শুক্রবার, ১৯ এপ্রিল ২০২৪, ৬ বৈশাখ ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

মোবাইল ব্যাংকিংয়ে প্রলোভনের ফাঁদ

আপডেট : ০৪ এপ্রিল ২০২৪, ০২:৩৮ এএম

মোবাইল ব্যাংকিংয়ে বেশি মুনাফা ও শিক্ষা বৃত্তি, বয়স্ক ভাতা ও বিধবা ভাতা দেওয়ার লোভ দেখিয়ে লাখ লাখ টাকা আত্মসাৎ করত তারা। এমন দুটি প্রতারক চক্রের ৯ সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে র‌্যাব। গত মঙ্গলবার রাতে ঢাকার দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ ও ফরিদপুরের ভাঙ্গা এলাকা থেকে তাদের গ্রেপ্তার করে র‌্যাব-১০-এর একটি দল।

গতকাল বুধবার দুপুরে কারওয়ান বাজারে র‌্যাব মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানান র‌্যাব-১০-এর অধিনায়ক অতিরিক্ত ডিআইজি মোহাম্মদ ফরিদ উদ্দিন। তিনি বলেন, সম্প্রতি কতিপয় প্রতারক চক্র রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় সাধারণ মানুষকে বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতা, ছাত্র-ছাত্রীদের উপবৃত্তি প্রদান ও মোবাইল ব্যাংকিং ব্যবসায় অধিক মুনাফার প্রলোভন দেখিয়ে মানুষের টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। এ বিষয়ে অভিযোগ পাওয়ার পর প্রতারক চক্রকে ধরতে গোয়েন্দা নজরদারি বৃদ্ধি ও নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করে আসছিল র‌্যাব-১০।

তিনি জানান, কক্সবাজারের পেকুয়া উপজেলায় বসবাসকারী ভুক্তভোগী ইসতাহাদ উদ্দিন সোহানের (১৯) মোবাইল নম্বরে গত ২২ মার্চ ৩টা ৩৬ মিনিটে কল দিয়ে তার নম্বরে উপবৃত্তির টাকা পাঠাবে বলে কৌশলে তার বিকাশের হিসাবের পিন নম্বর নিয়ে নেয় তারা। পরে ৩৮ লাখ ২৫৮ টাকা তার অ্যাকাউন্ট থেকে সরিয়ে ফেলে। এ ঘটনায় তিনি পেকুয়া থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করেন।

এ ছাড়া গত ২৪ মার্চ পেকুয়ার জান্নাতুল ফেরদৌস নামে এক শিক্ষার্থীর কাছ থেকে একই চক্র ২০ হাজার ৪০০ টাকা ও চট্টগ্রামের বাঁশখালী থানা এলাকার লোকমান হোসেনের কাছ থেকে তার ছেলের নামে উপবৃত্তির কথা বলে ১৬ হাজার ৩০০ টাকা হাতিয়ে নেয়।

র‌্যাব-১০-এর একটি দল গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে ঢাকা জেলার দক্ষিণ কেরানীগঞ্জে অভিযান পরিচালনা করে চক্রের অন্যতম মূলহোতা ইসমাইল মাতুব্বরসহ (২১) চারজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তিনি ফরিদপুর জুমুরকান্দার দেলোয়ার মাতুব্বরের ছেলে। অন্যরা হলেন ইসমাইলের ছোট ভাই ইব্রাহীম মাতুব্বর (২৭), সহযোগী মো. মানিক ওরফে মতিউর রহমান (১৯) ও সিনবাদ হোসেন (২৪)। এ সময় তাদের কাছ থেকে ২২টি মোবাইল ফোন, ৩৫টি সিম কার্ড, ৫টি মোবাইলের চার্জার, ১টি ল্যাপটপ, ১টি ব্যাগ ও নগদ ৩০ হাজার টাকা উদ্ধার করা হয়।

তদন্তকালে র‌্যাব-১০ আরও জানতে পারে অন্য আরেকটি প্রতারক চক্র গত ১৩ ফেব্রুয়ারি আব্দুল মমিন (৪২) নামে এক নতুন বিকাশ এজেন্টের কাছ থেকে প্রতারণার মাধ্যমে ৪২ হাজার ৭৭৭ টাকা হাতিয়ে নেয়। প্রতারক চক্রের বিরুদ্ধে ডিএমপি ঢাকার ডেমরা থানায় তিনি একটি সাধারণ ডায়েরি করেন। জিডির সূত্র ধরে মঙ্গলবার রাতে র‌্যাব-১০-এর দুটি পৃথক দল ঢাকা জেলার দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ ও ফরিদপুর জেলার ভাঙ্গা এলাকায় অভিযান চালিয়ে চক্রের অন্যতম মূলহোতা সুমন ইসলাম (২০), মাহমুদুল হাসান পলক (২০), সাব্বির খন্দকার (১৯), মো. সাকিব (১৯) ও রাসেল তালুকদারকে (২৩) গ্রেপ্তার করে। এ সময় তাদের কাছ থেকে ১৪টি মোবাইল ফোন, ৯১টি সিম কার্ড, ১টি ব্যাগ, ১০৪ পিস ইয়াবা ও ৫২ হাজার ৫০০ টাকা উদ্ধার করা হয়।

র‌্যাব-১০-এর অধিনায়ক ফরিদ বলেন, গ্রেপ্তার করা ইসমাইলের নেতৃত্বে চক্রটি প্রায় দুই বছর ধরে সাধারণ মানুষের সঙ্গে প্রতারণা করে অর্থ আত্মসাৎ করে আসছিল। নিরিবিলি স্থান হিসেবে তারা দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ এলাকা বেছে নেয়, যাতে নির্বিঘ্নে প্রতারণার কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারে।

প্রতারণার কৌশল : তারা প্রথমে উপবৃত্তির ওয়েবসাইট থেকে উপবৃত্তির তালিকা সংগ্রহ করত। ইসমাইল প্রথমে বিভিন্ন মোবাইল অ্যাপসের মাধ্যমে ক্লোন করে ভুক্তভোগীদের বিকাশ/নগদ অ্যাকাউন্ট খোলা মোবাইল নম্বরে ফোন দিয়ে নিজেকে শিক্ষা অধিদপ্তরসহ বিভিন্ন সরকারি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার পরিচয় দিয়ে বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতা ও ছাত্র-ছাত্রীদের উপবৃত্তি দেওয়ার কথা বলে প্রলুব্ধ করত এবং ওটিপি সংগ্রহ করত। ওটিপির মাধ্যমে ইসমাইল চক্র ভুক্তভোগীর হিসাব হ্যাক করে অন্য হিসাবে টাকা স্থানান্তর করত। একইভাবে তারা একাধিক ভুক্তভোগীর বিকাশ বা নগদ হিসাবের পাসওয়ার্ড সংগ্রহ করত এবং একটি মোবাইলে একাধিক বিকাশ বা নগদ অ্যাপস ডাউনলোড করে হিসাবে লগইন করে রাখত। ওই হিসাবে কোনো টাকা জমা হওয়া মাত্র ইসমাইল চক্রটি নোটিফিকেশনের মাধ্যমে জেনে যেতেন এবং সঙ্গে সঙ্গে টাকা তার অন্যান্য সহযোগী ইব্রাহিম, মানিক ও সিনবাদের হিসাবে স্থানান্তর করে দিতেন। পরে সিনবাদ তাদের আশপাশের অথবা দূরবর্তী বিভিন্ন এলাকা থেকে ক্যাশআউট করে টাকা ইসমাইলের কাছে নিয়ে আসার পর ভাগ-বাটোয়ারা হতো।

র‌্যাব-১০ জানিয়েছে, গত এক বছরে দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে শতাধিক সাধারণ মানুষের কাছ থেকে বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতা ও উপবৃত্তি দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে ২০ থেকে ২৫ লাখ টাকা আত্মসাৎ করেছে তারা।

অন্যদিকে গ্রেপ্তার সুমনকে জিজ্ঞাসাবাদে প্রাপ্ত তথ্যের বরাতে অতিরিক্ত ডিআইজি মোহাম্মদ ফরিদ উদ্দিন বলেন, সুমন ইসলাম মোবাইল ব্যাংকিং ব্যবসায় অধিক মুনাফার প্রলোভন দেখিয়ে এজেন্টদের কাছ থেকে বিকাশ ও নগদের মাধ্যমে অর্থ আত্মসাৎকারী চক্রটির মূলহোতা। তার নেতৃত্বে চক্রটি প্রায় আট থেকে নয় মাস ধরে বিভিন্ন বিকাশ বা নগদ ব্যবসায়ী এজেন্টদের সঙ্গে প্রতারণা করে অর্থ আত্মসাৎ করে আসছিল। এজেন্টদের হাজারে ৪ টাকার পরিবর্তে ৮ থেকে ১০ টাকা দেওয়ার বিভিন্ন অফার দিত এ চক্রটি। এ ক্ষেত্রে এজেন্টরা অফার সম্পর্কে অবগত নন বললে সুমন এজেন্টদের কাছ থেকে বিকাশ/নগদের এসআরের ফোন নম্বর নিয়ে ক্লোন করে এজেন্টদের ফোন করে সার্ভিস রিপ্রেজেনটেটিভের (এসআর) পরিচয় দিয়ে বলতেন, ‘উনি আমাদের বস। উনি যা বলেন সেভাবে কাজ করেন।’ তারপর সুমন মোবাইলে ওটিপি প্রেরণের মাধ্যমে কৌশলে এজেন্টদের কাছ থেকে বিকাশ/নগদের এজেন্ট নম্বরের পাসওয়ার্ডটি সংগ্রহ করতেন।

একইভাবে একাধিক ভুক্তভোগীর পাসওয়ার্ড সংগ্রহ করে একটি মোবাইলে একাধিক বিকাশ/নগদ অ্যাপস ডাউনলোড করে প্রত্যেকটি হিসাবে লগইন করে রাখতেন সুমন। ওইসব হিসাবে টাকা জমা হওয়া মাত্র সুমন সহযোগীদের হিসাবে স্থানান্তর করে দিতেন। চক্রটি দুই বছরে দেশের বিভিন্ন এলাকার প্রায় ৬০ থেকে ৭০ জন বিকাশ/নগদ এজেন্ট ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে প্রায় ৫০ লাখ টাকা আত্মসাৎ করেছে।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত