ঈদের আর কয়েক দিন বাকি। অনেকের কেনাকাটা শেষ প্রায়, অনেকে আবার শুরু করছেন এখন। প্রতি ঈদের মতো এবারও ফ্যাশন হাউজ, অনলাইন শপ ও মার্কেটগুলোতে ঈদ শপিংয়ে ক্রেতাদের জমজমাট ভিড়। নানা রকম ট্রেন্ডের মধ্যে কেমন ধরনের পোশাক ও অনুষঙ্গের প্রতি সবার আগ্রহ বেশি বা কী ডিজাইন এবার জনপ্রিয়তা পেয়েছে। শপিংয়ের শেষ মুহূর্তে একবার চোখ বুলিয়ে নেওয়া যাক পছন্দের সবকিছু কেনা হয়েছে কি না। জানালেন তানজিলা তাহারিন
পোশাকের কাট ও নকশায় বৈচিত্র্য
দেশীয় ফ্যাশন হাউজগুলো ঘুরে দেখা গেল নতুন পোশাকে সমৃদ্ধ ঈদ আয়োজন। তবে কাট ও প্যাটার্নে গতবারের সঙ্গে খুব বেশি পার্থক্য নেই এবারের কালেকশনে। ঢিলা বা স্ট্রেইট কাটের জামা এবারও থাকছে ফ্যাশনে। সঙ্গে স্ট্রেইট প্যান্ট বা সিগারেট প্যান্টের পাশাপাশি এবার দেখা যাচ্ছে টিউলিপ কাটের প্যান্ট। ম্যাটেরিয়াল হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে সিল্ক, কটন, এন্ডি কটন, স্ল্যাব কটন, মিক্সড সিল্ক কটন, বলাকা সিল্ক ও পেপার সিল্ক। গাউন বা ফ্রকে ব্যবহার হয়েছে জর্জেট ও সিল্ক ম্যাটেরিয়াল। নকশাতে প্রাধান্য পেয়েছে ফুলেল মোটিফের এমব্রয়ডারিতে ডলার ও চুমকির কাজ। কারদানা ও কারচুপির কাজও এবার ঈদ পোশাকের নকশায় ট্রেন্ডি। তা ছাড়া সিল্কের পোশাকে ব্লকের ওপর সুতার কাজও দেখা যাচ্ছে।
সালোয়ার-কামিজের প্রাধান্য
ঈদে একটি হলেও সালোয়ার-কামিজ ছাড়া মেয়েদের ঈদ যেন অসম্পূর্ণ। ফ্যাশন হাউজগুলোতে সালোয়ার-কামিজের ওপর নানা রকম এক্সপেরিমেন্ট দেখা গেল। আড়ংয়ে মসলিনের কামিজে ভারী কাজ করা হয়েছে। এ ছাড়া রয়েছে দু-তিন লেয়ারের জামার সঙ্গে প্যাচওয়ার্কের ওড়না। রঙ হিসেবে প্রাধান্য পেয়েছে উজ্জ্বল বেগুনি, নীল, ফিরোজা ও পান্না সবুজ। পাশাপাশি কালো, সাদা এবং নিউট্রাল রঙের সালোয়ার-কামিজও রয়েছে। লা রিভে হালকা রঙের সিল্কের কামিজে এমব্রয়ডারির কাজ এবং হাতায় ও নিচের পাড়ে করা হয়েছে লেইসের ব্যবহার। সেইলরের এবারের ঈদ কালেকশনে রয়েছে প্রিন্টেড সফট সিল্কের কামিজে গলায় সুতা, লেইস ও সিকোয়েন্সের কাজ। এ ছাড়া অন্যান্য ব্র্যান্ড যেমন রঙ বাংলাদেশ, দেশাল, ইয়েলো, ক্যাটস আই ইত্যাদি ফ্যাশন হাউজেও সম্ভার রয়েছে নানা ধরনের সালোয়ার-কামিজের।
আনারকলি ও আলিয়া বা নাইরা কাটের জামা
গত বছর বাজার জুড়ে আধিপত্য ছিল নাইরা কাট ও আলিয়া কাট নামক জামার। ফ্রক ধাঁচের জামাতে বুকের কাছ থেকে ভি শেইপে কুচি দেওয়া জামাগুলোকে সাধারণত আলিয়া কাট নামে ডাকা হচ্ছিল। আর বুকে ইয়োক করা ফ্রকে দুই পাশে কাটা বা স্ল্টি দেওয়া জামাগুলোর নাম ছিল নাইরা কাট। এ ধরনের নামগুলো মার্কেট স্বত্বাধিকারীদের দেওয়া হলেও জামাগুলো ছিল ভীষণ জনপ্রিয়। এবারও এ ধরনের জামা ট্রেন্ডে রয়েছে। তবে বুকের কাজ বা প্রিন্টে এসেছে নতুনত্ব। আর এসবের পাশাপাশি আনারকলি কাটের জামার আবেদন এখনো অতুলনীয়। সুতি, সিল্ক এবং ফ্লোরাল প্রিন্টের জর্জেটের আনারকলি এবারের ঈদ বাজারেও সমানভাবে চলছে। সাধারণত ডিজাইনভেদে ১২০০ থেকে ৩০০০-এর মধ্যে এসব কাটের জামাগুলো পাওয়া যাবে। নিউ মার্কেট, গাউছিয়া ও ইস্টার্ন মল্লিকাতে রয়েছে এ ধরনের জামার কালেকশন।
এ কাট বা মিডিয়াম লেংথের কুর্তি
আড়ং তাগা, বিশ্ব রঙ ও লা রিভে এবারও রয়েছে চমৎকার ডিজাইন ও কাটের কুর্তির সমাহার। সেইলরের কুর্তিগুলোতে বরাবরই ভিন্নতা থাকে। এবার এসব কুর্তিতে এ কাটের পাশাপাশি লং শার্টের ধাঁচ রয়েছে। ঘের দেওয়া শর্ট কুর্তিগুলোও ট্রেন্ডি ভীষণ। এ ছাড়া লাখনৌয়ি কাজ করা লং ও শর্ট কুর্তিগুলোর জনপ্রিয়তা দেখা যাচ্ছে। গরমে আরামের জন্য বেছে নিতে পারেন যে কোনো ধরনের কুর্তি। সঙ্গে ডেনিম বা যে কোনো প্যান্ট স্টাইলিশ অথচ ক্যাজুয়াল লুকের জন্য হবে ভীষণ মানানসই। ওড়না ছাড়াও সঙ্গে নিতে পারেন স্কার্ফ। কুর্তির ওপর কোটি বা শ্রাগও পরতে পারেন। আড়ংয়ে কুর্তির সঙ্গে নেওয়ার জন্য রয়েছে স্কার্ফের আলাদা সেকশন। এ ছাড়া চাইলে মনমতো নিজের পছন্দের কাপড় কিনে কুর্তি বানিয়ে নিয়ে তাতে করে নিতে পারেন হ্যান্ডপেইন্ট বা ব্লকের কাজ।
শারারা ও ঘারারা
এবারও শর্ট ধাঁচের কামিজের সঙ্গে শারারা প্যান্টের ট্রেন্ড দেখা যাচ্ছে। আর পেপলাম কাটের কুর্তি বা ফ্রকের সঙ্গে রয়েছে ঘারারা প্যান্টের কম্বিনেশন। জমকালো ধরনের ঈদ পোশাক নিতে চাইলে এ ধরনের সেটগুলো নিতে পারেন। সাধারণত আমব্রেলা কাটের ঢিলা পালাজজোকেই শারারা প্যান্ট বলা হয়। আর চাপা প্যান্টে হাঁটু বা তার একটু ওপর থেকে ছড়ানো কুচি দেওয়া পায়জামাগুলোকে ঘারারা বলা হয়। পিংক সিটি বা যমুনা ফিউচার পার্কের দোকানগুলোতে পেয়ে যাবেন এই ড্রেসগুলো। ৬০০০ থেকে ৭০০০-এর মধ্যেই এই পোশাকগুলো পাবেন। এ ছাড়া এক্সক্লুসিভ ডিজাইনের ডিজাইনার কাচের পোশাকগুলোর দাম দশ হাজার টাকা পর্যন্ত। তবে চাঁদনীচক বা প্রিয়াঙ্গন সুপার মার্কেট থেকে সুতা ও চুমকির ভারী কাজ করা কাপড় কিনে দর্জিবাড়ি থেকেও বানিয়ে নিতে পারেন আপনার পছন্দের শারারা বা ঘারারা সেট।
চিকেনকারির কো অর্ডস
চিকেন কাপড় ফিরে এসেছে নতুন আঙ্গিকে। নানান রঙের নানান ডিজাইনের চিকেনকারি কাপড়ে এবার ঈদের বাজার সয়লাব। পরতে আরামের পাশাপাশি দেখতে অভিজাত হওয়ায় চিকেনের জামাগুলো ঈদ পোশাক হিসেবেও বেশ জনপ্রিয়তা পেয়েছে। বিভিন্ন রঙের একরঙা চিকেন কাপড়ে তৈরি কো অর্ডসগুলোর আধিক্য দেখা যাচ্ছে মার্কেট জুড়ে। এগুলো সাধারণ জামা ও প্যান্টের টু পিস হিসেবে পাওয়া যায়। দাম একদমই হাতের নাগালে। ৭০০ থেকে ১৫০০-এর মধ্যে প্রাইস রেঞ্জ। ঈদের দিনের সকালের জামা হিসেবে বেশ মানানসই। উত্তরা রাজলক্ষ্মী সুপার মার্কেট, মিরপুর হোপ মার্কেট ছাড়াও নিউ মার্কেটেও পেয়ে যাবেন এই কো অর্ডসগুলো। সঙ্গে মনমতো বেছে নিতে পারেন জর্জেট বা সিল্কের ওড়না।
শাড়িতে অতুলনীয়া
ঈদ উপলক্ষে শাড়ি কিনতে অনেকেই ভালোবাসেন। ঈদের রাতের দাওয়াতে বা ঘুরতে যাওয়ার সময় শাড়ির আবেদন অন্য রকম। আড়ংয়ের জামদানি ছাড়াও মসলিনের ওপর সুতার কাজের শাড়িগুলো ঈদের জন্য পারফেক্ট। এ ছাড়াও রয়েছে সিল্কের ওপর নকশি কাঁথার কাজ করা শাড়ি। রঙ বাংলাদেশে সিল্কের শাড়িতে ব্লক ও রঙের কাজ করা হয়েছে। যারা সিম্পল শাড়ি ও কম্ফোর্টেবল শাড়ি খোঁজেন ফ্যাশন হাউজ খুঁত, দেশাল ও পটের বিবির ঈদের শাড়িগুলো তাদের জন্য মানানসই। ঈদের সকালের জন্য হালকা কাজের জামদানি ও মনিপুরী শাড়ি বেছে নিতে পারেন অনায়াসেই। আর কাতান বা কাঞ্চিপুরম শাড়ি কিনতে পারেন রাতের জন্য। ঈদের পরে সাধারণত বিয়ের দাওয়াত থাকে অনেকেরই। ভারী কাতান, সিল্ক খাড্ডি ও কাঞ্চিপুরম কাতানগুলো এসব দাওয়াতের জন্য একদম উপযুক্ত পছন্দ হতে পারে। আবার একটু ভিন্নতা চাইলে মসলিনের ওপর এমব্রয়ডারি বা অরগ্যাঞ্জার ওপর জরির কাজ করা শাড়িগুলো নিতে পারেন।
বাহারি ব্লাউজ
দু-এক বছর জুড়ে তুলনামূলক সিম্পল শাড়িগুলোর সঙ্গে ভারী কাজ করা ব্লাউজের কম্বিনেশন বেশ ট্রেন্ডি। এবারও তার ব্যতিক্রম নয়। তবে একরঙা চিকেনের ব্লাউজের সঙ্গে গলায় ও হাতায় কুশিকাটার কাজ, সিল্কের ব্লাউজে লেইসের কাজ এবং ভেলভেটের ব্লাউজও বেশ চলছে। পিঠে ফিতা ছাড়াও ব্লাউজের পেছনে নিচের দিকে ফিতা দেখা যাচ্ছে। পাফ স্লিভ ছাড়াও ফুল হাতা এবং কনুই অবধি হাতাও বেশ পছন্দের এখন শাড়িপ্রেমীদের। তবে অনেকে চাইলে বিভিন্ন ব্লাউজের পেজ থেকে জামদানি বা অন্য যে কোনো শাড়ির ব্লাউজে ভারী কাজ করিয়ে নিতে পারেন। আবার কাস্টমাইজ করে বানিয়ে নিতে পারেন যে কোনো ডিজাইনের ব্লাউজ।
