ফেনীর ছাগলনাইয়ার মুহুরীগঞ্জ ব্রিজসংলগ্ন রেলক্রসিংয়ে গতকাল শুক্রবার সকালে ছিলেন না কোনো গেটম্যান। ট্রেন আসার সময় হলেও সেই ক্রসিংয়ে ফেলা হয়নি কোনো ব্যারিয়ার। প্রতিবন্ধকতা না থাকায় একটি বালুবাহী ট্রাক ক্রসিংয়ে উঠে পড়ে পারাপারের জন্য। কিন্তু সে সময়ই চট্টগ্রামগামী মেইল ট্রেনটিও চলে আসে। ট্রাকটিকে ধাক্কা দিয়ে নিয়ে যায় মুহুরীগঞ্জ ব্রিজে। গতকাল সকাল সোয়া ৮টার দিকের ওই দুর্ঘটনায় ট্রাক ও ট্রেনের ছয়জন নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে আছেন কুমিল্লার একই গ্রামের তিন বন্ধু। তারা ঈদের কেনাকাটার জন্য ট্রেনে চেপে চট্টগ্রাম যাচ্ছিলেন।
গতকাল সন্ধ্যায় ফেনীর পুলিশ সুপার জাকির হাসান দুর্ঘটনায় ছয়জনের মৃত্যুর খবরটি নিশ্চিত করেন। তার দেওয়া তথ্য মতে, দুর্ঘটনায় নিহতরা হলেন বরিশালের উজিরপুর উপজেলার কাউয়ারাকা গ্রামের আবুল হাওলাদারের ছেলে ট্রাকচালক মো. মিজান (৩২), কুমিল্লার লাকসাম মনোহরপুরের আবুল খায়ের (৪০) ও তার ছেলে মো. আশিক, কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামের চিওড়া ইউনিয়নের সাততলা এলাকার রুহুল আমীনের ছেলে রিফাত (১৯), একই এলাকার মো. ইয়াসীনের ছেলে সাজ্জাদ (২০) এবং নূর আহম্মদের ছেলে দ্বীন মোহাম্মদ (২১)।
পুলিশ সুপার জানান, রিফাত, সাজ্জাদ ও দ্বীন মোহাম্মদ ট্রেনের ইঞ্জিনের সামনে বসা ছিল। বাকিরা ট্রাকের চালক, চালকের সহকারী ও বালুশ্রমিক।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, ট্রেন চলাচলের সময় গেট না ফেলার কারণে এ মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটেছে। ঘটনার পর থেকে গেটম্যান মো. সাইফুল পলাতক রয়েছেন।
পুলিশ বলছে, মুহুরীগঞ্জ ব্রিজসংলগ্ন এলাকায় ই/৩২(১) নম্বর রেলগেটে সকালে কোনো গেটম্যান দায়িত্বরত অবস্থায় ছিলেন না। এ সময় চট্টগ্রামগামী মেইল ট্রেন অতিক্রম করার সময় গেট ব্যারিয়ার দাঁড়া অবস্থায় ছিল। বালুবাহী ট্রাক রেললাইন পার হওয়ার সময় দুর্ঘটনার শিকার হয়।
ফেনী রেলওয়ে পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ জাহাঙ্গীর আলম বলেন, চট্টগ্রামগামী একটি মালবাহী ট্রেনের সঙ্গে মুহুরীগঞ্জ এলাকায় বালুবাহী একটি ট্রাকের সংঘর্ষ হয়। এতে ঘটনাস্থলে ছয়জন নিহত হয়েছেন। তাদের মরদেহ ফেনী জেনারেল হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে।
পুলিশ সুপার মো. জাকির হাসান জানান, বালুবাহী ট্রাক রেলক্রসিং করার সময় ট্রাকের পেছনের অংশে লেগে দুর্ঘটনা ঘটে। ঘটনাস্থল পরিদর্শন করা হয়েছে এবং তদন্তসাপেক্ষে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এদিকে কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম প্রতিনিধি জানান, নিহত সাজ্জাদ, রিফাত ও দ্বীন মোহাম্মদ স্থানীয় ধোড়করা বাজারে ওয়ার্কশপসহ বিভিন্ন দোকানে কাজ করতেন। ঈদের কেনাকাটা করতে তারা তিনজনসহ ১১ বন্ধু মিলে নাঙ্গলকোট উপজেলার হাসানপুর রেলস্টেশন থেকে ট্রেনযোগে চট্টগ্রামের উদ্দেশে রওনা করেন। ট্রেনে ওঠার ঠিক আগমুহূর্তেই তারা স্টেশন এলাকায় যৌথ সেলফি তুলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে পোস্টও করেছেন। তাদের সঙ্গে ছিলেন চিওড়া ইউনিয়নের শাকতলা গ্রামের মো. কেফায়েত উল্লাহ ও মো. আব্দুল্লাহ। তারা সাংবাদিকদের বলেন, ফেনী রেলস্টেশন থেকে ট্রেনটি ছাড়ার পর দ্বীন মোহাম্মদ, রিফাত ও সাজ্জাদ ট্রেনের ইঞ্জিনের সামনের রেলিংয়ে গিয়ে বসে। ঘটনাস্থলেই আমাদের তিন বন্ধু নিহত হয়েছে। স্থানীয়দের সহযোগিতায় একটি মাইক্রোবাসে করে তিন বন্ধুর লাশ বাড়িতে নিয়ে আসি। বিষয়টি তাৎক্ষণিক রেল পুলিশের নজরে আসেনি বলে জানিয়েছেন তারা।
নিহত সাজ্জাদের পিতা ইয়াছিন বলেন, ‘সাহরি খেয়ে তারা বেরিয়ে যায়, সকালে আমি গরুর জন্য ঘাস কাটতে মাঠে চলে যাই। মাঠে থাকা অবস্থায়ই দুর্ঘটনার খবর পাই।’
চিওড়া ইউপি চেয়ারম্যান মো. আবু তাহের বলেন, নিহতদের লাশ বাড়িতে নিয়ে আসার পর বিকেল ৪টায় জানাজা শেষে একই কবরস্থানে তাদের দাফন করা হয়েছে। এ ঘটনায় এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
ফেনী রেলওয়ের স্টেশন মাস্টার ইমাম উদ্দিন সেন্টু বলেন, বালুবাহী একটি ট্রাক রেললাইন পার হওয়ার সময় ট্রেনের সঙ্গে ধাক্কা লাগে। কিছুক্ষণ রেল চলাচল বিঘ্নিত হলেও পরে ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটে ট্রেন চলাচল স্বাভাবিক হয়েছে।
