পাহাড়ে কঠোর ব্যবস্থার ইঙ্গিত স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর

আপডেট : ০৭ এপ্রিল ২০২৪, ০২:০৭ এএম

তিনটি ব্যাংকে হামলা, অস্ত্র ও টাকা লুট, ব্যাংকের ম্যানেজার অপহরণ এবং থানা লক্ষ্য করে সশস্ত্র গোষ্ঠীর সদস্যদের গুলির ঘটনার পর বান্দরবান সফরে গিয়ে হামলা ও ব্যাংক লুটকারীদের বিরুদ্ধে সরকার কঠোর অবস্থানে যাচ্ছে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান। গতকাল শনিবার সেখানে গিয়ে মন্ত্রী বলেন, ‘কোনো অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীকে ছাড় দেওয়া হবে না। সন্ত্রাসীরা তাদের সক্ষমতা দেখানোর চেষ্টা করেছে মাত্র। তবে নিরাপত্তা বাহিনী তাদের সব সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড ধূলিসাৎ করে দেবে।’

এদিকে পার্বত্য চট্টগ্রামের নতুন সশস্ত্র সংগঠন কুকি-চিন ন্যাশনাল ফ্রন্টের (কেএনএফ) সঙ্গে আশপাশের সন্ত্রাসীদের যোগাযোগ আছে বলে মন্তব্য করেছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাছান মাহমুদ। তিনি বলেন, তাদের নির্মূল করতে সরকার বদ্ধপরিকর। গতকাল চট্টগ্রাম নগরে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে এসব কথা বলেন তিনি।

অন্যদিকে বান্দরবানের রুমা ও থানচি উপজেলার বেশিরভাগ বাসিন্দার মধ্যে এখনো আতঙ্ক বিরাজ করছে। অপ্রয়োজনে কেউ ঘর থেকে বের হচ্ছে না। আর কেউ বের হলেও সন্ধ্যার আগে ফিরছে। ঘরেও লোকজন নিজেদের নিরাপদ মনে করছে না। তবে পুলিশ বলছে, লোকজনের আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।

রুমায় সোনালী ব্যাংকের শাখায় গত মঙ্গলবার রাতে হামলা চালায় অস্ত্রধারীরা। ব্যাংকের ভল্টে থাকা ১ কোটি ৫৯ লাখ টাকা নিতে পারেনি তারা। তবে পুলিশ ও আনসার সদস্যদের ১৪টি অস্ত্র ও ৪১৫টি গুলি লুট করে। অস্ত্রধারীরা ব্যাংকের শাখা ব্যবস্থাপক নেজাম উদ্দিনকে জিম্মি করে নিয়ে যায়। গত বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় রুমা থেকে তাকে উদ্ধার করে র‌্যাব।

পরদিন থানচি থানার দুটি ব্যাংকের শাখা থেকে সাড়ে ১৭ লাখ টাকা লুট করে অস্ত্রধারীরা। এ ঘটনার পর রামু ও থানচিতে ব্যাংকিং লেনদেন এখনো বন্ধ রয়েছে। এতে বিপাকে পড়েছে লোকজন।

রুমায় সোনালী ব্যাংকের শাখায় ডাকাতির সঙ্গে নতুন সশস্ত্র গোষ্ঠী কুকি-চিন ন্যাশনাল ফ্রন্টের (কেএনএফ) সদস্যরা জড়িত বলে প্রাথমিক তথ্যের ভিত্তিতে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান। অন্যদিকে স্থানীয় লোকজন বলছে, থানচিতে হামলার সঙ্গেও একই গোষ্ঠী জড়িত।

গতকাল বান্দরবান সফরে গিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কেএনএফকে উদ্দেশ্য করে বলেন, ‘অস্ত্র, পোশাকসহ তারা দেশে ঢুকবে, আর আমাদের নিরাপত্তা বাহিনী বসে থাকবে, তা কাম্য নয়। এ ব্যাপারে কঠোর অবস্থানে যাব। কোনোক্রমেই আইন ভঙ্গ করতে দেব না তাদের। দ্রুত সময়ের মধ্যে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এখানে আমরা সব বাহিনীর সদস্য আরও বাড়াব এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষার্থে যা যা করার দরকার, সবই করব।’ দুপুরে বান্দরবান সার্কিট হাউজে জেলার আইনশৃঙ্খলাসংক্রান্ত সভা শেষে সাংবাদিকদের এসব কথা বলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।

রুমা ও থানচিতে ব্যাংকে ডাকাতি, ব্যাংক কর্মকর্তাকে অপহরণ, অস্ত্র লুট, থানায় হামলার পর গতকাল ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। এ সময় তার সঙ্গে ছিলেন বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আশরাফুজ্জামান সিদ্দিকী, পুলিশপ্রধান চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন, আনসারপ্রধান মেজর জেনারেল একেএম আমিনুল হক, স্পেশাল ব্রাঞ্চের (এসবি) প্রধান পুলিশের অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক মনিরুল ইসলাম ও পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী কুজেন্দ্র লাল ত্রিপুরা।

সকালে হেলিকপ্টারে রুমায় যান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। সেখান থেকে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। পরে বান্দরবান সার্কিট হাউজে পার্বত্য জেলার আইনশৃঙ্খলাসংক্রান্ত মতবিনিময় সভা করেন। সভা শেষে সাংবাদিকদের মন্ত্রী বলেন, ‘শান্তিপ্রিয় মানুষগুলো এই এলাকায় থাকে। এখানে এ রকম কোনো ঘটনা হবে আমরা চিন্তা করিনি। হঠাৎ করে কেন ঘটল, তা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

সন্ত্রাসীরা অর্থ সংগ্রহের জন্য এই হামলা চালিয়েছে বলে সরকার মনে করছে উল্লেখ করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘অবশ্যই এই হামলার কারণ আছে, কারা হামলা করেছে, কাদের সহযোগিতা ছিলসবকিছু বের করা হবে। আমরা সবকিছু খতিয়ে দেখছি। সবগুলো বের করে আইনি ব্যবস্থা নেব।’

পরপর তিন দিন কয়েকটি হামলা, ব্যাংকে ডাকাতি, অপহরণ, গোলাগুলি ও অস্ত্র লুটের ঘটনার পর বান্দরবানে সশস্ত্র গোষ্ঠী কেএনএফের বিরুদ্ধে যৌথ অভিযানের বিষয়ে জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমাদের নিরাপত্তা বাহিনী, সশস্ত্র বাহিনী রয়েছে। তারা তাদের মতো করে কাজ করবে। আমরা এদের উৎপত্তিস্থল খুঁজে বের করব। সেই সঙ্গে এসব ঘটনার বিষয়ে কঠোর অবস্থানে যাব।’

ব্যাংকের টাকা লুট ও হামলার বিষয়ে আগাম কোনো গোয়েন্দা তথ্য ছিল কি না সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের উত্তরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘কারও কোনো গাফিলতি আছে কি না, তা সরকার খতিয়ে দেখবে। কোন জায়গা থেকে ফেল করেছে, এটি আমরা দেখব। আগে দেখে নিই, তারপর সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যবস্থা নেব।’

আশপাশের সন্ত্রাসীদের যোগাযোগ আছে বললেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী : কেএনএফকে নির্মূল করতে সরকার বদ্ধপরিকর বলে মন্তব্য করে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ বলেছেন, তাদের বিরুদ্ধে সাঁড়াশি অভিযান শুরু হয়েছে। ইতিমধ্যে ব্যাংক ম্যানেজারকে মুক্ত করা হয়েছে। তাদের সঙ্গে আশপাশের সন্ত্রাসীদেরও যোগাযোগ আছে, পার্শ্ববর্তী দেশে যারা ইতিমধ্যে সন্ত্রাসী কর্মকান্ড ঘটিয়েছিল, তাদের অস্ত্রশস্ত্র এদের কাছে এসেছে বলে জানা গেছে। গতকাল সকালে চট্টগ্রামে দেওয়ানজি পুকুর লেনের ওয়াইএনটি সেন্টারে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে এসব কথা বলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী।

আতঙ্ক কাটেনি রুমা-থানচিতে : রুমা উপজেলার বেশির ভাগ বাসিন্দার মধ্যে এখনো আতঙ্ক বিরাজ করছে। অপ্রয়োজনে কেউ ঘর থেকে বের হচ্ছে না। আর কেউ বের হলেও সন্ধ্যার আগে ফিরছে। ঘরেও লোকজন নিজেদের নিরাপদ মনে করছে না।

বান্দরবানের রুমা উপজেলা গেটের বিপরীতের চা-দোকানি মো. আলমগীর গণমাধ্যমকে বলেন, ভয়ে লোকজন ঘর থেকে বের হচ্ছে না। বাইরে থেকে লোকজন আসা-যাওয়া কমে গেছে। তাই দোকানে গ্রাহক কম।

উপজেলার একমাত্র বড় বাজার রুমা। গতকাল শনিবার সকালে সেখানে গিয়ে দেখা যায়, দোকানপাট খোলা, তবে ক্রেতা নেই।

বান্দরবান সদর থেকে ছেড়ে যাওয়া গাড়িগুলো সড়কের ওয়াই জংশন এলাকায় গিয়ে ভাগ হয়ে যায়। থানচিগামী গাড়িগুলো থানচি সড়কে আর রুমগামী গাড়িগুলো রুমা সড়কে ঢুকে পড়ে। গাড়ির সংখ্যা বেশি হলে ওয়াই জংশনে কিছুটা ভিড় থাকে। আবার অনেক সময় গাড়িতে থাকা লোকজনও এলাকার দোকান থেকে কেনাকাটা করে। বিভিন্ন পাহাড়ি ফলমূল সড়কের পাশে বিক্রি করছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।

স্থানীয় দোকানি নমিয়া সিং বলেন, ‘আগে যেখানে বিক্রি করে দম ফেলতে পারতাম না, এখন বসে থেকে বেশিরভাগ সময় পার করতে হয়। এভাবে রুমা-বান্দরবান সড়কের সদরঘাট, বেথেল হাট, ডাকবাংলোসহ সড়কের ছয়টি বাজারে বিক্রেতাদের অলস সময় পার করতে হচ্ছে।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত