শনিবার, ২০ এপ্রিল ২০২৪, ৭ বৈশাখ ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

শীর্ষ কোচিং ব্যবসায়ী গভর্নিং বডি নির্বাচনে

আপডেট : ০১ এপ্রিল ২০২৪, ০৩:০০ এএম

নতুন শিক্ষাক্রমে সরকার কোচিং-প্রাইভেট নিরুৎসাহিত করেছে। এমনকি কোচিং-বাণিজ্য বন্ধে নীতিমালা রয়েছে সরকারের। অথচ শীর্ষ কোচিং ব্যবসায়ী সেইফ কোচিং সেন্টারের মালিক শাহাদাৎ ঢালী আগামী ১৯ এপ্রিল অনুষ্ঠিতব্য আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজের গভর্নিং বডি নির্বাচন ২০২৪-এ প্রাথমিক শাখার অভিভাবক প্রতিনিধি হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এই কোচিং ব্যবসায়ী কীভাবে নির্বাচনের সুযোগ পেল তা নিয়ে অভিভাবকরা বিস্ময় প্রকাশ করেছেন।

জানা যায়, রাজধানীর রাজারবাগ ও মুগদায় সেইফ কোচিং সেন্টারের দুটি শাখা অবস্থিত। যেখানে সাধারণত মতিঝিল আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজের ছেলেমেয়েরা পড়ে। যার মালিক শাহাদাৎ ঢালী ওরফে মেহেদী। গত মেয়াদে তিনি আইডিয়ালের গভর্নিং বডির সদস্য হওয়ায় এই কোচিং সেন্টার ফুলে-ফেঁপে উঠেছে। তিনি আইডিয়ালের শিক্ষার্থীদের এই কোচিংয়ে যেতে বাধ্য করেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।

গভর্নিং বডি বা ম্যানেজিং কমিটি প্রবিধানমালায় বলা হয়েছে, সংশ্লিষ্ট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের স্বার্থবিরোধী বা এর সুনাম নষ্ট হয় এরূপ কোনো কর্মকা-ে অংশগ্রহণ করলে বা সহায়তা দিলে সদস্য হওয়ার অযোগ্য হবেন।

জানতে চাইলে ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের কলেজ পরিদর্শক অধ্যাপক আবু তালেব মো. মোয়াজ্জেম হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘কোচিং সেন্টারের সঙ্গে জড়িত কোনো ব্যক্তি গভর্নিং বডির নির্বাচন করছে এমন লিখিত অভিযোগ পাওয়া গেলে আমরা তদন্ত সাপেক্ষে ব্যবস্থা নেব। তবে এরূপ ব্যক্তিকে ভোট না দিতে ভোটাররা অবশ্যই বিবেচনা করবেন।’

আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মোহাম্মদ এমাম হোসাইন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা ভোটার লিস্ট করেছি। এখন নির্বাচন পরিচালনা করছেন ঢাকা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়। তবে আমি ব্যক্তিগতভাবে কোচিংবিরোধী। আমি চাই একজন শিক্ষার্থীর শিক্ষা তার প্রতিষ্ঠানই সম্পন্ন করুক।’ 

শুধু সেইফ কোচিং সেন্টারই নয় শাহাদাৎ ঢালী প্রতিষ্ঠা করেছেন সেইফ আইডিয়াল স্কুল। এ ছাড়া তার মালিকানাধীন ডিএমসি স্কলার মেডিকেল কোচিংয়ের বিরুদ্ধে প্রশ্ন ফাঁসেরও অভিযোগ রয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শাহাদাৎ ঢালী গত মেয়াদে গভর্নিং বডির প্রতিনিধি থাকাকালে ভর্তিবাণিজ্যসহ কেনাকাটা, ভবন সংস্কারসহ এমন কোনো অনিয়ম নেই তিনি তা করেননি। আইডিয়ালের সাবেক সদস্য জাহিদুল ইসলাম টিপু মৃত্যুর আগে তার ভাগে পাওয়া ১৫ শিক্ষার্থী ভর্তি করতে দায়িত্ব দেয় ঢালীকে। কিন্তু টিপু মারা গেলে সেই অবৈধ ভর্তির বিপুল পরিমাণ অর্থ তিনি নিজেই নিয়ে নেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। এ ছাড়া আইডিয়ালের সাবেক অধ্যক্ষ শাহান আরা বেগমকে এক্সটেনশন করিয়ে দেওয়ার কথা বলে বড় অঙ্কের টাকা নেন তিনি।

এ ছাড়া আইডিয়ালের মতিঝিল শাখায় করিডরসহ মেইনগেট সংস্কারে ২৫ লাখ, শিক্ষকদের কমনরুম সংস্কারে ২৭ লাখ, কলেজের মাঠ সংস্কার ও সৌন্দর্যবর্ধনের ৩০ লাখ ও বাংলা ভার্সনের বারান্দার গ্রিলের ৫০ লাখ টাকা বিলের মধ্যে বড় টাকা দিতে হয়েছে গভর্নিং বডির কয়েকজনকে। যার নেতৃত্ব দিয়েছেন শাহাদাৎ ঢালী।

একইভাবে বনশ্রী শাখার ১৬টি রুমে টাইলস ফিটিংসে ৮০ লাখ, বাংলা ভার্সনের ভবন সংস্কারে ৩৬ লাখ এবং মাঠের মাটি ভরাট ও সৌন্দর্যবর্ধনে ৯ লাখ টাকা বিলেও বড় অঙ্কের কমিশন দিতে হয়েছে গভর্নিং বডির কয়েকজনকে। মুগদা শাখার বহুতল ভবনের নামে কমিশন ৫০ লাখ, গেট তৈরির নামে ২০ লাখ এবং সব শাখারই ল্যাবরেটরির মালামাল কেনার নামে বড় অঙ্কের হরিলুট হয়েছে। আর এই অনিয়মে প্রধান ব্যক্তি হিসেবে নাম উঠে আসছে শাহাদাৎ ঢালীর।

শাহাদাৎ ঢালীর ফেসবুক ঘাঁটলে দেখা যায়, তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী হিসেবে পরিচয় দিয়েছেন। অথচ তিনি যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েননি তা নিশ্চিত করেছেন আইডিয়াল স্কুলের একাধিক শিক্ষক।

সার্বিক বিষয়ে শাহাদাৎ ঢালী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমি ঢাকা কলেজের ছাত্র ছিলাম। ঢাকা কলেজ ঢাবির অধিভুক্ত হয়েছে বিধায় আমি ঢাবিকে নিজের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে দেখিয়েছি।’ আপনি কত সালে ঢাকা কলেজের ছাত্র ছিলেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, ২০১৪ সালে। ওই সময়তো ঢাকা কলেজ জাতীয় বিশ্ববিদ্যায়ের অধীনে ছিল জানালে তিনি আমতা আমতা করেন।

কোচিং সেন্টার ও অনিয়মের অভিযোগের বিষয়ে শাহাদাৎ ঢালী বলেন, ‘আমার কোচিং সেন্টার ১৫ বছর আগের। তবে আমিও চাই না কোচিং-বাণিজ্য চলুক। তারপরও আমার কোচিং সেন্টার যেহেতু প্রতিষ্ঠিত, তাই আমি নির্বাচিত হলে আমি সরে গিয়ে আমার স্ত্রীকে কোচিং সেন্টারের চেয়ারম্যান করে দেব। আর আমার বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ আনা হয়েছে, তা মিথ্যা। নির্বাচন সামনে রেখে একটি পক্ষ আমাকে হেয়প্রতিপন্ন করতে আমার নামে অভিযোগ করছে। আমি সব সময়ই অনিয়ম-দুর্নীতির বিরুদ্ধে।’

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত