দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর স্থানীয় সরকারের উপজেলা পরিষদ নির্বাচনও বর্জনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিএনপি। সংসদ নির্বাচনের আগে থেকে শুরু করা সরকারের পদত্যাগের এক দফার আন্দোলন-সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়ার কথা বললেও আপাতত দলটির কোনো কর্মসূচি নেই। এ অবস্থায় উপজেলা পরিষদ নির্বাচন বর্জনের সিদ্ধান্তে মাঠপর্যায়ের নেতাকর্মীদের মধ্যে অস্বস্তি তৈরি হয়েছে। দল ভোটেও নেই, আন্দোলনেও নেই এ অবস্থায় মাঠের নেতাকর্মীরা কী করবেন এ নিয়েও আলোচনা আছে বিএনপিতে।
এদিকে বিএনপি নির্বাচনে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেও প্রথম ধাপের যে ১৫০ উপজেলায় আগামী ৮ মে নির্বাচন হবে, তাতে অর্ধশতাধিক উপজেলায় প্রার্থী হচ্ছেন সাবেক ও বর্তমান নেতাদের কেউ কেউ। এই প্রার্থীরা মনে করছেন, উপজেলাপর্যায়ে তৃণমূল নেতাকর্মী ও সমর্থকদের কেউ কেউ দলের প্রার্থীদের পক্ষে কাজ করবেন প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে।
এ বিষয়ে বিএনপির দায়িত্বশীল নেতারা বলছেন, বিএনপি নির্বাচনে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কেউ নির্বাচনে গেলে দায়-দায়িত্ব তার। আশা করছি দায়িত্বশীল নেতারা নির্বাচনে অংশ নেবেন না। এখন এই নির্দেশনা দেওয়া হচ্ছে। তবে যারা নির্দেশনা মানবেন না, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
উপজেলা নির্বাচনে দলের যারা প্রার্থী হয়েছেন, তাদের বিষয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সরকারের পদত্যাগের এক দফা দাবি আদায়ের সংগ্রামে রয়েছি আমরা। এর অংশ হিসেবে আমরা সংসদ নির্বাচন বর্জন করেছি। উপজেলা নির্বাচন বর্জনেরও সিদ্ধান্ত রয়েছে। প্রথম ধাপের উপজেলা নির্বাচনে যারা প্রার্থী হয়েছেন, তাদের তাদের প্রার্থিতা প্রত্যাহারের জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আশা করছি, দলীয় সিদ্ধান্ত মেনে তারা উপজেলা নির্বাচন বর্জন করবেন।’
গত সোমবার ছিল প্রথম ধাপের মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার শেষ দিন। শেষ দিনে বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের বেশ কিছু নেতা উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান পদে প্রার্থী হিসেবে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। এ বিষয়ে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়-সংশ্লিষ্ট একাধিক নেতা দেশ রূপান্তরকে বলেন, সারা দেশে অর্ধশতাধিক সাবেক ও বর্তমান নেতা উপজেলা নির্বাচনে প্রার্থী হয়েছেন। কেন্দ্র থেকে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হচ্ছে। অন্যদিকে প্রার্থীদের কেউ কেউ নিজ উদ্যোগে যোগাযোগ করছেন। আপাতত প্রার্থীদের বোঝানো হচ্ছে।
গত সোমবার রাতে বিএনপির স্থায়ী কমিটির এক ভার্চুয়াল সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় উপজেলা নির্বাচনে অংশ না নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। সিদ্ধান্তের বিষয় জানিয়ে গণমাধ্যমে পাঠানো বিবৃতিতে বলা হয়, এখনো সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের পরিবেশ তৈরি হয়নি এবং বিদ্যমান অরাজক পরিস্থিতি আরও অবনতিশীল হওয়ায় আসন্ন উপজেলা নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করার যৌক্তিক কারণ রয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সাতক্ষীরা জেলা বিএনপির এক নেতা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দল উপজেলা নির্বাচনে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেও প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষভাবে নেতাকর্মী ও সমর্থকদের কেউ কেউ নির্বাচনে অংশ নেবেন। কারণ আপাতত কোনো কর্মসূচি নেই। নেতাকর্মীরা তো আর বসে থাকবেন না।’
রংপুর বিভাগের সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক আব্দুল খালেক বলেন, ‘উপজেলা নির্বাচনে অংশ নেওয়া, না নেওয়ার বিষয়ে দল কিছুটা নমনীয় হবে বলে প্রার্থীদের কেউ কেউ মনে করেছিলেন। এ কারণে রংপুর বিভাগের কয়েকটি উপজেলায় দলের কেউ কেউ প্রার্থী হয়েছিলেন। কিন্তু শেষ মুহূর্তে এসে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত হওয়ায় এখন প্রার্থীদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হচ্ছে। তাদের প্রার্থিতা প্রত্যাহারের জন্য বলা হচ্ছে। আশা করছি প্রার্থীরা দলীয় সিদ্ধান্ত মেনে তাদের প্রার্থিতা প্রত্যাহার করবেন।’
কুমিল্লার লাঙ্গলকোট উপজেলা নির্বাচনে প্রার্থী হয়েছেন সাবেক যুবদল নেতা মাজহারুল ইসলাম সুপু। তিনি গতকাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমি নির্বাচনে প্রার্থী হয়েছি। এলাকার দলীয় নেতাকর্মীদের অনেকে আমার সঙ্গে রয়েছেন। আশা করছি নির্বাচনে আমি বিজয়ী হব।’
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলা বিএনপির আইনবিষয়ক সম্পাদক মাসুদুল আলম চেয়ারম্যান পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতার জন্য মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘প্রথম ধাপের উপজেলা নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর আমি মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছি। মনে করেছিলাম দল হয়তো না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেবে না। কিন্তু মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার শেষের দিকে দলীয় সিদ্ধান্ত এসেছে। এ কারণে অপেক্ষা করছি দলীয় সিদ্ধান্তের। অনেক সময় কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্তের বিষয়ে স্থানীয় মতামতে ভিন্নতা আসে। স্থানীয়ভাবে আলোচনা করে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেব।’
কেন্দ্র থেকে যোগাযোগ করা হয়েছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘কেন্দ্রীয় কার্যালয় থেকে কেউ যোগাযোগ করেনি। আমি নিজে থেকে খুলনা বিভাগীয় সহ-সাংগঠনিক সম্পাদককে ফোন করেছিলাম। তাকে বিষয়টি জানিয়েছি।’
বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স বলেন, ‘আমরা আন্দোলন-সংগ্রামের মধ্যেই আছি। রমজানে ইফতার পার্টি করে নেতাকর্মীদের ঘর থেকে বের করে এনেছি। ঈদ গেছে, এখন স্থায়ী কমিটি মে দিবসে ঢাকায় সমাবেশ কর্মসূচি ঘোষণা করেছে। সেই কর্মসূচি থেকে আরও কর্মসূচি আসবে, যা ঈদুল আজহা পর্যন্ত চলবে।’