পাহাড় রক্ষার জন্য মামলা হলেও মামলার ফাঁকেই সাবাড় হয়ে যাচ্ছে নগরীর পাহাড়গুলো। চট্টগ্রামে পরিবেশ আদালতে শতাধিক মামলা রয়েছে। এগুলোর প্রাথমিক তদন্ত, অভিযোগপত্র দাখিল ও শুনানি শেষে বিচারের রায় দেওয়ার মধ্যবর্তী সময়ে পাহাড় কাটা চলতে থাকে। ফলে মামলা হলেই যে পাহাড় কাটা বন্ধ হয় তা নয়, উপরন্তু পাহাড় সাবাড় আরও দ্রুত হয়।
বিষয়টি স্বীকার করে চট্টগ্রামের পরিবেশ আদালতের স্পেশাল পাবলিক প্রসিকিউটির (স্পেশাল পিপি) অ্যাডভোকেট হুমায়ুন রশিদ তালুকদার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘মামলা করার পর অভিযোগপত্র দাখিল ও শুনানি শেষে রায় দিতে দুই থেকে তিন বছর সময় লেগে যায়। ফলে পাহাড় কাটার মামলার রায়ের পর অনেক ক্ষেত্রেই আর পাহাড়ের অস্তিত্ব থাকে না। একইভাবে পুকুর ভরাট মামলায়ও রায়ের পর দেখা যায় অনেক জায়গায় ভবনও উঠে গেছে।’
কেন এমন হয়, জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘একটা ঘটনা নিয়ে মামলা হওয়ার পর সংশ্লিষ্ট দপ্তরের প্রতিনিধিরা আর স্পটে যান না। আর এতে সুযোগের অপেক্ষায় থাকা ব্যক্তিরা সংশ্লিষ্ট পাহাড় কেটে ফেলেন।’
অ্যাডভোকেট হুমায়ুন রশিদ তালুকদারের কথার সত্যতা পাওয়া যায় চট্টগ্রাম মহানগরীর অর্ধেক কাটা পাহাড়গুলোর দিকে তাকালে। গতকাল বৃহস্পতিবার নগরীর বায়েজিদ চন্দ্রনগর, ফয়’স লেক, আকবরশাহ লেকসিটি আবাসিক এলাকা, বায়েজিদ বাইপাস রোডসহ প্রভৃতি এলাকা ঘুরে অসংখ্য অর্ধেক কাটা পাহাড় দেখা যায়।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, এসব পাহাড় প্রথমে কাটার পর পরিবেশ অধিদপ্তরের এনফোর্সমেন্ট টিম অভিযান চালিয়েছিল এবং শুনানি করে জরিমানাও করেছিল। জরিমানার পর আবারও পাহাড় কাটা চলে।
গতকাল দুপুরে বায়েজিদ চন্দ্রনগর গ্রিনভিউ আবাসিক এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, প্রায় ১৬ একর আয়তনের একটি পাহাড় অর্ধেক কাটা অবস্থায় পড়ে রয়েছে। কয়েক দিন আগেও এখানে এক্সকাভেটর দিয়ে পাহাড় কাটা হয়েছে। এখন পাহাড়টি প্রায় সমতল হয়ে গেছে। স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এই পাহাড় কাটার বিরুদ্ধে মামলাও হয়েছিল। কিন্তু পাহাড় কাটা থামেনি।
এ বিষয়ে কথা হয় পরিবেশ অধিদপ্তর চট্টগ্রাম কার্যালয়ের পরিদর্শক মনির হোসেনের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘এই পাহাড় কাটার বিরুদ্ধে আমরা গত জানুয়ারিতে ১৮ জনকে আসামি করে পরিবেশ আদালতে মামলা করেছি। মামলার পর এখন প্রাথমিক তদন্ত চলছে এবং তদন্তের পর চার্জশিট (অভিযোগপত্র) দেওয়া হবে।’
মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা পরিবেশ অধিদপ্তরের সিনিয়র কেমিস্ট জান্নাতুল ফেরদৌস বলেন, ‘মামলার পরও পাহাড়খেকোরা পাহাড় কাটা বন্ধ করেনি। কয়েক দিন আগেও এখানে পাহাড় কাটা হয়েছে। আমরা গত মঙ্গলবার ভিজিট করে সেই প্রমাণও পেয়েছি।’
জানুয়ারিতে মামলা দায়ের ও গত মঙ্গলবারের চিত্রের মধ্যে কোনো পার্থক্য চোখে পড়েছি কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘মামলা করার সময় পাহাড় ছিল। এখন পাহাড়ের অনেকখানি কেটে ফেলা হয়েছে। এজন্য আমরা তাদের বিরুদ্ধে আরেকটি নোটিস করেছি। সেই নোটিসে শুনানির জন্য মালিকপক্ষকে ডাকা হয়েছে।’
মামলার রায় কবে নাগাদ হতে পারে এমন প্রশ্নের জবাবে তদন্ত কর্মকর্তা বলেন, ‘রায় তো আদালত দেবে। আমরা চার্জশিট দাখিল করার পর আদালতে শুনানি হবে এবং শুনানির পর আদালত রায় দিয়ে থাকে। একসময় এসব মামলার রায় হতে অনেক সময় লাগত, এখন তা অনেকটা কমে এসেছে।’
অজামিনযোগ্য অপরাধ গণ্য করতে হবে
জরিমানা কিংবা মামলা করার পর আসামিরা জামিনে বের হয়ে আসায় পাহাড় কাটা পুরোপুরি বন্ধ করা যাচ্ছে না বলে পরিবেশ অধিদপ্তর ও জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা জানান। এ বিষয়ে চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক আবুল বাসার মোহাম্মদ ফখরুজ্জামান গতকাল সন্ধ্যায় দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘যখনই পাহাড় কাটার সংবাদ পাই, আমরা ঘটনাস্থলে ম্যাজিস্ট্রেট পাঠিয়ে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে শাস্তি দিয়ে থাকি। কিন্তু কাউকে না পেলে কিছু করা যায় না। তবে দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতায় আমাদের কাছে মনে হয়েছে পাহাড় কর্তন আইনে কিছুটা সংশোধন আনা প্রয়োজন।’
কেমন সংশোধন, এই প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘মামলা জামিনযোগ্য হয়ে যাওয়ায় আসামিরা নির্বিঘেœ মামলা চলাকালেও পাহাড় কাটছেন। মামলা শেষে রায়ে হয়তো তারা জরিমানা দিয়েই পার পেয়ে যাচ্ছেন। তাই যদি আইন সংশোধন করে জামিন অযোগ্য করা হয়, তাহলে হয়তো পাহাড় কাটা কমে আসবে। তখন জেলে থাকার ভয়ে পাহাড় কাটায় জড়িত প্রভাবশালীরা এই অপরাধ থেকে সরে আসতে পারেন।’
জেলা প্রশাসক জানান, গত সোমবারও চন্দ্রনগর এলাকায় একটি পাহাড় কাটার ঘটনা ঘটেছে। আরও জানা যায়, এই পাহাড় কাটার দায়ে আগেও একটি মামলা হয়েছিল। আবার মামলা করার নির্দেশনা দিয়েছেন তিনি। কিন্তু যদি আসামিরা জামিন না পেতেন তাহলে পাহাড় কাটার সাহস করতেন না বলে তিনি মনে করেন।
পরিবেশ আদালতের স্পেশাল পিপি অ্যাডভোকেট হুমায়ুন রশিদ তালুকদার বলেন, পাহাড় কাটা আইনে আসামির জামিনের বিধান রয়েছে। অন্যদিকে কয়েক বছর পর মামলার রায় হলেও শাস্তি জরিমানা ও অনাদায়ে এক বছরের জেল। যারা পাহাড় কাটায় জড়িত তাদের জন্য জরিমানা দেওয়া তো কোনো ব্যাপারই নয়।
অভিযোগপত্র দাখিলে দেরি
পরিবেশ অধিদপ্তর থেকে প্রাপ্ত তথ্যমতে, পাহাড় কাটার অভিযোগে ২০০৩ সাল থেকে এ পর্যন্ত ৯২টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি মামলা হয়েছে ২০২২ সালে। মামলাগুলো সবই হয়েছে আকবরশাহ, বায়েজিদ, খুলশী ও পাঁচলাইশ এলাকায়।
এদিকে ২০০৩ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত দায়ের করা ৮৩টি মামলার পরিসংখ্যানে দেখা যায়, মাত্র একটি মামলার চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেওয়া হয়েছে। বাকি ৮২টি মামলার মধ্যে চার্জশিট দাখিল হয়েছে ৫০টির ও তদন্তাধীন রয়েছে ৩২টি। হাটহাজারী থানায় ২০০৭ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি দায়ের করা মামলার চার্জশিট দেওয়া হয়েছে ২০২০ সালের ৩ সেপ্টেম্বর। খুলশী থানায় ২০০৭ সালের ২৫ জানুয়ারি বশির আহমেদ গংকে আসামি করে দায়ের করা মামলার চার্জশিট দেওয়া হয়েছে ২০২১ সালের ১৮ জানুয়ারি। ২০০৭ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর খুলশী থানায় খুরশীদ জাহান বেগম গংকে আসামি করে দায়ের করা মামলার চার্জশিট দেওয়া হয় ২০১৬ সালের ১৮ জুলাই। তবে কোনো কোনো মামলায় দ্রুত চার্জশিট দেওয়ারও নজির রয়েছে। যেমন বাকলিয়া থানায় ২০০৮ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি দায়ের করা মামলায় একই বছরের ১৬ জুন চার্জশিট দেওয়া হয়। এ ছাড়া খুলশী থানায় ২০১৯ সালের ১৭ জুলাই হোসনে আরা বেগমকে আসামি করে দায়ের করা মামলায় চার্জশিট দেওয়া হয় ২০২০ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি।
এ ছাড়া মামলার তদন্তের দেরির ঘটনা ঘটছে। আকবারশাহ থানায় ২০২০ সালের ৩১ ডিসেম্বরে করা মামলাটি এখনো তদন্তাধীন। এ ছাড়া ২০২১ থেকে দায়ের করা প্রায় সব মামলাই তদন্তাধীন।
চট্টগ্রাম বিভাগীয় পরিবেশ অধিদপ্তরের কার্যালয় থেকে ২০১২ সালে বদলি হয়ে বর্তমানে ঢাকা সদর দপ্তর কার্যালয়ে সহকারী পরিচালক (পরিকল্পনা) বিভাগে রয়েছেন সাইফুল আশ্রাব। তিনি গতকাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘২০১২ সালে চট্টগ্রাম থেকে চলে আসার পরও এখনো প্রায়ই চট্টগ্রামের আদালতে যেতে হয় মামলার সাক্ষ্য দিতে অথবা তদন্তের কাজে।’ আগামী মাসের প্রথম সপ্তাহেও সাক্ষ্য আছে জানিয়ে তিনি বলেন, অনেক মামলা ২০১২ সালের আগের ঘটনার।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পরিবেশ অধিদপ্তরের বর্তমান ও এখান থেকে বদলি হয়ে যাওয়া একাধিক কর্মকর্তা জানান, অনেক বছর পর মামলাগুলো দুর্বল হয়ে যায়, পাহাড়খেকোরা ছাড়া পেয়ে যায় কিংবা দোষী প্রমাণিত হলেও জরিমানা বা কারাভোগ হলেও পাহাড় তো আর ফিরে পাওয়া যায় না। আর এভাবেই চট্টগ্রামের পাহাড়গুলো বিলীন হয়ে যাচ্ছে।
আইনে কী আছে
পরিবেশ সংরক্ষণ আইন-২০১০ অনুযায়ী, ‘কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান কর্তৃক সরকারি বা আধাসরকারি বা স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের মালিকানাধীন বা দখলাধীন বা ব্যক্তি-মালিকানাধীন পাহাড় ও টিলা কর্তন বা মোচন করা যাইবে না। তবে শর্ত থাকে যে, অপরিহার্য জাতীয় স্বার্থের প্রয়োজনে অধিদপ্তরের ছাড়পত্র গ্রহণক্রমে কোনো পাহাড় বা টিলা কর্তন বা মোচন করা যাইতে পারে।’ আইনে অনুমোদন ছাড়া পাহাড় কাটার শাস্তি সম্পর্কে বলা রয়েছে ‘পাহাড় কাটা আমলযোগ্য অপরাধ। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পূর্ব অনুমতি ছাড়া কোনো সরকারি, আধাসরকারি, স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান অথবা ব্যক্তি পাহাড় কাটতে বা নিশ্চিহ্ন করতে পারবে না। যদি কেউ এটি অমান্য করে, তবে তাকে অথবা ওই প্রতিষ্ঠানকে দুই বছর কারাদন্ড অথবা দুই লাখ টাকা জরিমানা অথবা উভয় দন্ডে দন্ডিত করা হবে। ফের একই অপরাধ করলে, ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে ১০ বছর কারাদন্ড অথবা ১০ লাখ জরিমানা গুনতে হবে।’
