মিয়ানমারে জান্তা বাহিনী ও বিদ্রোহী আরাকান আর্মির মধ্যে সংঘাত চলছে। ওই দেশ থেকে বিতাড়িত হয়ে কয়েক লাখ রোহিঙ্গা কক্সাবাজারে আশ্রিত। তাদের প্রত্যাবাসনের প্রক্রিয়া থমকে আছে। এ অবস্থায় দেশের সীমান্ত এলাকা ঘেঁষে আরাকান আর্মির তৎপরতার পাশাপাশি নতুন করে কুকি-চিন ন্যাশনাল ফ্রন্ট (কেএনএফ) বেপরোয়া হয়ে ওঠায় সীমান্ত এলাকা অস্থির হয়ে উঠতে পারে। এ ছাড়া নতুন করে কিছু প্রশ্ন উঠেছে শান্তি আলোচনার মধ্যে থাকা কেএনএফ কেন আবার হামলার ঘটনা ঘটিয়েছে? নাকি অন্য কোনো সশস্ত্র গোষ্ঠী এই হামলা চালিয়েছে। এর পেছনে ভূরাজনৈতিক কোনো সমীকরণ আছে কি না?
এমন পরিস্থিতিকে উদ্বেগজনক হিসেবে দেখছেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা। যে কারণে কেএনএফের সশস্ত্র তৎপরতা যেকোনোভাবেই হোক বন্ধ করার পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সূত্রগুলো বলছে, মিয়ানমার সীমান্তের অস্থিরতার সুযোগে বেপরোয়া আচরণ করছে কেএনএফ। কয়েক দিন ধরে তাদের আগ্রাসী হামলার ঘটনায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী থেকে শুরু করে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর শীর্ষ কর্তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করছেন। তা ছাড়া সরকারের নীতিনির্ধারকরা পুলিশ, র্যাব ও বিজিবির শীর্ষ কর্তাদের দিকনির্দেশনা দিচ্ছেন।
পার্বত্য চট্টগ্রামঘেঁষা সীমান্ত এলাকা ও বান্দরবানে হামলার স্থানসহ আশপাশের এলাকায় থাকা ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরার ফুটেজ সংগ্রহ করেছে পুলিশ ও র্যাব। তারা ফুটেজগুলো বিশ্লেষণ করে হামলাকারীদের চিহ্নিত করার চেষ্টা করছে। ইতিমধ্যে কয়েকজন হামলাকারীকে চিহ্নিত করা হয়েছে বলে জানা গেছে।
জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান গতকাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, পার্বত্যাঞ্চলের আশপাশে যেখানে সীমান্ত এলাকা আছে, সেখানে কঠোর নিরাপত্তাবলয় গড়ে তোলা হয়েছে। যেকোনো পরিস্থিতি এড়াতে নজরদারি করা হচ্ছে। কেএনএফের তৎপরতা রোধ করতে সব ধরনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।
পুলিশ সদর দপ্তরের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, সীমান্তের উত্তেজনার সুযোগে কেএনএফ হামলা চালানোর মতো সাহস পাচ্ছে। মিয়ানমারের আরাকান আর্মির সঙ্গে কেএনএফের ভালো যোগাযোগ আছে।
এদিকে ভারতের মণিপুরে কুকিদের সঙ্গে স্থানীয় মেইতেইদের সংঘাত লেগেই আছে। সেখানকার কুকিদের সঙ্গেও কেএনএফের যোগাযোগ আছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। কেএনএফসহ তিন দেশীয় সন্ত্রাসীদের মধ্যে যোগাযোগ গড়ে ওঠার বিষয়টি একেবারেই উড়িয়ে দেওয়া যায় না। সীমান্তে অস্থিরতার সুযোগ রোহিঙ্গা সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলো নিতে পারে। ফলে তাদের মিয়ানমারে ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়াও অনিশ্চিত হয়ে যেতে পারে। কক্সবাজার এলাকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিরও অবনতি ঘটতে পারে।
সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে অস্ত্রের লেনদেন এবং পরস্পরকে সহায়তা করার বিষয়টিও থাকতে পারে। সে কারণে অর্থ সংগ্রহের জন্য কেএনএফ ব্যাংকে হামলা চালাতে পারে বলে মনে করছেন পুলিশ সদর দপ্তরের ওই কর্মকর্তা। তিনি বলেন, ‘আরেকটা বিষয়েও আমরা তদন্ত করছি কেএনএফের পোশাক পরে অন্য কোনো সন্ত্রাসী গোষ্ঠী হামলা করেছে কি না। ওই এলাকায় এখনো অনেক সন্ত্রাসী গ্রুপ সক্রিয় আছে।’ উচ্চপদস্থ ওই কর্মকর্তা বলেন, ‘সীমান্ত এলাকা নিয়ে আমাদের মধ্যে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। সীমান্ত এলাকা দিয়ে যাতে কোনো ধরনের আগ্নেয়াস্ত্র ও অপরিচিত লোকজন প্রবেশ করতে না পারে, সে জন্য কঠোর নজরদারি করা হচ্ছে। আমরাও বিস্মিত হয়েছি, তারা পরপর ব্যাংক ও থানায় আক্রমণের এত শক্তি কোথায় পেল?’
তিনি জানান, কেএনএফ এখন আর শান্তি কমিটির সঙ্গে যোগাযোগ করছে না। কমিটিও যোগাযোগের চেষ্টা করে তাদের পাচ্ছে না।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা দেশ রূপান্তরকে জানান, গত বছরের ২৯ মে কেএনএফের সঙ্গে সমঝোতা করেছিল শান্তি স্থাপন কমিটির আহ্বায়ক ও বান্দরবান জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ক্য শৈ হ্লার নেতৃত্বাধীন ১৮ সদস্যের কমিটি। চার দফা সমঝোতার মূল বিষয় ছিল চাঁদাবাজি ও আক্রমণ না করা, শান্তি বজায় রাখা ইত্যাদি। সমঝোতার পর কিছুদিন সংগঠনটির সদস্যদের কোনো সন্ত্রাসী তৎপরতা ছিল না। তবে তাদের চাঁদাবাজি থামেনি। তারা নিরীহ মানুষজনকে টার্গেট করে চাঁদাবাজি করে।
ওই কর্মকর্তারা বলেন, তিন দিন আগে কেএনএফ যেভাবে হামলা করেছে তাতে সবার মধ্যে নানা প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে। রুমা ও থানচির তিনটি ব্যাংকে ডাকাতি এবং পরে থানচি থানায়, বাজার ও হাসপাতাল এলাকায় হামলা করে তারা।
কেএনএফ আলোচনায় আসে ২০২২ সালে। পুলিশ ও র্যাব তখন তাদের বিরুদ্ধে অভিযান চালায়। সেনাবাহিনীসহ যৌথ অভিযানও পরিচালনা করা হয়। গত বছর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী জানায়, সমতলের জঙ্গিদের প্রশিক্ষণের জন্য কেএনএফের সঙ্গে জামাতুল আনসার ফিল হিন্দাল শারক্বীয়া নামে একটি জঙ্গি সংগঠন অর্থের বিনিময়ে চুক্তি করেছে। অভিযানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী গহিন জঙ্গল থেকে জঙ্গি ও কেএনএফের বেশ কয়েকজন সদস্যকে গ্রেপ্তার করে। গুঁড়িয়ে দেওয়া হয় তাদের আস্তানা। যৌথ বাহিনীর অভিযানের মুখে তারা মিজোরাম সীমান্তের দুর্গম অঞ্চলে পিছু হটে।
কেএনএফ পার্বত্য তিন জেলার প্রায় অর্ধেক আয়তনের অঞ্চল তথা লামা, রুমা, আলীকদম, থানচি, রোয়াংছড়ি, বিলাইছড়ি, জুরাছড়ি, বরকলসহ আশপাশের এলাকায় তৎপর রয়েছে। কেএনএফপ্রধান হলেন নাথান বম। তারা কথিত ‘কুকিল্যান্ড’ প্রতিষ্ঠা করতে চায়। তাদের একটি ম্যাপও আছে কথিত ওই কুকিল্যান্ডের। বম বা কুকি সম্প্রদায়ের লোকজন ভারতের মণিপুর ও মিজোরাম এবং মিয়ানমারে রয়েছে। ওই দুই দেশেও তাদের বিচ্ছিন্নতাবাদী তৎপরতা আছে।
নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর জেনারেল (অব.) আব্দুর রশিদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘কেএনএফ একটি ক্রস বর্ডার বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠী। তারা ভারতের মণিপুর ও মিজোরাম এবং মিয়ানমারে সক্রিয়। ওই সব এলাকায় এই সময়ে যে অস্থিরতা চলছে, এরই প্রভাবে কেএনএফ ফের তৎপর হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। সীমান্ত এলাকায় আমাদের নজরদারি বাড়াতে হবে।’
মেজর জেনারেল রশিদ বলেন, ‘কেএনএফ যেভাবে ব্যাংক, বাজার ও থানায় হামলা করেছে তা দেখে আমরা স্তম্ভিত। তাদের এখনই প্রতিরোধ করতে না পারলে সামনের দিনে অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটার আশঙ্কা রয়েছে। ভূরাজনৈতিক কারণে কোনো দেশ তাদের মদদ দিচ্ছে কি না, তা-ও খতিয়ে দেখতে হবে।’
পুলিশ সূত্র জানায়, বাংলাদেশের বান্দরবান জেলার ঘুমধুম-তমব্রু সীমান্ত এলাকা বেশি নজরদারির আওতায় আনা হয়েছে। এই সীমান্তে আরাকান আর্মির তৎপরতা সবচেয়ে বেশি। কেএনএফ সদস্যদেরও এ অঞ্চলে দেখা যেত।
১৯৯৭ সালে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বা শান্তিচুক্তির পর চুক্তিবিরোধী গোষ্ঠী ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ) নামে একটি সংগঠন গড়ে তোলে। তাদের সঙ্গে চুক্তির পক্ষের সংগঠন পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির (জেএসএস) সংঘাত রয়েছে। ২০০৭ সালে জেএসএসের একটি অংশ মূল দল থেকে বের হয়ে জেএসএস (এম এন লারমা) নামে আরেকটি সংগঠন গড়ে তোলে। ২০১১ সালের মাঝামাঝি সময় ম্রো ন্যাশনাল পার্টি (এমএনপি) নামে একটি দল গড়ে ওঠে বান্দরবানের আলীকদমে। ২০১৫ সালের নভেম্বরে দলটির ৭৯ জন সদস্য একযোগে আত্মসমর্পণ করেন। এরপর থেকে ওই গোষ্ঠীর তৎপরতা থেমে যায়। ২০১৭ সালে ইউপিডিএফ গণতান্ত্রিক নামে আরেক সংগঠনের আত্মপ্রকাশ ঘটে। ২০১৮ সালে বান্দরবানে ‘মগ পার্টি’র তৎপরতার তথ্য সামনে আসে। এসব মিলিয়ে পাহাড়ি অঞ্চলে ছোট-বড় বেশ কয়েকটি সশস্ত্র সংগঠন গড়ে ওঠে।
পুলিশ ও র্যাবের দুই কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, কেএনএফের সঙ্গে আরাকান আর্মির যোগাযোগের বিষয়ে তারা নিশ্চিত। মিয়ানমারে জান্তাবিরোধী লড়াই করছে আরাকান আর্মি। সেখানে তাদের খাদ্য-জ্বালানিসহ প্রয়োজনীয় রসদ প্রয়োজন হচ্ছে। কেএএনএফ তাদের সহায়তা করছে। কেএনএফের সঙ্গে ২২ এপ্রিল বৈঠক হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু কেএনএফের কিছু সদস্য সশস্ত্র সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়ার পক্ষে থাকায় তারা হামলা করছে। আবার অন্য একটি পক্ষ শান্তি প্রতিষ্ঠার পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। দ্বিধাবিভক্ত হওয়ার পর একটি অংশ আরাকান আর্মির কাছ থেকে অস্ত্র-গুলি সংগ্রহ করার চেষ্টা করছে বলেও তারা তথ্য পেয়েছেন।
পুলিশের চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি নূরে আলম মিনা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘প্রযুক্তিগত তদন্ত ও গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে ব্যাংক ডাকাতি এবং থানায় হামলায় জড়িত কেএনএফ সশস্ত্র গ্রুপকে শনাক্ত করার চেষ্টা চলছে। হামলার সময় কেএনএফের নারী সদস্যদের অস্ত্রসহ দেখা গেছে বলে আমরা তথ্য পেয়েছি। তাদের ধরতে পুলিশের সব কটি ইউনিট কাজ করছে।’
