দিনেও এমনই হলো?
প্লিজ এখন মাথা ঠান্ডা করে বসো। একটা সমাধান দরকার।
: নিজের বুদ্ধিতে করো।
: ঠিক আছে চলো দুটো মিনিট বসি। এখন হয়তো কোনো ট্রেনের সময় নয়। খুব একটা লোকজন দেখা যাচ্ছে না। একটা জায়গা খুঁজে দুজন বসল। কিছুক্ষণ পর কথা বলে চমক, আজ রাতটা ঢাকায়
থাকতে হবে। কাল ভোরে চলে যাব সুনামগঞ্জে। হাওরে হাওরে ঘুরে কাটাব কদিন।
: সত্যি বলছ! চোখ চকচক করে উঠল।
: হ্যাঁ ওখানে বিয়ে করব। ওখানেই আমাদের মধুচন্দ্রিমা হবে।
মুখ কালো করে মোহনা বলে, কিন্তু আজ রাতটা?
: ভয় নেই।
: মানে? আমি বলতে চাচ্ছি থাকব কোথায়?
: ভেবে ভেবে এখন মাথায় একটা বুদ্ধি এলো, বিশেষজ্ঞের মতো বলে চমক।
: কী বুদ্ধি?
: বড় আপুর বাসায় থাকব।
চোখ আকাশে তুলে মোহনা বলে, না না না।
: আরে ভয় পেয়ো না। আপু দেশের বাইরে গেছে লম্বা সময়ের জন্য। বাসায় আছে পুরনো মানুষ উদ্ধার আলী মামা। বুড়ো সহজ সরল মানুষ। কোনোভাবে ম্যানেজ করে নেব। চলো ওখানে বসেই বাকি প্ল্যান করব। চলো চলো। হাত ধরে টান দেয় মোহনাকে। তারপর দুজন হাঁটতে থাকে স্টেশন থেকে বের হওয়ার গেটের দিকে। গুলশানে চমকের বড় বোনের ফ্ল্যাট। পৌঁছতে ওদের সন্ধ্যা মিলিয়ে গেল প্রায়। ক্লান্ত ক্ষুধার্ত দুজন কিনে আনা খাবার বের করে বসে। চমক একবার গিয়ে উদ্ধার আলী মামাকে কী কী বলে আবার ফিরে এলো। সব রুমের দরজা বন্ধ। দুটো রুম খোলা। বিরাট বাড়ির বসার ঘরে ফ্লোরে উদ্ধার আলী বসে টিভি দেখছিল।
মোহনা ও চমক ফ্রেশ হয়ে আগামীকালের প্ল্যান করছে। এমন সময় উদ্ধার আলী এসে বলে গেল, আপনাদের সব ঠিকঠাক করে দিয়েছি। আমি ঘুমাতে গেলাম। টেবিলে খাবার সাজিয়ে রেখেছি। কিছু লাগলে ডাকবেন। ৯টার পর আমি জাগতে পারি না। চমক বলে, আচ্ছা আচ্ছা ঠিক আছে। কিছু লাগলে বলব মামা।
মোহনাকে বলে, চলো খেয়ে নিই।
বলেই হঠাৎ করে ওঠে ক্লজেট খুলে।
: কী হলো ওটা খুলছ কেন?
: আপুর জিনিস তো অসুবিধা কী? দেখি না কাঁথা কম্বল কিছু আছে কি না।
: মামাকে বলে।
: না মামা ঘুমিয়ে যাক। এখানেই কাঁথা কম্বল থাকে। মোহনা কিছু বলে না। ব্যাগ থেকে নাইট ক্রিম বের করে। এমন সময় জোরে চমক বলে ওঠে, আরে দেখো দেখো কত টাকা এখানে। আপাটা যে কী! ক্লজেটে তালা পর্যন্ত দেয়নি। এতগুলো টাকা রেখে উফ্!
: রাখো তো। যেখানে যেভাবে ছিল রেখে দাও। কিচ্ছু ধরার দরকার নেই।
রেখে দিতে দিতে কী যেন ভাবে চমক আবার হাতে নেয় টাকাটা। বলে, আমি গুনব। দেখব কত আছে। চমক দরজা বন্ধ করে এসে টাকার তোড়াটা হাতে নিয়ে বিছানায় বসে গুনতে শুরু করে। বিরক্ত হয়ে মোহনা বলে, আচ্ছা কাজটা কি ঠিক হচ্ছে? মোহনা দূরে চেয়ারে বসে তাকিয়ে আছে। চমক মনে মনে বলে, মোহনা এমন করছে কেন? বোনটা তো আমার। টাকা গুনছি আমি। ওর এত সাধুপনার কী কারণ?
: তুমি না হয় খেতে যাও। আমি টাকাটা গুনে গুছিয়ে রেখে আসি।
: এটা কেমন কথা? কষ্ট ঝরে পড়ে কথায়।
মোহনা টেবিল থেকে একটা গল্পের বই নিয়ে পাতা ওল্টাতে থাকে আর মনে মনে কেমন অস্থিরতা বোধ করে। চমকের দিকে সে তাকায় না মনোযোগও দেয় না। টাকা গুনে গুছিয়ে রেখে চমক এসে বিছানায় বসে।
: এক লাখ টাকা! ভেবেছ কেমন কেলাস আমার বোনটা? লক করার ব্যবস্থা করি কেমন করে এখন?
: লক তো করা ছিল না। আপা বুঝেই রেখেছেন।
দূরে ছবির দিকে তাকিয়ে থাকে মোহনা। সেখানে তার চোখ আটকে যায়। মানুষটাকে চেনা মনে হচ্ছে। ভাবতে ভাবতে মনে পড়ল তার বোনের অ্যালবামে দেখেছে এর ছবি। সারা জীবন বোন যাকে ভুলতে পারেনি। আগ্রহ নিয়ে কাছে গিয়ে দেখতে
থাকল। হ্যাঁ ঠিক চিনেছে সে। সোহানা আপু অনেক বছর লুকিয়ে রাখলেও সেদিন এই ছবি দেখিয়ে সব বলেছে। আর তাকে মায়ের কথা মেনে নিতে বলেছে। মোহনা তখন দৃঢ় কণ্ঠে বলেছিল, আমি তাকে চিনেই এগোচ্ছি। চমক অন্যদের থেকে আলাদা।
: এটা কার ছবি দুলাভাই নিশ্চয়ই?
চমক মাথা নেড়ে বলে হ্যাঁ। দেখছ না সঙ্গে আপু আছে। কী সুন্দর ছবিটা। তাই না?
চমক আরও বলে, আমার বড়লোক দুলাভাই। আপার পছন্দ বলতে হবে। এত দারুণ মানুষকে ভালোবেসেছিল।
: প্রেমের বিয়ে?
: আরে প্রেম মানে এখানে বিয়ে না হলে দুজনেই মরে যেত!
: তাই বুঝি? এমন কঠিন প্রেম? সিনেমার মতো।
হাসছে মোহনা চমকও হাসছে। কিন্তু মোহনার ভেতরে কষ্টের স্রোত এসে ভেঙে দিচ্ছে আশার পাড়।
কেমন যেন দোলাচলে তার মুখের হাসিটা বারবার মিলিয়ে যাচ্ছে। সোহানা আপুর আর বিয়ে করা হয়নি। ছোটখাটো একটা চাকরি করে কেটে যাচ্ছে অবহেলার দিন। বোনটার জন্য কষ্ট হয়। চমক মোহনার মুখের দিকে তাকায়, কী ভাবছ?
: কই? না তো। এত সুন্দর দুজন তাই দেখছি।
: আচ্ছা শোনো তোমার জন্য পাশের রুমটা ভালো হবে। আর আমি এখানে ঘুমোই। কাল আমাদের বিয়ে। আজ আমরা শুধু বন্ধু।
: আমি এখানে বই পড়তে পড়তে ঘুমোব। তুমি বরং ঐ রুমে চলে যাও। চমক মনে মনে ভাবে, কী ব্যাপার এখানে থাকতে চায় কেন? এখানে এতগুলো টাকা! কিছু হলে সব দোষ আমার হবে।
: না না এখানে আমি থাকব। তুমি ওই রুমে যাও।
না হয় আমরা কথা বলি অনেকক্ষণ। পরে যেও। এবার মোহনা মনে মনে ভাবে, থাকা নিয়ে চমক এমন করছে কেন? সব রুমই তো এক। আমার জন্য নতুন। আবার বইয়ের দিকে মন দেয়। কেমন যেন লাগছে ওর। মনকে বোঝায়, থাক চমক তো এমন পাগলই। চমক ওয়াশ রুমে যায়। এসে হাতমুখ মুছতে মুছতে বলে, টাকাটা কি ঠিক গুনেছি নাকি ভুল করলাম? এত টাকা কি কেউ এভাবে রাখে? দেখি তো আবার গুনি?
: আবার কেন? তুমি তো মাত্রই গুনে রেখেছ। যা ছিল তাই আছে। থাক না। টাকা নিয়ে এত পড়েছ কেন? কাল কী করতে হবে সেগুলো নিয়ে ভাব।
চমক মনে মনে বলে, কী ব্যাপার টাকা গুনতে মানা করছে কেন? অবশ্যই গুনতে হবে। কম হলেই কারণটা বোঝা যাবে।
ক্লজেট খুলে টাকা বের করে অনেক সময় ধরে গুনে। ভাবে, না কিছু হয়নি ঠিক আছে। আবার রেখে দেয় গুছিয়ে। মোহনার এবার খুব খারাপ লাগল। উঠে দাঁড়ায় কঠিন করে তাকায় চমকের দিকে। চমক বুঝতে পারে কিন্তু না বোঝার ভান করে বলে, বারবার ফোন আসছে কোথা থেকে তোমার?
: মা কল করেছিল। আপুও কল করেছিল।
: কী বললে?
: বলেছি বান্ধবীর বাসায় বেড়াতে এসেছি। ফিরতে দেরি হবে।
: তোমার বারবার ফোন আসছে দেখে হিংসে হচ্ছিল। ভাবছিলাম কে আবার প্রেমিক সুজন আমার প্রতিদ্বন্দ্বী?
হা হা হা।
: ছি ছি! এসব কী বলছ? একটা মেয়ে রাত ১০টায়ও বাড়ি ফেরেনি ওরা খোঁজ নেবে না? মেয়েদের ফোন বাজলেই প্রেমিকের ‘কল’?
মনে মনে ভাবে, কিছু অক্ষর পেটে পড়েছে কালচার হয়নি।
: ঠিক আছে আমি পাশের রুমেই থাকব, বলে ব্যাগ নিয়ে পাশের রুমে চলে গেল।
মোহনা ভাবছে জীবনে এত দুর্বোধ্য হিসাব সামনে আসে কেন যা ভেবে ভেবে কূলকিনারা পাওয়া যায় না? হিসাব না মেলার অথৈ জীবন সাগর। তবুও হিসাবের খাঁচায় মানুষকে ঢুকতে হয় আর সেখানে ঘুরপাক খেতে খেতে একদিন খাঁচা ছেড়ে উড়াল দেয় সবাই অজানা সীমান্তে। জীবন এক অচেনা পথ অচেনা সমীকরণ।
কয়েক মিনিটের মধ্যেই ফিরে এলো। বাইরে যাওয়ার জন্য তৈরি হয়ে এলো। টেনে নিয়ে এলো ব্যাগটাও। এসে দেখে চমক বিছানায় ছড়িয়ে টাকাগুলো গুনছে আবার। মোহনা পেছন থেকে জিজ্ঞেস করে, টাকা ঠিক আছে?
খুব চমকে উঠে তাকায় চমক। দেখে মোহনা ব্যাগ নিয়ে দরজার সামনে বাইরে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত।
এক লাফে উঠে চমক তাকে বুকে জড়িয়ে ধরে।
: দেখি দেখি সেই আমার প্রিয় বাঁকা দাঁতটা। দাও চুমু খাই। আমার নাগিনী। আমার পদ্মিনী।
মোহনা নির্লিপ্ত। যেন সারা গায়ে কোনো শক্তি নেই। যেন কোনো কথা শুনতে পাচ্ছে না। যেন আলিঙ্গন নয় শেকলের বন্ধন। ছিঁড়ে গেলে যাক। হাত ছাড়িয়ে নিল।
: কী হলো সোনা পাখি আমার?
: ছাড়ো। টাকা ঠিক আছে কি না দেখো।
: আরে আমি তো গুনেছি ঠিক আছে। কিন্তু বারবার মনে হচ্ছে আমি বোধহয় গুনতে ভুল করেছি।
: না আমি ভুল করেছি। আসি।
: কী বলো এসব সোনা পাখি? যাই বললেই হলো? এত রাতে এটা একটা কথা হলো? আমি কিছুই বুঝতে পারছি না ।
ঘড়ি দেখে মোহনা ভাবে, এখনো ফেরার সময় আছে।
চমক দাঁড়িয়ে অবাক দৃষ্টিতে দেখে মোহনা ব্যাগ নিয়ে দরজার দিকে যাচ্ছে। ফ্যানের বাতাসে চারদিকে উড়ছে টাকা আর সেই সঙ্গে সারা ঘরে ঘুরে বেড়াচ্ছে মোহনার ঘৃণা।
ঘৃণাগুলো ফেলে রেখে ব্যাগ নিয়ে বের হয়ে গেল মোহনা।
