কলমানি সুদহার লঙ্ঘনে ৩৯ ব্যাংককে শাস্তির হুঁশিয়ারি

আপডেট : ০৩ এপ্রিল ২০২৪, ০২:০২ এএম

তারল্য সংকটের ধকল সামলাতে তফসিলি ব্যাংক ও অ-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠানসমূহ (এনবিএফআই) নিজেদের মধ্যে কলমানিতে (ওভার নাইট) ধারদেনা করছে। সংকট প্রকট হওয়ায় অধিকাংশ ব্যাংক বেঁধে দেওয়া সর্বোচ্চ সুদের সীমা ৯ দশমিক ৫ শতাংশ মানছে না। সর্বোচ্চ ৯ দশমিক ৯ শতাংশ হার পর্যন্ত ৫ হাজার ৮১১ কোটি টাকা লেনদেন করেছে ৩৩টি ব্যাংক এবং ৬টি আর্থিক প্রতিষ্ঠান। তাই সুদের সর্বোচ্চ সীমা লঙ্ঘনের দায়ে প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে শাস্তির হুঁশিয়ারি দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। প্রতিষ্ঠানগুলো যদি সন্তোষজনক জবাব দিতে ব্যর্থ হয়, তবে জরিমানার মুখোমুখি হতে হবে। একই সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের তারল্য সুবিধাও বাতিল হতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র থেকে জানা গেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, গত ২৫ জানুয়ারি পর্যন্ত ৩৩টি ব্যাংক বেঁধে দেওয়া সর্বোচ্চ ৯ টাকা ৫০ পয়সা সুদের সীমা লঙ্ঘন করে ৩ হাজার ১০৫ কোটি ধার করেছে এবং একই সময়ে ২ হাজার ৬১০ কোটি অন্য ব্যাংককে ধার দিয়েছে। ধার দেওয়া-নেওয়া প্রচলিত নিয়ম হলেও সমস্যা তৈরি হয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক নির্ধারিত সুদের হারের সর্বোচ্চ সীমা লঙ্ঘন করায়। একইভাবে ছয়টি আর্থিক প্রতিষ্ঠান সর্বোচ্চ সুদের সীমা ভেঙে ৯ দশমিক ৯ শতাংশ হারে ৯৫ কোটি ৩৫ লাখ টাকা ধার করেছে। এ ধরনের লেনদেন ব্যাংকিং নীতিমালার পরিপন্থী হিসেবে দেখছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সরকারি ব্যাংকের মধ্যে জনতা ব্যাংক ৯ টাকা ৭৫ পয়সা দরে কলমানি মার্কেটে অন্য ব্যাংক থেকে ৪৮১ কোটি টাকা ধার করেছে আর বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকও একই রেটে ৯৫ কোটি টাকা ধার দিয়েছে। বিশেষায়িত বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক ৯ টাকা ৯০ পয়সা দরে ৪৫৯ কোটি টাকা ধার দিয়েছে। আর বিদেশি ব্যাংকের মধ্যে স্টেট ব্যাংক অব ইন্ডিয়া ৯ টাকা ৬০ পয়সা রেটে ৩০৪ কোটি টাকা ধার দিয়েছে। ব্যাংক অব সিলং ৯ টাকা ৭৫ পয়সা দরে ১১৬ কোটি টাকা, একই রেটে ব্যাংক আল-ফালাহ ১৭৬ কোটি টাকা কলমানিতে ধার দিয়েছে। বেসরকারি সিটি ব্যাংক ৯ টাকা ৭৫ পয়সা দরে ৩০০ টাকা ধার দিয়েছে। এ ছাড়া আইএফআইসি ৯ টাকা ৯০ পয়সা রেটে ২০৯ কোটি ও সিটিজেন ব্যাংক ৯ টাকা ৭৫ পয়সা সুদহারে ১৮ কোটি টাকা অন্য ব্যাংককে ধার দিয়েছে। এনআরবিসি ব্যাংক ৯ টাকা ৭৫ পয়সা রেটে ২৫ কোটি ধার দিয়েছে।

বিপরীতে এবি ব্যাংক ৯ টাকা ৮০ পয়সা দরে ৬০ কোটি টাকা ধার করেছে। মিডল্যান্ড ব্যাংক ৯ টাকা ৮০ পয়সা সুদে ২৩৫ কোটি ধার করেছে। এনসিসি ব্যাংক ৯ টাকা ৮০ পয়সা সুদে ১০৪ কোটি, এনআরবি একই দরে ৭৫ কোটি ধার করেছে। ইউসিবি ৯ টাকা ৭৫ পয়সা সুদে ২৯৭ কোটি ধার করলেও ব্যাংকটি ৯ টাকা ৮০ পয়সা রেটে ২৮০ কোটি টাকা অন্য ব্যাংককে ধার দিয়েছে।

মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘যেসব ব্যাংকের কাছে অতিরিক্ত তারল্য থাকে, তারাই মূলত ধার দিয়ে এর বিনিময়ে সুদ নেয়। সুদের হার নির্ভর করে কতদিনের জন্য টাকা ধার নেওয়া হচ্ছে, তার ওপর। আবার কখনো কখনো চাহিদা ও সরবরাহের ওপর নির্ভর করেও সুদহার ওঠানামা করে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তদারকিতে কলমানি দেওয়া হয়।’

এদিকে ইস্টার্ন ব্যাংক ৯ টাকা ৬০ পয়সা দরে ১২৩ কোটি, এসবিএসি ব্যাংক একই দরে ১৪৪ কোটি, ঢাকা ব্যাংক ৯ টাকা ৮০ পয়সা সুদে ৩৬৪ কোটি, প্রিমিয়ার ব্যাংক ৯ টাকা ৬০ পয়সা রেটে ৪৫ কোটি টাকা ধার করেছে। মধুমতী ব্যাংক ৯ টাকা ৭৫ পয়সা রেটে ১১৫ কোটি ধার করলেও একই রেটে আবার ৬১ কোটি টাকা ধার দিয়েছে। সাউথইস্ট ব্যাংক ৯ টাকা ৭৫ পয়সা সুদে ৬১ কোটি টাকা ধার দিয়েছে। কিন্তু ব্যাংক এশিয়া ৯ টাকা ৬০ পয়সা রেটে ৮১ কোটি ধার করলেও একই রেটে ৪০ কোটি ধার দিয়েছে। সীমান্ত ব্যাংক ৯ টাকা ৯০ পয়সা রেটে ৬৩ কোটি এবং উত্তরা ব্যাংক ৯ টাকা ৭৫ পয়সা রেটে ৪৬৪ কোটি টাকা বিক্রি করেছে। তবে ওয়ান ব্যাংক ৯ টাকা ৬০ পয়সা রেটে ১০ কোটি, পূবালী ব্যাংক একই রেটে ২৫৫ কোটি, যমুনা ব্যাংক ৯ টাকা ৯০ পয়সা দরে ৪৬৬ কোটি, মেঘনা ব্যাংক ৯ টাকা ৮০ পয়সা রেটে ৮৫ কোটি এবং কমিউনিটি ব্যাংক ৯ টাকা ৯০ পয়সা সুদে ১০৪ কোটি টাকা ধার করেছে।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক মো. মেজবাউল হক বলেন, ‘তারল্য ব্যবস্থাপনা তো ব্যাংকের নিজস্ব বিষয়। তবে আইন নীতিমালা মানতে তো বাধ্য। সবাই যদি কলমানি থেকে ইচ্ছামতো রেটে লেনদেন করে তাহলে তো রেট নির্ধারণের দরকার ছিল না। বাজার লাগামছাড়া হবে। শাস্তির আগে তদন্ত করবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। যাদের বিরুদ্ধে নিয়ম লঙ্ঘন দায় প্রমাণিত হবে, তারাই আইন অনুযায়ী শাস্তি পাবে।’

বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে জানা গেছে, গত ২৭ মার্চ কলমানির সুদের হার ১১ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ হিসাবে রেকর্ড ৯ দশমিক ৫ শতাংশে উঠেছে। ২০১২ সালের পর এটিই কলমানির সর্বোচ্চ সুদহার। ওই বছর কলমানির সুদের ১২ দশমিক ৮২ শতাংশে উঠেছিল সুদহার। ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে আইডিএলসি, ডিবিএইচ, পিএফআইএন, বে-লিজিং, বিডি ফাইন্যান্স ও আইসিবি নিয়ম লঙ্ঘনের মাধ্যমে কলমানি মার্কেটে লেনদেন করায় শাস্তির হুঁশিয়ারি জারি করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত