রবিবার, ১৪ এপ্রিল ২০২৪, ১ বৈশাখ ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের কাজ প্রায় শেষ

আপডেট : ০৩ এপ্রিল ২০২৪, ০২:২৪ এএম

করোনা মহামারী, মার্কিন নিষেধাজ্ঞাসহ নানা প্রতিকূলতা জয় করে দ্রুত এগিয়ে চলেছে পাবনার রূপপুরে নির্মাণাধীন দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের নির্মাণকাজ। সার্বিক দিক বিবেচনায় কেন্দ্রটির অন্তত ৮৫ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। সবকিছু ঠিক থাকলে ২০২৫ সালে কেন্দ্রটির ১২০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার প্রথম ইউনিট এবং এর পরের বছর একই ক্ষমতার দ্বিতীয় ইউনিট বাণিজ্যিকভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু করবে।

রাশিয়ার আর্থিক ও কারিগরি সহযোগিতায় রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত এ কেন্দ্রের নির্মাণকাজ করছে রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় পারমাণবিক সংস্থা রসাটম।

প্রকল্পসংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছে, বিদ্যুৎকেন্দ্রটির প্রথম ইউনিটের ভৌত নির্মাণকাজ শেষে সব ধরনের যন্ত্রপাতি স্থাপনও শেষ হয়েছে। এখন এর যন্ত্রপাতি পরীক্ষা ও প্রিকমিশনিংয়ের কাজ চলছে। চলতি বছরের মধ্যে প্রথম ইউনিটের স্টার্টআপ শুরু হবে। আগামী বছর থেকে এটি বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু করবে। দ্বিতীয় ইউনিটের কাজও সমান্তরালে এগিয়ে চলেছে দ্রুত গতিতে। ইতিমধ্যে সিভিল বা ভৌত কাজ প্রায় শেষের দিকে। সব কাজ শেষে ২০২৬ সাল নাগাদ দুটি ইউনিটের এই বিদ্যুৎকেন্দ্রটি পুরোদমে বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু করবে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিশ^বাজারে তেল, গ্যাস ও কয়লার মতো জীবাশ্ম জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির পাশাপাশি ডলারসংকটের কারণে প্রয়োজনীয় জ্বালানির অভাবে সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও গ্রীষ্মে চাহিদামতো বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যায় না। তা ছাড়া এর উৎপাদন খরচও প্রতিনিয়ত বাড়ছে। আবার এসব জ্বালানি পরিবেশের জন্যও ক্ষতিকর। এসব বিবেচনায় রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রটি চালু হলে জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে পরিবেশের সুরক্ষা দেবে। তা ছাড়া এর বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয়ও কয়লা ও তেলের চেয়ে অনেক কম।

পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নিয়ে আগে সারা বিশ্বে নিরাপত্তাবিষয়ক বড় ধরনের শঙ্কা থাকলেও আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে দিন দিন এটি নিরাপদ হয়ে উঠছে। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে ৩+ প্রজন্মের রুশ ভিভিইআর রি-অ্যাক্টর ব্যবহার করা হচ্ছে, যেগুলো সব আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা চাহিদা পূরণে সক্ষম।

প্রকল্পসংশ্লিষ্ট একজন কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, চুক্তি অনুযায়ী তিন বছর বিদ্যুৎ উৎপাদনে যে জ্বালানি ব্যবহৃত হবে, তা রাশিয়া বিনামূল্যে সরবরাহ করবে। একবার জ্বালানি লোড করার পর প্রথম তিন বছরের জন্য বছরে একবার করে (এক-তৃতীয়াংশ) এবং পরে দেড় বছর পরপর জ্বালানি পরিবর্তন করতে হবে। ফলে জ্বালানির কারণে দেশের অন্যান্য কেন্দ্র যেভাবে বন্ধ থাকে, এখানে ওই ধরনের কোনো সংকট তৈরি হবে না।

আমেরিকা, রাশিয়া, চীন, জাপানসহ বিশ্বে ৩২টি দেশ পারমাণবিক শক্তি ব্যবহার করছে। সেই তালিকায় ইতিমধ্যে নাম লিখিয়েছে বাংলাদেশ। গত ২৮ সেপ্টেম্বর রাশিয়া থেকে প্রথমবারের মতো দেশে আসে পারমাণবিক জ্বালানি ইউরেনিয়াম। পরদিন কড়া নিরাপত্তায় সে জ্বালানি পাঠানো হয় রূপপুরে।

পূর্ব নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী গত বছরের মধ্যে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের প্রথম ইউনিট থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের কথা ছিল। কিন্তু বিদ্যুতের সঞ্চালন লাইনের কাজ পিছিয়ে থাকায় অনেকটা ধীরে চলো নীতিতে চলছে পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের নির্মাণকাজ।

সঞ্চালন লাইন নির্মাণের সর্বশেষ অগ্রগতি সম্পর্কে জানতে গতকাল পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশের (পিজিসিবি) ব্যবস্থাপনা পরিচালক এ কে এম গাউছ মহীউদ্দিন আহমেদের মোবাইল ফোনে একাধিকবার ফোন দেওয়া হলেও তার সাড়া না পাওয়ায় এ ব্যাপারে বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।

আগে তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেছিলেন, ‘রূপপুর এবং আমরা এখন জয়েন্টলি (যৌথভাবে) কাজ করছি। আমরা সেভাবেই এগিয়ে যাচ্ছি। আশা করছি একই সঙ্গে হয়তো এগিয়ে যাব। কাজ চলছে। দুই মন্ত্রণালয়ের মধ্যেও নিয়মিত বৈঠক হচ্ছে। মনিটরিং করছি। আশা করছি কোনো সমস্যা হবে না।’

পিজিসিবির একজন কর্মকর্তা গতকাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, প্রথম ইউনিটের বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে যে সঞ্চালন লাইনের দরকার, তা আগামী সেপ্টেম্বরে শেষ হবে। আর দ্বিতীয় ইউনিটের সঞ্চালন লাইনের কাজ শেষ হবে এরও এক বছর পর অর্থাৎ ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে।

যদিও ২০১৮ সালে একনেকে অনুমোদন পাওয়া এই সঞ্চালন লাইনের নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল গত বছরের ডিসেম্বরে।

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের দায়িত্বশীল একটি সূত্র জানায়, তেল, গ্যাস বা কয়লাবিদ্যুৎ কেন্দ্রের তুলনায় পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ আলাদা। অন্যান্য কেন্দ্র ইচ্ছেমতো চালু করা বা বন্ধ করা গেলেও পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র হুটহাট করে চালু কিংবা বন্ধ করা যায় না। নিরাপত্তার স্বার্থে সঞ্চালন লাইন পুরোপুরি প্রস্তুত না হওয়া পর্যন্ত এ ধরনের কেন্দ্রে জ্বালানি লোড করার কোনো সুযোগ নেই। কারণ আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) অনুমোদন মিলবে না।

প্রকল্পসংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা জানান, বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ এবং সঞ্চালন লাইন নির্মাণকাজ সমন্বয় করতে দুই মন্ত্রণালয়ের (বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়) মধ্যে একটা চুক্তি হয়েছে। তারা যে টাইমলাইন ঠিক করে দিয়েছে, সেভাবেই চলছে। কারণ একবার ফুয়েল লোড করার পর এর রি-অ্যাকশন শুরু হলে উৎপাদিত বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য লাইনের অপেক্ষায় বসে থাকার কোনো সুযোগ নেই।

বিদ্যুৎ প্রকল্পসংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, কেন্দ্রের বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য ব্যবহৃত জ্বালানি ইউরেনিয়াম দন্ড ভরার পর কেন্দ্রটিতে বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু হতে তিন মাস লাগবে। নিয়ম অনুযায়ী আস্তে আস্তে উৎপাদন বাড়াতে হবে। এভাবে পূর্ণ ক্ষমতায় যেতে আরও ৭ মাস সময় লাগবে। সব মিলে ফুয়েল লোড করার পর পূর্ণ ক্ষমতায় বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে ১০ মাস সময় লাগবে।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত