বিপন্ন সমাজে তিনি মানুষের বন্ধু ছিলেন

আপডেট : ১৬ এপ্রিল ২০২৪, ০৯:২৩ এএম

সমাজ বদলের প্রচেষ্টার একজন সৈনিক ছিলেন ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী। তিনি আমাদের বন্ধু ছিলেন। কেবল আমাদের নন, বন্ধু ছিলেন দেশের সব মানুষের। তিনি চিকিৎসক হতে চেয়েছিলেন। বিলেতে গেছেন চিকিৎসা বিষয়ে উচ্চতর শিক্ষার জন্য, এগুচ্ছিলেনও, বেশ ভালোভাবেই, কিন্তু তার চেয়েও বড় এক কাজে জড়িয়ে পড়লেন। সেটাও ব্যাধির চিকিৎসা বৈকি; কিন্তু ব্যক্তির অসুখের নয়, সমাজের অসুখের। সমাজ অসুস্থ ছিল, এখনো আছে, অসুখটা কমেনি, বরং বৃদ্ধি পেয়েছে। সামাজিক অসুখের যাতে উপশম ঘটে, এবং অসুখের কারণ যাতে দূর করা যায় সেই কাজে নিজেকে নিয়োজিত করলেন জাফরুল্লাহ চৌধুরী। সমাজসেবকদের কথা আমরা শুনতে পাই। নিজেদের আয় থেকে দান করেন এমন মানুষও যে অত্যন্ত বিরল তা নয়; আপৎকালে ত্রাণেও অনেকে এগিয়ে আসেন দেখা যায়; কিন্তু জাফরুল্লাহ চৌধুরী দাতা বা ত্রাণকর্মী ছিলেন না, সমাজের জন্য তার ভূমিকাটা বন্ধুর। কথায় বলে বিপদেই বন্ধুর পরিচয়, জাফরুল্লাহ চৌধুরী সর্বদাই আমাদের এই বিপন্ন সমাজের মানুষদের পাশে থাকতে চেয়েছেন; অন্য কোনো ভূমিকায় নয়, বন্ধুর ভূমিকায়।

অনেক প্রতিষ্ঠানের তিনি প্রতিষ্ঠাতা। অবিশ্বাস্য শ্রমে তিনি হাসপাতাল, মেডিকেল কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, ওষুধ প্রস্তুতের কারখানা, ছাপাখানা, মাসিক পত্রিকা, প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান এসব গড়ে তুলেছেন। কিন্তু কোনো প্রতিষ্ঠানেরই তিনি মালিক নন, এমনকি প্রধান কর্মকর্তাও নন; সর্বত্রই তিনি কর্মীদের একজন, তাদের ভাই, বড়জোর বড় ভাই। উদ্যোক্তা হিসেবে ইচ্ছা করলে অনায়াসে তিনি বাংলাদেশের শীর্ষ ধনীদের একজন হতে পারতেন; কিন্তু তার চিন্তা কখনোই ব্যক্তিগত সম্পদ বৃদ্ধির পথে ধাবিত হয়নি। তার সব উদ্যোগই সামাজিক, উদ্যোগের মালিকানাও সামাজিক। ব্যক্তিমালিকানায় তার আস্থা ছিল না; মালিকানার ব্যক্তিগত ধারণাকে প্রত্যাখ্যান করেই তিনি এগিয়েছেন।

আমাদের সমষ্টিগত জীবনে সবচেয়ে কঠিন এবং সর্বাধিক গৌরবের ঘটনাটি ঘটেছে একাত্তরে। মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে। যুদ্ধ যখন শুরু হয় জাফরুল্লাহ চৌধুরী তখন চিকিৎসাবিদ্যায় তার উচ্চশিক্ষা প্রায় শেষ করে ফেলেছেন। কিন্তু গণহত্যা এবং প্রতিরোধ সংগ্রামের খবর শোনা মাত্র সবকিছু ত্যাগ করে তিনি যুদ্ধে যাবেন বলে ঠিক করেছেন। একা যাবেন না, অন্যদেরও সঙ্গে নিয়ে যাবেন। যারা যেতে পারবেন না তারা সাহায্য করবেন অর্থ দিয়ে, চিকিৎসার সরঞ্জাম পাঠিয়ে, সম্ভব হলে অস্ত্র সংগ্রহ করে। জাফরুল্লাহ চৌধুরী প্রবাসী চিকিৎসকদের সংগঠিত করেছেন, বাঙালির মুক্তিসংগ্রামের পক্ষে জনমত সৃষ্টিতে নিজেকে নিযুক্ত করেছেন, এবং প্রকাশ্য ঘোষণা দিয়ে পাকিস্তানি নাগরিকত্ব ত্যাগ করে যুদ্ধে যোগ দিতে বেরিয়ে পড়েছেন। মুজিবনগরে চলে আসাটা তার জন্য ছিল দুঃসাহসিক এক সিদ্ধান্ত, এবং কাজটা ছিল বিপদসঙ্কুল। সে কাজ তিনি করেছেন। ওষুধপত্র, চিকিৎসা সামগ্রী এবং অস্ত্রের প্রয়োজন বুঝতে পেরে ফেরত গেছেন ইউরোপে। তারপর আবার তার চলে-আসা যুদ্ধের ময়দানে। ফেরত এসে যুদ্ধাহতদের জন্য অত্যাবশ্যকীয় একটি ফিল্ড হাসপাতাল গড়ে তোলার কাজে সর্বশক্তি নিয়োজিত করেছেন। হাসপাতালের প্রতিষ্ঠা ঘটেছে, সেখানে যুদ্ধাহতদের চিকিৎসার ব্যবস্থাও করা গেছে। ৯ মাসের যুদ্ধ শেষে একাত্তরের ষোলই ডিসেম্বরের পর জাফরুল্লাহ দেখলেন যে পাকিস্তানি হানাদাররা আত্মসমর্পণ করেছে ঠিকই কিন্তু মুক্তিসংগ্রামের লক্ষ্য অর্জন তখনো দূরেই রয়ে গেছে। মুক্তি’র অর্থ তার কাছে কেবল রাজনৈতিক স্বাধীনতা ছিল না, ছিল সামাজিক পরিবর্তন। তিনি একটি সত্যিকারের গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ও সমাজের স্বপ্ন দেখেছিলেন। এবং তিনি মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বলতে সামাজিক বিপ্লবের চেতনাই বুঝতেন।

স্বাধীনতার পর তার অসমাপ্ত শিক্ষা কার্যক্রম শেষ করার জন্য ইংল্যান্ডে ফিরে যেতে পারতেন, কিন্তু তিনি যাননি, চলে এসেছেন বাংলাদেশে। উদ্দেশ্য অসমাপ্ত মুক্তিযুদ্ধকে সামনের দিকে এগিয়ে নিতে সচেষ্ট হবেন। দেশে ফিরে সাভারে জনগণের জন্য তিনি একটি হাসপাতাল গড়ে তুললেন; সেই হাসপাতাল পরে মেডিকেল কলেজে রূপান্তরিত হলো। এরপরে তিনি প্রতিষ্ঠা করলেন গণ-বিশ্ববিদ্যালয়। সেই সঙ্গে বাংলাদেশের ওষুধ শিল্পকে সাম্রাজ্যবাদের কবল থেকে মুক্ত করার লক্ষ্যে সরকারের ওপর চাপ দিয়ে একটি ওষুধ নীতি প্রণয়ন করালেন, যার ফলে ওষুধ শিল্পে যুগান্তকারী পরিবর্তন সাধিত হলো।

ছাত্রজীবন থেকেই তিনি জানতেন যে রাষ্ট্রের বাইরে সমাজের স্বতন্ত্র কোনো জীবন নেই, যে কারণে রাজনীতিতে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত না হলে সমাজে পরিবর্তন আসবে না। এই উপলব্ধি থেকে ছাত্রজীবনেই তিনি সমাজ পরিবর্তনকামী বাম রাজনীতির ধারার সঙ্গে নিজেকে যুক্ত করেছিলেন। মুক্তিযুদ্ধও তার কাছে ছিল একটি পরিপূর্ণ রাজনৈতিক জনযুদ্ধ। ওই রাজনীতি-মনস্কতা সব সময়েই তার সঙ্গে থেকেছে। সমাজকে পরিবর্তন করার মতাদর্শ থেকে তিনি কখনোই বিযুক্ত হননি। বামপন্থিদের জাফরুল্লাহ সর্বদাই নির্ভরযোগ্য ভরসাস্থল ছিলেন। আমরা কয়েকজন মিলে উদ্যোগ নিয়েছিলাম ‘সমাজতান্ত্রিক বুদ্ধিজীবী সংঘ’ নামে একটি প্রতিষ্ঠান গড়বার; এ কাজে তার কাছ থেকে যে সমর্থন লাভ করেছি সেটি আমাদের ওই উদ্যোগের জন্য খুব বড় রকমের একটি পাথেয়।

জাফরুল্লাহ চৌধুরীর ছিল অসামান্য প্রাণশক্তি ও কর্মোদ্দীপনা। নতুন চিন্তা ও কর্মপরিকল্পনা উদ্ভাবনায় তিনি ছিলেন প্রায় অপ্রতিদ্বন্দ্বী। পরিকল্পনাকে বাস্তবে রূপান্তরিত করার ক্ষেত্রেও তিনি অনন্যসাধারণ। কাজের বাইরে আমরা তাকে কখনো দেখিনি। এবং আশাবাদ ছিল তার সার্বক্ষণিক সঙ্গী। সেই গুণে মানুষকে তিনি অতি সহজে কাছে টেনে নিতে পারতেন, অনুপ্রাণিত করতে পারতেন কর্তব্যকর্মে। আমাদের এই অসুস্থ সমাজে সুস্থ থাকা যে কত কঠিন সেটা আমরা সবাই জানি। জাফরুল্লাহ চৌধুরীকে মানসিক দুর্বলতা কখনোই আক্রমণ করতে পারেনি, কিন্তু অতিরিক্ত পরিশ্রম ও ব্যস্ততার কারণেই হয়তো শারীরিক অসুখ তাকে বিপদগ্রস্ত করেছিল। তিনি চলে গেছেন। কিন্তু তাই বলে শারীরিক দুর্বলতার কারণে তিনি তার কাজ থেকে সরে গেছেন এমনটি ঘটতে দেখিনি।

সংক্রামক অসুখগুলো যে সমাজ থেকে আসে, এমনকি অসংক্রামক যেগুলো তাদের পেছনেও পুষ্টিহীনতা, দুষ্ট পরিবেশ এবং অসুস্থ সমাজ কাজ করে এ কথাটা জাফরুল্লাহ চৌধুরীর মতোই অন্য একজন চিকিৎসক ডা. মোহাম্মদ মোর্তজাও খুব পরিষ্কারভাবে বলতেন। সমাজ-পরিবর্তনের তিনিও ছিলেন একজন নির্ভীক কর্মী। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চিকিৎসাকেন্দ্রে চিকিৎসক হিসেবে কাজ করতেন। পড়তেন, লিখতেন এবং চেষ্টা করতেন তরুণদের সমাজ-সচেতন করতে। আল-বদররা তার কাজের খবর রাখত। তাই একাত্তরের যুদ্ধ শেষের আগ মুহূর্তে সমাজ-পরিবর্তনকামী বিশিষ্ট কয়েকজন শিক্ষকের সঙ্গে তাকেও তারা তুলে নিয়ে যায়। এবং হত্যা করে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় একটা ভালো কাজ করেছে; বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসাকেন্দ্রটিকে তার নামে নামাঙ্কিত করে। কিন্তু সেই কেন্দ্রে তো এখন দেখছি ‘প্রলয় গ্যাং’-এর ছাত্ররা সদর দপ্তর বসিয়েছে। সমাজের অসুখ যে কমেনি, উল্টো বেড়েছে তার প্রমাণ এখন সর্বত্র।

তবু সমাজে ভালো মানুষরা আছেন। সমাজে তাদের সংখ্যাই অধিক। কিন্তু তারা বিচ্ছিন্ন, সে জন্য শক্তিহীন। সমাজ-পরিবর্তনে উদ্যোগী মানুষরাও ছিলেন এবং এখনো রয়েছেন। কিন্তু তারাও সুসংগঠিত নন। খুব বড় অসুবিধা ওইখানেই। মানুষ আছে, কিন্তু মানুষের সংগঠিত আন্দোলন নেই। বিবেকবান ও বুদ্ধিমান মানুষদের কর্তব্য রয়ে গেছে সংগঠিত হওয়ার। সংগঠনের জন্য সাংস্কৃতিক প্রস্তুতির কথাটাও যেন আমরা না ভুলি। প্রত্যাশা আছে, থাকতেই হবে। কারণ মানুষ আছে, এবং তারা আত্মসমর্পণ করবে না অমানবিক ক্ষমতার কাছে। লড়াইটা আজ কেবল বাংলাদেশের নয়, সারা বিশ্বেরই। সেটাও একটা ভরসা বৈকি। ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী আমাদের ভরসার জায়গা ছিলেন, আছেন এবং থাকবেন।

লেখক: ইমেরিটাস অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত