সোমবার, ১৫ এপ্রিল ২০২৪, ২ বৈশাখ ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

প্রতিহিংসা বাড়াবে কেজরিওয়ালের জনপ্রিয়তা

আপডেট : ০১ এপ্রিল ২০২৪, ০২:২৪ পিএম

বিজেপি যে সংকটে আছে তা বোঝা যায় অরবিন্দ কেজরিওয়ালকে গ্রেপ্তারের কারণগুলো খতিয়ে দেখলে। ‘গুলো’ বললাম বটে, আসলে কারণ তো একটাই। আসন্ন লোকসভা নির্বাচনে কোনো না কোনোভাবে প্রতিপক্ষকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা থেকে দূরে রাখা। যে ছেঁদো যুক্তিতে কেজরিওয়ালকে অ্যারেস্ট করা হয়েছে তাতে সন্দেহ থাকবেই যে, এ হচ্ছে বিজেপির প্রতিহিংসার রাজনীতি। অনেকেই আমার সঙ্গে একমত হয়তো হবেন না। তবু আগেও দু-একবার বলেছি, এখনো বলছি যে, করপোরেট মিডিয়ার দৌলতে আপাতদৃষ্টিতে বিজেপিকে বিশাল বাঘ মনে হলেও আদতে সে মোটেও বিপুল পরাক্রমশালী নয়।

বিশদে বিশ্লেষণ পরে করব। তার আগে কেজরিওয়াল প্রসঙ্গে আরও কিছু কথা বলে নেওয়া যাক। খড়গপুর আইআইটির মেধাবী ছাত্র কেজরিওয়াল রাজনীতিতে এসেছিলেন গান্ধীবাদী আন্না হাজারের হাত ধরে। দুর্নীতিমুক্ত ভারত গড়ার স্লোগান তুলে বেশ কয়েক বছর আগে ধর্ণায় বসেছিলেন আন্না। সেই সময় তার সঙ্গী হয়ে শিরোনামে এসেছিলেন বেশ কয়েকজন। তার মধ্যে পরবর্তী সময়ে দুই পরস্পরবিরোধী রাজনৈতিক নেতা কিরণবেদী ও অরবিন্দ কেজরিওয়াল সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য। সম্ভবত তখনই কেজরিওয়াল বুঝতে পেরেছিলেন যে, রাজনৈতিক দল না তৈরি করতে পারলে, শুধু দুর্নীতি নয়, এই সিস্টেমে কোনো কাজই করা সম্ভব নয়। ফলে আন্না ও তার অন্যান্য সহযোগীরা যখন সরকারের মৌখিক প্রতিশ্রুতিতে আস্থা রেখে তর্জন-গর্জন বন্ধ করে আন্দোলনের পাততাড়ি গোটালেন, তখন কেজরিওয়াল সারা দেশ থেকে দুর্নীতি হঠাতে নতুন রাজনৈতিক দল গড়লেন। নাম দিলেন আম আদমি পার্টি, সংক্ষেপে আপ। হ্যামিলনের বাঁশিওয়ালার মতো, মনে পড়ে, কেজরিওয়ালের ডাকে অভূতপূর্ব সাড়া দিয়ে দলে দলে শিক্ষিত তরুণদের বড় অংশ ছুটলেন আপে শামিল হতে। বিদেশের ভারতীয় ছাত্রদের মধ্যেও আলোড়ন উঠল আপের কর্মসূচি সমর্থনে।

মনে রাখতে হবে, আপের পথচলার সময়ই কেন্দ্রে ক্ষমতা দখল করল অত্যন্ত দক্ষিণপন্থি দল ভারতীয় জনতা পার্টি। যাদের থিঙ্কট্যাঙ্ক রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ। আরএসএস। যে আরএসএসের জন্ম হয়েছিল ফ্যাসিবাদী রাজনীতির অনুপ্রেরণায়। যারা বিশ্বাস করে ভারত শুধু নির্দিষ্ট একটি জাতের। এখানে বহুত্ববাদী রাজনীতির কোনো পরিসর থাকতেই পারে না। হিটলার, মুসোলিনির এক দেশ, এক নেতা, এক পতাকা স্লোগান তুলেই আরএসএসের অগ্রগতি। স্বাধীনতার আগে পরে, এখনো অবধি এমন কোনো দাঙ্গা হয়নি, যার সঙ্গে আরএসএস নাম জড়ায়নি।

অনেকে, এমনকি আমাদের বাম, গণতান্ত্রিক নেতারাও বিজেপি ও আরএসএসকে সাধারণভাবে হিন্দুত্ববাদী দল বলেন। আমার মনে হয় দলটি আদৌ হিন্দুত্ববাদী নয়। সে শুধু মনুবাদ, ব্র্যাহ্মণ্যবাদের সমর্থক। যে দর্শনের বিরুদ্ধে যুগে যুগে ভারতের নানা মনীষীরা সোচ্চার হয়েছেন। সাবেক জৈন মুনী থেকে বৌদ্ধ সাধক বা শিখ ধর্ম গুরুদের লড়াই এই মনুবাদী নীতির বিরুদ্ধে। মনুবাদ মানুষকে অন্ধকারে নিয়ে যেতে চায়। নারী সেখানে নরকের দ্বার। আজকের ভারতেও তরুণরা আওয়াজ তোলেন মনুবাদী রাজনীতির বিপক্ষে। মনুবাদী অনুশাসন থেকে তারা মুক্তি চান। হাম ছিনকে লেঙ্গে আজাদী কোনো দেশদ্রোহিতার স্লোগান নয়। তা হচ্ছে অন্ধকার দর্শনের বিরুদ্ধে আলোয় ফেরার ডাক।

বিজেপি সাধারণ হিন্দু জনগণকে বিভ্রান্ত করার জন্য নাগাড়ে শিখ, জৈন, বৌদ্ধ, আদিবাসীদের দলে নেওয়ার চেষ্টা করে। ভাবটা, সবাই আমরা সনাতনী। এ স্রেফ ধোঁকা। ঠিক যেমন ধোঁকা দিতে নির্বাচনের আগে বিজেপি ক্যা (সিএএ) বা সিটিজেন অ্যামেন্ডমেন্ট অ্যাক্টের গাজর ঝুলিয়ে রেখে মতুয়া ও অন্যান্য নিম্নবর্গের হিন্দু জনগোষ্ঠীর ভোট পেতে আগ্রহী। এই অ্যাক্ট বুমেরাং হতে পারে আগে বলেছি। আসামে ইতিমধ্যেই যেভাবে নাগরিকদের হেনস্তা করা হচ্ছে তা ভয়ংকর। এই নাগরিকদের অধিকাংশই কিন্তু ঘটনাচক্রে হিন্দু। ফলে এটা মনে করার কোনো কারণ নেই বিজেপি শুধু সাম্প্রদায়িক কার্ড খেলে। খেলে, কিন্তু তার মূল লক্ষ্য করপোরেট প্রভুদের খুশি করা। ক্যা, এনআরসির মধ্যে দিয়ে লাখ লাখ নাগরিককে দ্বিতীয় শ্রেণির বাসিন্দা করে তাদের সস্তা শ্রমিক করা হচ্ছে। যাতে করপোরেট পুঁজির সুবিধা হয়।

নরেন্দ্র মোদির সরকারের আমলে ধনী ক্রমেই ধনী হয়েছে। আর গরিব আরও গরিব হয়েছে, তা যে কেউ একটু খোঁজখবর নিলেই টের পাবেন। মোদি আমলে ভারতের সঙ্গে পড়শী দেশের সম্পর্ক তলানিতে ঠেকেছে। নেপাল, ভুটান, মিয়ানমার কেউই এই মুহূর্তে ভারতবন্ধু নন। চীনের সঙ্গে তো পরিস্থিতি জটিল থেকে জটিলতর হচ্ছে। চীন অরুণাচল প্রদেশের কোনো কোনো অঞ্চল নিজেদের বলে দাবি করলেও ভারতের মৃদু, মিনমিনে প্রতিবাদে খুব একটা ঝাঁজ নেই। সব থেকে খারাপ হচ্ছে বাংলাদেশের জনগণের এক বিরাট অংশের সঙ্গে। ভারতের উচিত ছিল আলোচনার মধ্য দিয়ে পড়শীদের সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়ে তোলা। তা না করে ভারতের দাদাগিরিসুলভ ব্যবহার কাছের দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক খারাপ করেছে। অর্থনীতির অবস্থা যত উজ্জ্বল দাবি করা হয়, তা যে নয়, সেটা দেশের বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ থেকে আমাদের রিজার্ভ ব্যাংকের প্রাক্তন গভর্নর রঘুরাম রাজন পর্যন্ত জানিয়েছেন। বিজেপি আমলে যে ইলেকটোরাল বন্ড কেলেঙ্কারি তা নিয়ে পরে কখনো দীর্ঘ লেখার ইচ্ছা আছে। ভারতের অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারমনের ইকোনমিস্ট স্বামীর ভাষায়, এই স্ক্যাম পৃথিবীর সবচেয়ে বড় আর্থিক কেলেঙ্কারি।

ফলে মোদি সরকারের  কাছে জেতার জন্য একমাত্র অস্ত্র ধর্মীয় বিভাজন। রামমন্দির নির্মাণ যে পরিমাণ আবেগ জনমনে ঢেউ তুলবে বলে বিজেপি আশা করেছিল, হাওয়া এখনো তেমন আশাব্যঞ্জক নয়। সাউথ ইন্ডিয়ায় লড়াই সোজাসুজি ব্রাহ্মণ্যবাদী রাজনীতির বিরুদ্ধে। তাই সেখানে হিন্দুত্ববাদী গল্প বলে লাভ নেই।

মোদিজি অবশ্য চারশ আসনে জেতার জন্য সমর্থকদের তাতাচ্ছেন ঠিকই। কিন্তু তিনি নিজেও জানেন যে, বলা সহজ হলেও কাজটা বেশ কঠিন। একাধিক কার্ড খেললেও দক্ষিণ ভারতে গতবারের মতো সিট জেতা সহজ নয়। তাহলে ভরসা শুধু গো বলয় এবং পশ্চিমবঙ্গ। কেন্দ্রীয় সরকারের বিভিন্ন এজেন্সির অন্যতম কাজ প্রতিপক্ষ রাজনীতিবিদদের শায়েস্তা করতে মিথ্যা মামলা দেওয়া। তার বড় উদাহরণ দিল্লির জনপ্রিয় মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়াল।

কেজরিওয়ালের রাজনীতি নিয়ে অনেক প্রশ্ন থাকতেই পারে। কিন্তু জন্মলগ্ন থেকে আপ যেভাবে দিল্লির মসনদ দখলের লড়াইয়ে ভারতীয় জনতা পার্টিকে বারবার নাস্তানাবুদ করেছে তাতে বিজেপির আতঙ্কিত হওয়ার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। গতবারের লোকসভার নির্বাচনে দিল্লি দখল করা বিজেপির কাছে সহজ ছিল কংগ্রেসের সঙ্গে আপের জোট না হওয়াতে। এবার কংগ্রেসের সমর্থন আপের দিকে, এই ঘোষণা জেনে বিজেপি নিশ্চিত চাপে পড়েছে। কেজরিওয়ালকে যে কারণে ই.ডি জেলে ঢুকিয়েছে তা যথেষ্ট হাস্যকর। কোন এক রেড্ডির অভিযোগ, কেজরিওয়াল মাদক দুর্নীতির সঙ্গে যুক্ত। জানা গেছে, সেই রেড্ডি ৫৫ কোটি টাকা বিজেপির ইলেকশন ফান্ডে দান করেছেন। তারপরই জনৈক রেড্ডি জামিন পেয়ে রাজসাক্ষী হয়ে কেজরিওয়াল যে স্বয়ং মাদক চোরাচালানের চক্রী তা জানিয়েছেন। অরবিন্দ কেজরিওয়াল কোর্টে প্রশ্ন তুলেছেন যে, তিনি যদি প্রমাণ ছাড়া নরেন্দ্র মোদি ও অমিত শাহকে ১০০ কোটি টাকা ঘুষ দিয়েছেন বলেন, তাহলে কি ইডি সাক্ষ্যপ্রমাণ ছাড়া তাদের অ্যারেস্ট করবে?

যে বিপুল জনপ্রিয়তা নিয়ে অরবিন্দ কেজরিওয়াল রাজনীতির ময়দানে পা রেখেছিলেন তা জেলে গেলে নিঃসন্দেহে আরও দৃঢ় হবে। পাঞ্জাব বা গুজরাটেও আপ বিজেপির বড় চ্যালেঞ্জার। আপের সরকার দিল্লিতে জনগণের শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের খোলনলচে বদলে দিয়ে যেভাবে জনমনে বাহবা কুড়িয়েছেন, তাও বিজেপির মাথাব্যথার কারণ। কিন্তু কোনো কাজ না করে শুধু প্রতিহিংসার রাজনীতি কখনো দলকে সুবিধা দেবে না, এটা বিজেপি নেতারা বুঝলে ভালো করতেন। বিজেপির আত্মবিশ্বাস নিশ্চিত বেশি। তবে কখনো কখনো তা অতিরিক্ত অহমিকা মনে হয়। যা গণতন্ত্রের পক্ষে শুভ নয়।

লেখক: ভারতীয় প্রামাণ্যচিত্র নির্মাতা ও লেখক

[email protected]

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত