সেনা সদরে প্রধানমন্ত্রী

আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর সেনাবাহিনী গড়তে সরকার বদ্ধপরিকর

আপডেট : ২৭ জুলাই ২০২৬, ০৬:৫৯ এএম

সশস্ত্র বাহিনী, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, বেসামরিক প্রশাসন, শিল্প, প্রযুক্তি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সাধারণ জনগণকে একটি সমন্বিত জাতীয় নিরাপত্তা কাঠামোর আওতায় আনতে আধুনিক নীতিমালা প্রণয়নের ঘোষণা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেন, বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মূল শক্তি শুধু সশস্ত্র বাহিনীর সক্ষমতায় নয়, বরং সমগ্র জাতির ঐক্য, প্রস্তুতি ও সহনশীলতায় নিহিত। একই সঙ্গে সেনাবাহিনীতে পদোন্নতির ক্ষেত্রে রাজনৈতিক বিবেচনার ঊর্ধ্বে উঠে মেধা, পেশাগত যোগ্যতা, সততা ও নেতৃত্বের গুণাবলিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

গতকাল রবিবার সেনা সদরে ‘সেনা সদর নির্বাচনী পর্ষদ’-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। এই পর্ষদ সেনাবাহিনীর নির্দিষ্ট পদমর্যাদার কর্মকর্তাদের (কর্নেল ও লেফটেন্যান্ট কর্নেল) পেশাগত দক্ষতা, সার্ভিস রেকর্ড ও অন্যান্য যোগ্যতা মূল্যায়নের মাধ্যমে পদোন্নতির জন্য সুপারিশ করবে। প্রধানমন্ত্রীর উপ-প্রেস সচিব জাহিদুল ইসলাম রনি জানান, সরকারপ্রধান অনুষ্ঠানে উপস্থিত ঊর্ধ্বতন সেনা কর্মকর্তাদের উদ্দেশে দিকনির্দেশনামূলক বক্তব্য দেন। বক্তব্যের শুরুতে প্রধানমন্ত্রী সেনাবাহিনীর আধুনিকায়ন ও পুনর্গঠনে প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের অবদান গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন। একই সঙ্গে মহান মুক্তিযুদ্ধে আত্মোৎসর্গকারী শহীদ, যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা এবং দেশের সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের অবদানের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান। পার্বত্য চট্টগ্রামে দায়িত্ব পালনকালে নিহত সেনাসদস্যদের প্রতিও গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।

আধুনিক জাতীয় নিরাপত্তা নীতিমালার ঘোষণা : প্রধানমন্ত্রী জানান, শহীদ প্রেসিডেন্ট লেফটেন্যান্ট জেনারেল জিয়াউর রহমানের ধারণার আলোকে একটি আধুনিক নীতিমালা প্রণয়ন করা হবে। যেখানে সশস্ত্র বাহিনী, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, বেসামরিক প্রশাসন, শিল্প, প্রযুক্তি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সাধারণ জনগণ একটি সমন্বিত জাতীয় নিরাপত্তা কাঠামোর অংশ হিসেবে কাজ করবে। এই নীতিমালার উদ্দেশ্য যুদ্ধকে উৎসাহিত করা নয়; বরং সম্ভাব্য যেকোনো সংকট, আগ্রাসন কিংবা দুর্যোগ মোকাবিলায় সদাপ্রস্তুত, স্থিতিশীল ও আত্মনির্ভরশীল সশস্ত্র বাহিনী গড়ে তোলা, যাতে দেশের সার্বভৌমত্ব, স্বাধীনতা ও জাতীয় স্বার্থ সর্বতোভাবে সুরক্ষিত থাকে।

সেনাবাহিনীর সঙ্গে আবেগের সম্পর্ক : প্রধানমন্ত্রী বলেন, সেনাবাহিনীর যেকোনো সাফল্যে গৌরববোধ করি। আবার কোনো নেতিবাচক খবরে অস্বস্তি অনুভব করি। প্রায়ই বলি, ক্যান্টনমেন্ট আমার গভীর আবেগ এবং স্মৃতিময় স্থান। ঘরে-বাইরে সেনা পরিবেশেই কৈশোর ও তারুণ্যের দিনগুলো কেটেছে। ফলে সেনাবাহিনীর নিয়ম-শৃঙ্খলা ও বিধিবিধান সম্পর্কেও ওয়াকিবহাল। সেনাবাহিনীকে বরাবরই বৃহত্তর পরিবারের অংশ বলেই মনে করি।

পদোন্নতিতে মেধা ও নেতৃত্বই হোক প্রধান বিবেচনা : সেনাবাহিনীতে পদোন্নতির ক্ষেত্রে রাজনৈতিক বিবেচনা নয়, বরং সততা, ন্যায়পরায়ণতা, পেশাগত যোগ্যতা, চারিত্রিক দৃঢ়তা, দূরদর্শিতা ও নেতৃত্বের গুণাবলিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, পদোন্নতি কিংবা পদায়নের ক্ষেত্রে কিছু সুনির্দিষ্ট নীতিমালা অনুসরণ করলে সেনা সদর সিলেকশন বোর্ড পেশাদারত্ব প্রতিষ্ঠায় যুগান্তকারী ভূমিকা পালন করতে পারে। এর মাধ্যমে পদায়ন ও পদোন্নতির ক্ষেত্রে শৃঙ্খলা পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হবে এবং ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের একটি সুদৃঢ় ভিত্তি তৈরি হবে।

আধুনিক ও প্রযুক্তিনির্ভর সেনাবাহিনী গঠনের রূপরেখা : সময়ের চাহিদা অনুযায়ী আধুনিক ও প্রযুক্তিনির্ভর সেনাবাহিনী গড়ে তুলতে সরকার বদ্ধপরিকর উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান, অর্থনৈতিক সক্ষমতা, জাতীয় নিরাপত্তার প্রয়োজনীয়তা এবং জনগণের প্রত্যাশা বিবেচনায় নিয়ে প্রতিরক্ষা আধুনিকায়নের একটি বাস্তবসম্মত ও টেকসই মডেল অনুসরণ করা সময়ের দাবি। সরকার সশস্ত্র বাহিনীর আধুনিকায়নের জন্য একটি রূপরেখা প্রণয়ন করছে জানিয়ে তিনি বলেন, আমাদের লক্ষ্য হবে বাহিনীর উন্নয়নে সংখ্যার পরিবর্তে সক্ষমতা, সম্প্রসারণের পাশাপাশি কার্যকারিতা, প্ল্যাটফর্ম বৃদ্ধির পরিবর্তে প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন এবং একক বাহিনীকেন্দ্রিক উন্নয়নের পরিবর্তে জয়েন্টনেসের ওপর গুরুত্ব দেওয়া।

শান্তিরক্ষা মিশনে অবদানের স্বীকৃতি : জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর দক্ষতা, পেশাদারত্ব ও নিষ্ঠার ভূয়সী প্রশংসা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এই অর্জনের পেছনে রয়েছে আত্মত্যাগের গৌরবময় ইতিহাস। ২০২৫ সালের ১৩ ডিসেম্বর দক্ষিণ সুদানে ড্রোন হামলায় নিহত ছয়জন বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীর স্মরণে তিনি তাদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করেন এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান।

গণঅভ্যুত্থান ও পরবর্তী সময়ে সেনাবাহিনীর ভূমিকার প্রশংসা : ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থান এবং পরবর্তী সময়ে সেনাবাহিনীর ভূমিকার প্রশংসা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, গণতন্ত্রকামী জনগণ এই ভূমিকা ইতিবাচকভাবেই মূল্যায়ন করবে। তিনি বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের পুরো সময়জুড়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, শিল্পাঞ্চলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং স্থবির হয়ে পড়া অর্থনীতির চাকা সচল রাখার ক্ষেত্রেও সেনাবাহিনী প্রশংসনীয় ভূমিকা পালন করেছে। গত ১২ ফেব্রুয়ারির ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সফলভাবে অনুষ্ঠানে সেনাবাহিনীর সহায়তার কথাও স্মরণ করেন তিনি।

প্রধানমন্ত্রী সেনা সদরে পৌঁছালে সেনাবাহিনীর প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান এবং চিফ অব জেনারেল স্টাফ লেফটেন্যান্ট জেনারেল মোহাম্মদ মাইনুর রহমান তাকে স্বাগত জানান। অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল একেএম শামছুল ইসলাম, প্রতিরক্ষাসচিব আশরাফ উদ্দিন, সেনাবাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাসহ সংশ্লিষ্ট সামরিক কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠান শেষে প্রধানমন্ত্রী সেনা কর্মকর্তাদের সঙ্গে সৌজন্য ছবি তোলেন এবং সেনাবাহিনীর পরিদর্শন বইয়ে স্বাক্ষর করেন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত