বাংলা পুরাতন বছরকে বিদায় ও নতুন বছর বরণকে কেন্দ্র করে পাহাড় এখন আনন্দে উদ্বেলিত। হাতেগোনা আর কয়েকটা দিন। তারপরই শুরু হতে যাচ্ছে পার্বত্য চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী বৈসাবি উৎসব। আগামী ১২ এপ্রিল ফুল ভাসানোর মধ্য দিয়ে নতুন বছর বরণের উৎসব বৈসাবির মূল আনুষ্ঠানিকতা শুরু হবে, যা শেষ হবে ১৬ এপ্রিল। তবে বৈসাবির মূল আনুষ্ঠানিকতা শুরুর প্রায় পক্ষকাল আগে থেকেই পার্বত্য চট্টগ্রাম জুড়েই শুরু হয় বৈসাবির নানা আনুষ্ঠানিকতা। প্রতিদিনই বিভিন্ন সংগঠন, প্রতিষ্ঠানের শোভাযাত্রা, মেলা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, ঐতিহ্যবাহী খেলাধুলাসহ নানা আয়োজনে বৈসাবির আনন্দ ছড়িয়ে পড়ে। অবশ্য এ বছর বৈসাবির চিরাচরিত সেই রঙে কিছুটা ভাটার আশঙ্কা। সম্প্রতি বান্দরবানের রুমা ও থানচিতে সশস্ত্র সংগঠন কুকি-চিন ন্যাশনাল ফ্রন্টের (কেএনএফ) টানা সন্ত্রাসী কার্যকলাপের আঁচ লেগেছে বৈসাবির আনন্দে। রাঙ্গামাটি জেলা সদরে বৈসাবির আনুষ্ঠানিকতা নিয়ে কোনো ধরনের ভয়-উদ্বেগ কাজ না করলেও বান্দরবান সীমান্তবর্তী ইউনিয়নে রয়েছে চাপা আতঙ্ক। যে আতঙ্ক ভর করেছে বৈসাবির আনন্দেও।
রাঙ্গামাটির বিলাইছড়ি উপজেলার ৪ নম্বর বড়থলি ইউনিয়ন। এই ইউনিয়নের দুই পাশে দুটি দেশ। দক্ষিণে মিয়ানমার, পূর্বে ভারতের মিজোরাম। অন্যদিকে রয়েছে রুমা ও থানচি উপজেলা। বিলাইছড়ি উপজেলা সদর থেকে বড়থলি ইউনিয়নের দূরত্ব ১১৬ কিলোমিটার। ইউনিয়নটি দেশের অন্যতম দুর্গম ইউনিয়ন হিসেবে স্বীকৃত। কেএনএফের সন্ত্রাসী কার্যকলাপ ঘিরে উদ্ভূত পরিস্থিতির বর্ণনা দিতে গিয়ে এই ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান আতোমং মারমা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এলাকায় যারা অবস্থান করছেন, সবার মধ্যে আতঙ্ক কাজ করছে। শঙ্কার মধ্যে দিন পার করছে। সামনেই বৈসাবি। কিন্তু কেউ এখনো স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারছে না। সবার মধ্যে আতঙ্ক কাজ করছে। পরিস্থিতি সামনে কেমন কী হয়, সেটা নিয়ে সবার মধ্যে টেনশন (দুশ্চিন্তা) রয়েছে। এ মুহূর্তে উৎসব নিয়ে কেউ ভাবছে না। সবার একটাই কামনা, পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে আসুক।’
বড়থলি ইউনিয়নের পাশেই আরেক দুর্গম এলাকা ফারুয়া ইউনিয়ন। এই ইউনিয়নের চেয়ারম্যান বিদ্যালাল তঞ্চঙ্গ্যা বলেন, ‘কিছুটা আতঙ্ক থাকলেও বৈসাবি নিয়ে তেমন কোনো শঙ্কা দেখছি না। আশা করছি সবাই ভালোভাবেই বৈসাবি উৎসব পালন করতে পারবে। এদিকে খুব একটা সমস্যা হচ্ছে না।’
প্রায় একই ধরনের তথ্য দেন বান্দরবান-রাঙ্গামাটি সীমান্তবর্তী রাজস্থলী উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান উবাচ মারমা। তিনি বলেন, ‘বান্দরবানের ঘটনা এখানে কোনো প্রভাব ফেলবে না। বৈসাবির যে আনুষ্ঠানিকতা আমরা সবাই উৎসাহ-উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে পালন করতে পারব। আমার উপজেলায় কোনো ধরনের শঙ্কা কারও মধ্যে নেই।’
রাঙ্গামাটি বিজু, সাংগ্রাই, বৈসু, বিষু, চাংক্রান, বিহু উদযাপন পরিষদের সদস্য সচিব ইন্টু মনি তালুকদার বলেন, ‘বান্দরবানে যে অস্থিরতা চলছে আমার মনে হচ্ছে সেটার প্রভাব রাঙ্গামাটিতে পড়বে না। এখানকার মানুষ শান্তিপ্রিয়। গত ১ তারিখ থেকে জেলার বিভিন্ন এলাকায় বিজুর আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়েছে। উৎসবে কোনো শঙ্কা সৃষ্টি হবে বলে আমার মনে হয় না। এ ছাড়া আইনশৃঙ্খলা বাহিনীও এ ক্ষেত্রে সতর্ক অবস্থায় রয়েছে।’
বৈসাবি অনুষ্ঠান নিয়ে রাঙ্গামাটিতে কোনো শঙ্কা নেই বলে দাবি করেন রাঙ্গামাটির পুলিশ সুপার মীর আবু তৌহিদ। তিনি বলেন, ‘আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যথেষ্ট সতর্ক রয়েছে। এ ছাড়া এই এলাকার মানুষ অসাম্প্রদায়িক চেতনায় বিশ্বাস করে, সবে ধর্মের আচার-অনুষ্ঠান সবাই মিলেমিশে পালন করে। তাই এখানে শঙ্কার কোনো কারণ নেই। তা ছাড়া আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তৎপর রয়েছে। গোয়েন্দা নজরদারিও বৃদ্ধি করা হয়েছে।’
