দেশে উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে মানুষের অত্যাবশ্যকীয় স্বাস্থ্যসেবায় (ইএসপি) বছরে ব্যয় হচ্ছে ৩৮০ বিলিয়ন বা ৩৮ হাজার কোটি টাকা। এটি দেশে স্বাস্থ্যসেবায় মোট ব্যয়ের (৭৭,৫৫১ কোটি টাকা) প্রায় অর্ধেক অর্থাৎ ৪৯ শতাংশ। ইএসপিতে সরকার দিচ্ছে মোট ব্যয়ের ২৭ শতাংশ বা ১০ হাজার কোটি টাকা। বাকি ৭৩ শতাংশ বা ২৮ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হচ্ছে বেসরকারি খাতে।
এ স্বাস্থ্যসেবায় জনপ্রতি বছরে ব্যয় হচ্ছে ২ হাজার ২৩৫ টাকা। এর মধ্যে সরকারের ৫৯৩ ও বেসরকারিভাবে ব্যয় হচ্ছে ১ হাজার ৬৪২ টাকা। এমনকি এ স্বাস্থ্যসেবা পেতে মানুষের পকেট থেকে যাচ্ছে (আউট অব পকেট) মোট ব্যয়ের ৬৫ শতাংশ অর্থ। মাত্র ২৭ শতাংশ অর্থের জোগান দিচ্ছে সরকার। বাকি ৭ শতাংশ আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য সংস্থা ও ১ শতাংশ অর্থ আসছে স্বেচ্ছাসেবী স্বাস্থ্য সংস্থাগুলো থেকে।
সরকারের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইউনিটের সর্বশেষ ‘ট্রাকিং এক্সপেন্ডিচার অব বাংলাদেশ এসেনশিয়াল হেলথ সার্ভিস প্যাকেজ-১৯৯৭-২০২০’ শীর্ষক গবেষণায় এসব তথ্য উঠে এসেছে। গত বছরের সেপ্টেম্বরে প্রতিষ্ঠানটি এ তথ্য প্রকাশ করে।
গ্রামীণ জনপদের মানুষের জন্য অত্যাবশ্যকীয় স্বাস্থ্যসেবায় বরাদ্দ অর্থ অপ্রতুল বলে মন্তব্য করেছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলেছেন, স্বাস্থ্যব্যবস্থার পদ্ধতিগত ত্রুটির কারণে বরাদ্দ অর্থ দিয়ে যেটুকু সেবা পাওয়ার কথা, মানুষ সেটাও পাচ্ছে না।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ইএসপি বা এসেনশিয়াল সার্ভিস প্যাকেজ হলো উপজেলা থেকে ইউনিয়ন পর্যন্ত মানুষের স্বাস্থ্যসেবায় সরকারি কর্মসূচি। ১৯৯৬ সালে শুরু হওয়া এ কর্মসূচির আওতায় গ্রামাঞ্চলের মানুষ বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা পায়। এর অধীনে বিভিন্ন ধরনের রোগ নিয়ে আছে ছয়টি গ্রুপ।
এ ব্যাপারে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ বিভাগের সাবেক পরিচালক ও জনস্বাস্থ্যবিদ অধ্যাপক ডা. বে-নজির আহমেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ইএসপি কার্যকর না। প্যাকেজে যেগুলো লেখা আছে, তার ধারে-কাছেও নেই। সরকার এ ব্যাপারে সচেষ্টও না। ইএসপিতে জনপ্রতি যে ব্যয়, সেই টাকা দিয়ে কিছুই হবে না। এখন চিকিৎসা ব্যবস্থায় যে ব্যয়, সাধারণ সর্দি-জ¦রের জন্য পরীক্ষা-নিরীক্ষায় লাগে চার-পাঁচ হাজার টাকা। ওষুধ লাগে অনেক। যাতায়াত ব্যয় আছে। সুতরাং এ টাকা দিয়ে কিছুই হবে না।’
তবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক সৈয়দ আবদুল হামিদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ইএসপিতে মানুষের যে মোট ব্যয়, তা কম না। কিন্তু স্বাস্থ্যব্যবস্থার পদ্ধতিগত ত্রুটির কারণে যে খরচ করছে, সেখান থেকে মানুষ কাক্সিক্ষত সেবা পাচ্ছে না। আবার সরকার যে ৫৯৩ টাকা খরচ করছে, সেটার পুরো বেনিফিট জনগণ পাচ্ছে না। সিস্টেমের দুর্বলতার কারণে সেটা হচ্ছে না। যে টাকা সরকার দিচ্ছে ও মোট যা ব্যয় হচ্ছে, সেটা যদি ঠিকমতো খরচ হতো, তাহলে এটা দিয়ে এখন যে পরিমাণ বেনিফিট পাচ্ছে, তার চেয়ে কমপক্ষে তিন গুণ বেশি বেনিফিট দেওয়া যেত।’
বেশি ব্যয় মাতৃ, নবজাতক, শিশু ও কৈশোর স্বাস্থ্যসেবায় : সবচেয়ে বেশি ব্যয় হচ্ছে মাতৃ, নবজাতক, শিশু ও কৈশোর স্বাস্থ্যসেবায়। এখানে ব্যয় হচ্ছে মোট ব্যয়ের ৪২ শতাংশ অর্থ অর্থাৎ ১৬ হাজার কোটি টাকা। এখানে জনপ্রতি বছরে ব্যয় ৯৪৩ টাকা। এর মধ্যে সরকার দিচ্ছে ২৯৪ টাকা ও বেসরকারি খাতে ব্যয় হচ্ছে ৬৪৯ টাকা।
দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ব্যয় হচ্ছে অসংক্রামক রোগের চিকিৎসায়, যা মোট ইএসপি ব্যয়ের ২৫ শতাংশ বা ৯ হাজার ৪০০ কোটি টাকা। এখানে বছরে জনপ্রতি ব্যয় ৫৩২ টাকা। এ টাকা ব্যয় হচ্ছে যৌন ও লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা এবং ছোটখাটো আঘাত বা জখমের চিকিৎসায়।
তৃতীয় সর্বোচ্চ ২০ শতাংশ অর্থ ব্যয় হচ্ছে ডেঙ্গু, এইডস, যক্ষ্মাসহ এমন ধরনের রোগ এবং তথ্যকণিকা প্রচার ও অন্যান্য কিছু রোগের চিকিৎসায়। এরপর সংক্রামক রোগের চিকিৎসায় ৬ শতাংশ এবং পুষ্টিতে ৩ শতাংশ অর্থ ব্যয় হচ্ছে।
৭৫% ব্যয় রোগ নিরাময়ে, ১৫% প্রতিরোধে : গ্রামাঞ্চলে অত্যাবশ্যকীয় স্বাস্থ্যসেবায় মোট ব্যয়ের ৭৫ শতাংশ বা ২৮ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হচ্ছে রোগ নিরাময়ে। এসব রোগীদের দু-তৃতীয়াংশ বা ৬৪ শতাংশই নারী। আর রোগ প্রতিরোধে ব্যয় হচ্ছে ১৫ শতাংশ অর্থ বা ৫ হাজার ৮০০ কোটি টাকা।
বেশি ব্যয় ওষুধে : গ্রামের মানুষ বেশি ব্যয় করছে ওষুধে, যা মোট ব্যয়ের ৪১ শতাংশ অর্থ। এর পরিমাণ বছরে ১৫৭ বিলিয়ন বা ১৫ হাজার কোটি টাকার বেশি। এরপর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ১৪ শতাংশ অর্থ ব্যয় হচ্ছে ভর্তি থাকা রোগীদের রোগ নিরাময়ে। তৃতীয় সর্বোচ্চ ১৩ শতাংশ অর্থ ব্যয় হচ্ছে হাসপাতালের বাইরের রোগীদের রোগ নিরাময়ে।
এ ছাড়া তথ্য, শিক্ষা ও কাউন্সেলিংয়ে ১১ শতাংশ, গবেষণা ও উন্নয়নে ৭ শতাংশ বা ২ হাজার ৭০০ কোটি টাকা, ল্যাবরেটরি সার্ভিসে ৫ শতাংশ, পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং এপিডেমিওলজিক্যাল সার্ভিলেন্স, ঝুঁকি ও রোগ নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচিতে ৩ শতাংশ করে, গভর্নেন্স ও সিস্টেম অ্যাডমিনিস্ট্রেশনে ২ শতাংশ, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি কর্মসূচিতে শূন্য দশমিক ৯ শতাংশ, স্বাস্থ্যসেবা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে শূন্য দশমিক ৪ শতাংশ, শুরুতেই রোগ নির্ণয় কর্মসূচিতে শূন্য দশমিক ১ শতাংশ অর্থ ব্যয় হচ্ছে।
পকেট থেকে যাচ্ছে ৬৫% অর্থ : দেশে অত্যাবশ্যকীয় স্বাস্থ্যসেবায় যত ব্যয় হচ্ছে, তার ৬৫ শতাংশ অর্থ গুনতে হচ্ছে ব্যক্তিকে (আউট অব পকেট)। বছরে এর পরিমাণ ২৪ হাজার ৮০০ কোটি টাকা। এর মধ্যে মানুষ সর্বোচ্চ ব্যয় করছে মাতৃ, নবজাতক, শিশু ও কৈশোর স্বাস্থ্যসেবায়, ৯ হাজার ৭৫২ কোটি টাকা ও সর্বনিম্ন ব্যয় করছে পরিবার পরিকল্পনায়, ১২৭ মিলিয়ন টাকা।
অত্যাবশ্যকীয় সেবা দিতে সরকার ব্যয় করছে মোট ব্যয়ের ২৭ শতাংশ বা ১০ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে সর্বোচ্চ ব্যয় করছে মাতৃ, নবজাতক, শিশু ও কৈশোর স্বাস্থ্যসেবায়, ৪ হাজার ৯৯০ কোটি টাকা ও সর্বনিম্ন ১৫২ কোটি টাকা পুষ্টিতে। ৭ শতাংশ বা ২ হাজার ৫৭২ কোটি টাকা দিচ্ছে বৈশ্বিক দাতা সংস্থা ও ১ শতাংশ বা ৫৩৭ কোটি টাকা দিচ্ছে স্বেচ্ছাসেবী সংস্থাগুলো। এসব সংস্থা পুষ্টি ও অসংক্রামক ব্যাধিতে কোনো ব্যয় করছে না।
উপজেলার টাকা চলে যাচ্ছে জেলা হাসপাতালে : উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ের মানুষের স্বাস্থ্যসেবা দেওয়ার কথা থাকলেও মোট বরাদ্দের বেশির ভাগ অর্থ ব্যয় হচ্ছে জেলা হাসপাতালে। স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইউনিটের হিসাবে, গ্রামাঞ্চলের মানুষের অত্যাবশ্যকীয় স্বাস্থ্যসেবার জন্য বরাদ্দ অর্থের ৩৬ শতাংশ জেলা হাসপাতালে ও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ব্যয় হচ্ছে ৩১ শতাংশ অর্থ। সবচেয়ে কম ব্যয় হচ্ছে ইউনিয়ন সাব-সেক্টরে, মাত্র ৩ দশমিক ৫ শতাংশ অর্থ। এ ছাড়া মাতৃ ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্র এবং কমিউনিটি ক্লিনিকে ৮ শতাংশ করে, প্রাইমারি হেলথ কেয়ার সেন্টারে (পিএইচসিসি) ৬ দশমিক ৫ শতাংশ ও কম্প্রিহেনসিভ রিপ্রোডাকটিভ হেলথ কেয়ার সেন্টারে (সিআরএইচসিসি) ৪ শতাংশ অর্থ ব্যয় হচ্ছে।
লক্ষ্যমাত্রা পূরণে ধীরগতি : স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইউনিটের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ২০১৬ সাল থেকে শুরু হওয়া ইএসপি লক্ষ্যমাত্রা পূরণে ২০২০ সাল পর্যন্ত খুব বেশি এগোতে পারেনি সরকার। ২০১৬ সালে লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হয়েছে ৫২ শতাংশ। চার বছর পর ২০২০ সালে সেই লক্ষ্যমাত্রা মাত্র ৫ শতাংশ বেড়ে ৫৭ শতাংশ হয়েছে। সরকারের লক্ষ্য ২০২৫ সালের মধ্যে ৮০ শতাংশ ও ২০৩০ সালের মধ্যে শতভাগ লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করা। এ সেবার পেছনে ব্যয়ও খুব বেশি বাড়াতে পারেনি সরকার।
স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইউনিটের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৬ সালে সরকারের ব্যয় ছিল সাড়ে ৭ হাজার কোটি টাকা ও মাথাপিছু ব্যয় ছিল ৪৭৫ টাকা। ছয় বছর পর ২০২২ সালে ব্যয় বেড়ে হয়েছে ১০ হাজার কোটি টাকা ও মাথাপিছু ব্যয় ৫৯৬ টাকা।
দরকার ইএসপি সংশোধন : স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইউনিটের বাংলাদেশ ন্যাশনাল হেলথ অ্যাকাউন্টস সেলের ফোকাল পারসন ডা. সুব্রত পাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ইএসপিকে আপডেট করতে হবে। কারণ করোনার পর থেকে বেশ কিছু পরিবর্তন এসেছে। অসংক্রামক ব্যাধি বা এনসিডি এসেছে। এখন দ্বিতীয় সর্বোচ্চ টাকা ব্যয় হচ্ছে এনসিডির পেছনে ২৫ শতাংশ। সবচেয়ে বেশি ৪২ শতাংশ টাকা ব্যয় হচ্ছে মা, নবজাতক, শিশু ও কিশোর স্বাস্থ্যসেবায়। কোন কোন রোগ বাদ পড়ল, যেগুলোতে বিনামূল্যে মানুষকে সেবা দিতে হবে, কোন কোন রোগে মানুষের বেশি খরচ হচ্ছে, সেখানে সরকারকে সেবা দিতে হবে। এনসিডির অংশটাও আপডেট করতে হবে। সংক্রামক ব্যাধির ক্ষেত্রেও গুরুত্ব দিতে হবে। প্রিভেন্টিভের জায়গাগুলোকে বেশি আনতে হবে। এগুলোই আপডেট করতে হবে।’
এই গবেষক আরও বলেন, ‘স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইউনিট থেকে এই সার্ভিস প্যাকেজকে আপডেট করার জন্য স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ইএসপি আপডেট কমিটিকে বলেছি। সেটার সঙ্গে লন্ডনের চ্যাথাম হাউজ আমাদের কিছু শর্ত দিয়েছিল। ওদের সঙ্গে মিলে হেলথ ইউনিটসহ মন্ত্রণালয় এ প্যাকেজ আপডেট করার কাজ শিগগির শুরু করছে।’
আজ বিশ্ব স্বাস্থ্য দিবস : বিশ্ব স্বাস্থ্য দিবস আজ। বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও নানা আয়োজনে দিবসটি পালিত হচ্ছে। এ বছর দিবসটির প্রতিপাদ্য ‘স্বাস্থ্যের অধিকার নিশ্চিতে : কাজ করি একসাথে’। দিবসটি উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আলাদা বাণী দিয়েছেন।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও স্বাস্থ্য বিষয়ে কাজ করে এমন বেসরকারি সংগঠন নানা কর্মসূচি নিয়েছে। কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে সেমিনার, স্বাস্থ্য শিক্ষা প্রদর্শনী, সড়কদ্বীপ সজ্জিতকরণ এবং চলচ্চিত্র প্রদর্শনী।
১৯৪৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদ আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য ক্ষেত্রের সম্মেলন ডাকার সিদ্ধান্ত নেয়। একই বছরের জুন ও জুলাই মাসে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য সম্মেলনে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সাংগঠনিক আইন গৃহীত হয়। ১৯৪৮ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রথম বিশ্ব স্বাস্থ্য সম্মেলনে ৭ এপ্রিল বিশ্ব স্বাস্থ্য দিবস পালনের প্রস্তাব দেওয়া হয়। ১৯৫০ সালের ৭ এপ্রিল থেকে বিশ্বজুড়ে নানা কর্মসূচির মাধ্যমে দিবসটি পালিত হয়ে আসছে।
