জঙ্গিদের সহযোগিতা করার বিষয়টি উদঘাটনের পর বান্দরবানের বেশ কয়েকটি উপজেলায় ব্যাপক অভিযান চালিয়েছিল আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। গত বছর চালানো এ অভিযানে সাম্প্রতিক সময়ে আলোচনায় আসা কুকি-চিন ন্যাশনাল ফ্রন্টের বেশ কয়েকজন ধরাও পড়ে। এরপর বিচ্ছিন্নতাবাদী এ গোষ্ঠীর সঙ্গে শান্তি আলোচনা শুরু হয়েছিল। এ মাসের শেষের দিকে আরেক দফা আলোচনা বসার কথা থাকলেও সংগঠনটি হঠাৎ করে হামলা করে বসে রুমার সোনালী ব্যাংকে। এ ঘটনার পর থানচিতে হানা দেয় সোনালী ও কৃষি ব্যাংকে। তাতেও থেমে না থেকে গত বৃহস্পতিবার রাতে হামলা চালায় থানচি বাজার ও থানায়। প্রায় এক ঘণ্টা গোলাগুলি হয়।
হামলার জন্য কেএনএফকে দায়ী করে সরকারের পক্ষ থেকে ভাষ্য পাওয়া গেলেও সংগঠনটি কিছু বলেনি। শান্তি আলোচনার জন্য গঠিত কমিটি ইতিমধ্যে পরবর্তী আলোচনা স্থগিত করেছে। হঠাৎ করে কেএনএফের সন্ত্রাসী তৎপরতা নিয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বিচার-বিশ্লেষণ করছে। সরকারের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো অনেকটা নিশ্চিত হয়েছে, তৃতীয়পক্ষের ইন্ধনে কেএনএফ বেপরোয়া হয়ে উঠছে। তারা শান্তি আলোচনায় থাকছে না।
পুলিশের একটি সূত্রমতে, মিয়ানমারের বিদ্রোহী আরাকান আর্মির একটি গ্রুপ ও আসামের অন্য একটি গ্রুপ কেএনএফকে ইন্ধন দিচ্ছে। তারা চায় পাহাড় অস্থিতিশীল করে রাখতে। কেএনএফ মনে করছে, এতে করে তারা লাভবান হবে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো দেশ রূপান্তরকে জানায়, বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠনটি ইসলামপন্থি জঙ্গি কার্যক্রমেও জড়িত। তাদের সঙ্গে নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি সংগঠনের শীর্ষ নেতাদের নিয়মিত যোগাযোগ হয়। গত বছর জামা’আতুল আনসার আল ফিল হিন্দাল শারক্বীয়ার সঙ্গে তাদের যোগসাজশের বিষয়টি প্রকাশ্যে এসেছে।
কেএনএফ রাঙ্গামাটির সাজেক উপত্যকা বাঘাইছড়ি, বরকল, জুরাছড়ি, বিলাইছড়ি, বান্দরবান উপকণ্ঠ থেকে চিম্বুক পাহাড়ের ম্রো অঞ্চল হয়ে রুমা, রোয়াংছড়ি, থানচি, লামা ও আলীকদমসহ নয়টি উপজেলা নিয়ে পূর্ণ স্বায়ত্তশাসিত একটি কল্পিত পৃথক ‘রাজ্য’ চায়। তাদের সঙ্গে সন্তু লারমার পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি ও ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট-গণতান্ত্রিকের (ইউপিডিএফ-গণতান্ত্রিক) বিরোধ রয়েছে। সন্তু লারমাকে টেক্কা দিয়ে সংগঠনটির প্রধান নাথান লনচেও বমকে লাইম লাইটে আনার চেষ্টা চালাচ্ছে কেএনএফ।
শুরু থেকেই সংগঠনটির বিরুদ্ধে কয়েকটি সশস্ত্র অভিযান চালিয়ে চাঁদাবাজি এবং হত্যার অভিযোগ উঠতে থাকে। তাদের একের পর এক হামলায় পার্বত্য চট্টগ্রামের লোকজনের মধ্যে উদ্বেগ ও আতঙ্ক তৈরি করেছে।
সূত্র জানায়, পাহাড়ে কেএনএফের এমন হামলার পর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, আইজিপি, বিজিবির মহাপরিচালক ও র্যাব মহাপরিচালকসহ গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর শীর্ষ কর্তারা দফায় দফায় বৈঠক করেছেন। সরকারের হাইকমান্ড থেকে কড়া হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে। কেএনএফের সন্ত্রাসী কর্মকান্ড কঠোরভাবে নির্মূল করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। সংগঠনটির বিরুদ্ধে বিশেষ অভিযান চালানোর প্রস্তুতি নিয়ে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো বিশেষ বৈঠক করেছে।
নাম প্রকাশ না করে পুলিশ সদর দপ্তরের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা গতকাল শুক্রবার দেশ রূপান্তরকে বলেন, শান্তিচুক্তি বানচাল করতে তৃতীয়পক্ষ কেএনএফকে ইন্ধন দিচ্ছে। ব্যাংক, বাজার, মসজিদ ও থানায় হামলা চালানোর আগে সংগঠনটির সদস্যরা কিছুটা শান্ত ছিল। কিন্তু তৃতীয়পক্ষের আশকারা পেয়ে বেপরোয়া হয়ে উঠছে। তৃতীয়পক্ষের সঙ্গে মিয়ানমারে আরাকান আর্মি ও আসামের একটি সস্ত্রাসী গোষ্ঠীর বিষয়ে তথ্য পাওয়া যাচ্ছে।
ওই কর্মকর্তা বলেন, শান্তি প্রক্রিয়া এগিয়ে নিতে চায় না কেএনএফ। তৃতীয়পক্ষটি তাদের দিয়ে পাহাড়ে অস্থিতিশীল করতে চাচ্ছে। তারা প্রশাসনকে অস্থিরতার মধ্যে রাখতে চাচ্ছে। এসব কারণেই তৃতীয়পক্ষ তাদের পক্ষে কাজ করছে।
তিনি বলেন, কেএনএফের সদস্যরা চাঁদাবাজি করে শীর্ষ নেতাদের কাছে পাঠিয়ে দেয় অর্থ। কিন্তু মাঠপর্যায়ে যারা চাঁদাবাজি করে তারা অর্থ না পেয়ে দুর্দশার মধ্যে থাকছে বলে পুলিশ তথ্য পেয়েছে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, কেএনএফকে যারাই ইন্ধন দেবে তাদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনা হবে।
র্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন বলেছেন, মূলত টাকা লুট ও কেএনএফের সক্ষমতা জানান দিতেই বান্দরবানের রুমা ও থানচিতে ব্যাংক ডাকাতি, অস্ত্র লুট ও হামলা করা হয়েছে। বান্দরবান জেলায় বেশ কয়েকটি আঞ্চলিক সংগঠন রয়েছে। তাদের মধ্যে শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠা, উত্তরসূরিদের অনুপ্রেরণা ও বহির্বিশ্বে তাদের সহযোগীদের সংগঠনটির সক্ষমতা জানান দিচ্ছে। আড়ালে থেকে তাদের যারা সহায়তা করছে বা করবে তাদেরও আইনের আওতায় আনা হবেই।
কেএনএফের সামর্থ্য, বিস্তৃতি ও সদস্যসংখ্যা বাড়ানোর একটা ইঙ্গিত এসব হামলার মধ্য দিয়ে স্পষ্ট হয়ে ওঠে বলে মনে করছেন নিরাপত্তাসংশ্লিষ্ট অনেকেই। তারা বলছেন, পাহাড়ের কোনো বড় গোষ্ঠীর সঙ্গেও তাদের বোঝাপড়া হয়ে থাকতে পারে। ওই গোষ্ঠীটি চায় না কেএনএফ শান্তি আলোচনা চালিয়ে যাক। কারণ এতে তাদের প্রভাববলয় নষ্ট হয়ে যেতে পারে।
এ ছাড়া ভারতের মণিপুর রাজ্যে কুকি জনগোষ্ঠীর সঙ্গে স্থানীয় মেইতেইদের সশস্ত্র সংঘাতেরও সম্পর্ক থাকতে পারে।
সংগঠনটি দুই বছরে অন্তত নয়টি বড় ধরনের হামলা চালিয়েছে। গত বছর তাদের চারটি হামলার ঘটনায় পাঁচ সেনাসদস্য নিহত হয়েছেন। আরেক সশস্ত্র গোষ্ঠী ইউপিডিএফের (গণতান্ত্রিক) সঙ্গে সংঘর্ষে গত বছর রোয়াংছড়ি উপজেলার খামতাংপাড়া এলাকায় আটজন এবং রুমা উপজেলার মুয়ালপিপাড়া একজন নিহত হয়। গত বছর রোয়াংছড়ির পাইংখিয়াংপাড়া আওয়ামী লীগের এক নেতাসহ বম জনগোষ্ঠীর তিনজন এবং একই উপজেলার রামথারপাড়ায় এক কারবারিকে (পাড়াপ্রধান) গুলি করে হত্যা করা হয়। ২০২২ সালে রাঙ্গামাটির বিলাইছড়ির বড়থলি ইউনিয়নের সাইজামপাড়ায় তিন ব্যক্তিকে গুলি করে হত্যা করে সন্ত্রাসীরা।
গত বছর জঙ্গিদের সঙ্গে সম্পর্কের বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার পর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অভিযান চালায়, তখন বিশেষ করে রুমা, থানচিসহ পাহাড়ের বিভিন্ন এলাকা কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে থাকে। বমদের কেউ কেউ সীমান্ত পাড়ি দিয়ে ভারতের মিজোরামে চলে যায়। বম জাতিগোষ্ঠীর সাধারণ মানুষ বিপাকে পড়ে। এ সময়টার সুযোগ নেয় কেএনএফ। আর তখন নতুন করে বেশ কিছুসংখ্যক যুবককে তারা দলে ভেড়ায় বলে স্থানীয় একাধিক সূত্রে জানা গেছে।
এলাকাবাসী আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে জানায়, পার্বত্যাঞ্চলে কেএনএফ ভয়ংকর হয়ে উঠছে। তারা বিভিন্ন সরকারি প্রকল্প, টেন্ডার, সরকারি অফিস-আদালত, কৃষি সব খাত থেকে চাঁদা তুলছে নিয়মিত। চাঁদার ভাগ সংগঠনটির সদস্য থেকে শুরু করে বিভিন্ন খাতেও যাচ্ছে। এ কারণে তাদের সঙ্গে ওইসব খাতের কতিপয় কর্মকর্তার সখ্য রয়েছে।
স্থানীয় লোকজন বলছেন, মুরগি নিয়ে বাজারে গেলেও তাদের চাঁদা দিতে হচ্ছে। এমন একটি সংগঠনকে শান্তি আলোচনার নামে সুযোগ দেওয়ার কারণে তারা নিজেদের শক্তি বাড়িয়েছে। আবার গহিন অরণ্যে আস্তানা গাড়ার সুযোগ পেয়েছে। প্রকাশ্যে ব্যাংক লুট করার সাহস দেখিয়েছে।
পুলিশ কর্মকর্তারা জানান, গত বছর র্যাবসহ যৌথবাহিনী জঙ্গি আস্তানা গুঁড়িয়ে দেওয়া পর ব্যাপক অভিযানের মুখে আত্মগোপনে চলে যায় কেএনএফ সন্ত্রাসীরা। একপর্যায়ে আলোচনার প্রস্তাব আসে কেএনএফ আত্মসমর্পণ করবে। আর এ আলোচনা সফল করার দায়িত্ব দেওয়া হয় বান্দরবান জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ক্য শৈ হ্লাকে। তিনি শান্তি প্রতিষ্ঠা কমিটিরও চেয়ারম্যান। কিন্তু শান্তি আলোচনার নামে কেএনএফ এলাকায় নেটওয়ার্ক শক্তিশালী করেছে।
