দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) বাংলাদেশ ব্যাংক কিংবা জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) মতো সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো জনগণকে সেবা দিতে ব্যর্থ হয়েছে। সবার জন্য বৈষম্যহীন প্রাতিষ্ঠানিক সেবার বদলে সেবাদানের ক্ষেত্রে দলীয় পরিচয় বিবেচনা করা হয়। একদিকে প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার অভাব, অন্যদিকে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের প্রভাবে এসব প্রতিষ্ঠান ঠিকমতো কাজ করতে পারছে না।
‘ইজ দ্য বাংলাদেশ প্যারাডক্স সাসটেইনেবল?’ গ্রন্থের মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠানে এমন পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেছেন বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ এবং গবেষকরা। বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিং (সানেম) গতকাল রবিবার রাজধানীর ব্র্যাক সেন্টার ইনে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। প্রধানমন্ত্রীর অর্থনৈতিক উপদেষ্টা ড. মসিউর রহমান এতে প্রধান অতিথি ছিলেন।
দুর্নীতি, খেলাপি ঋণ, প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা ও সুশাসনের অভাব প্রসঙ্গে বিভিন্ন বক্তার সমালোচনা প্রসঙ্গে ড. মসিউর রহমান বলেন, সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা বাড়াতে কাজ করছে সরকার। তবে রাতারাতি সব সংস্কার সম্ভব নয়। তিনি স্বীকার করেন আগের তুলনায় খেলাপি ঋণের সংখ্যা কমলেও পরিমাণে বেড়েছে, যা ব্যাংক খাতে অস্বস্তিকর পরিস্থিতি তৈরি করেছে।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের চেয়ারম্যান ড. রেহমান সোবহান বলেন, ‘আমাদের দেশের প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা নিয়ে অনেক কথা হয়। ভালো কাজ করা প্রতিষ্ঠানগুলোকেও চিহ্নিত করা দরকার। ভিয়েতনামের মতো দেশে অনেক ভালো প্রাতিষ্ঠানিক কাজ আছে। তাদের প্রতিষ্ঠানগুলো শক্তিশালী। বাংলাদেশের সঙ্গে তুলনা করতে গেলে চীন-ভিয়েতনাম এ ক্ষেত্রে অনেক ভালো।’
আলোচনায় ড. রেহমান সোবহান বলেন, দুদক, বাংলাদেশ ব্যাংক কিংবা এনবিআরের মতো সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো জনগণকে সেবা দিতে ব্যর্থ হয়েছে। সবার জন্য বৈষম্যহীন প্রাতিষ্ঠানিক সেবার বদলে সেবাদানের ক্ষেত্রে দলীয় পরিচয় বিবেচনা করা হয়। একদিকে প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার অভাব, অন্যদিকে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের প্রভাবে এসব প্রতিষ্ঠান ঠিকমতো কাজ করতে পারছে না। অবস্থাটা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে, এসব প্রতিষ্ঠানকে এখন আর মানুষ বিশ্বাস করে না। এ কারণে বিনিয়োগ সম্ভাবনার তুলনায় কম। তিনি বলেন, যে দেশের মোট দেশজ উৎপাদন জিডিপির প্রবৃদ্ধি ৬ শতাংশের ওপরে, সে দেশে কেন বিদেশি বিনিয়োগ-এফডিআই আসছে না তা খতিয়ে দেখা দরকার।
ব্যাংক খাতে বাস্তবতা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এ খাতে এখন নাটক চলছে। আত্মীয়তার সূত্র অথবা ক্ষমতাসীন দলের আনুকূল্যে ঋণ মেলে, যা পরে খেলাপিতে পরিণত হয়। ঋণখেলাপিরা জাতীয় নির্বাচন করতে পারবেন না এ রকম আইন ছিল একসময়। পরে আইন পরিবর্তন করে ডাউন পেমেন্ট দিয়ে নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ করে দেওয়া হয়। নির্বাচিত হলে আর ঋণ পরিশোধ করতে হয় না।
রেহমান সোবহান বলেন, ‘যেহেতু বাংলাদেশ একটি দ্বান্দ্বিক নীতির মধ্যে আছে। আমাদের দ্বান্দ্বিক নীতি দীর্ঘস্থায়ী হবে কি না, সেটিই দেখার বিষয়। তাই এটি স্থায়ী হলে উন্নয়নও স্থায়ী হবে।’
নব্বইয়ের দশকে আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের নীতির সমালোচনা করে রেহমান সোবহান বলেন, ‘তারা যখন নব্বইয়ের দশকে বাংলাদেশে উন্নয়নের কার্য পরিচালনা করছিল, তখন তারা উন্নয়নের জন্য সংস্কারকে চিহ্নিত করেনি। আমরা তখন পূর্ব এশিয়ার মডেল ফলো করছিলাম। অথচ সে সময়ে প্রতিষ্ঠিত হওয়া সিঙ্গাপুর এয়ারলাইনসের সঙ্গে বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের তুলনায় দেখা যায়, এখানে বড় বিষয় সুশাসনের অনুশীলন। একইভাবে দক্ষিণ কোরিয়া ও তাইওয়ানের সফলতাও সুশাসনের কারণেই। তাদের অর্থনীতি স্থিতিশীল হওয়ার জন্য খুব সুন্দর শিল্পনীতি ছিল। সর্বসাকল্যে আমরা বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এসব ক্ষেত্রে পিছিয়ে পড়ার জন্য প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতাকেই চিহ্নিত করতে পেরেছি।’
এর আগে ইজ বাংলাদেশ প্যারাডক্স সাসটেইনেবল? বইয়ের ওপর আলোচনা করতে গিয়ে বইটির লেখক ও সানেমের নির্বাহী পরিচালক সেলিম রায়হান বলেন, বইটিতে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি নিয়ে বিশ্লেষণ করা হয়েছে। দেশে আসলে বিস্ময়কর কোনো উন্নয়ন হয়নি। বরং মানসম্মত প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ ছাড়াই একধরনের প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে। পোশাক খাতের মতো প্রবৃদ্ধির চলকের সঙ্গে রাজনৈতিক বোঝাপড়ার মাধ্যমে প্রবৃদ্ধি এসেছে। তবে পরবর্তী ধাপে এ ধরনের প্রবৃদ্ধি সম্ভব নয়। প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার ছাড়া দ্বিতীয় ধাপের প্রবৃদ্ধি অর্জন সম্ভব নয়। কারণ এখানে শিল্প ব্যবস্থাপনায় শুধু পোশাক খাতই লাভবান হয়েছে। নজরদারি প্রতিষ্ঠানগুলো অকার্যকর হয়ে পড়ছে। রাজস্ব ও বাজেট বাস্তবায়ন কমেছে। দুর্নীতির স্থিতিশীল অবস্থা তৈরি হয়েছে। আর এসব দূরীকরণে শক্তিশালী সংস্কারবিরোধী শক্তি গড়ে উঠেছে। যার পরিবর্তনে শক্তিশালী রাজনৈতিক সদিচ্ছা প্রয়োজন।
ড. সেলিম রায়হান বলেন, স্থিতিশীল দুর্নীতির জায়গা এখন বাংলাদেশ। এখানে এখন সংস্কার প্রয়োজন। কিন্তু যখনই সংস্কারের উদ্যোগ আসে, সেখানে সংস্কারের বিপক্ষে একদলের তৎপরতা শুরু হয়ে যায়। তারা এগুলো হতে দেয় না। এতটাই শক্তিশালী অবস্থান যে, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য এখন বড় ধরনের রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও উদ্যোগ প্রয়োজন। তিনি বলেন, ‘আমাদের দেশের এলিটরা এসব স্থিতিশীল দুর্নীতির বিষয়টি বুঝতে পেরেছেন। তাও দেরিতে। এখন এসব চ্যালেঞ্জ বাংলাদেশের ভবিষ্যৎকে পেছনে ফেলে দিচ্ছে।’
সেলিম রায়হান বলেন, ‘আমাদের দেশে যেসব খাতে বেশি ব্যয় করার প্রয়োজন, সেখানে বরাদ্দ সবচেয়ে কম। আমাদের শিক্ষা বাজেট ২ শতাংশ, স্বাস্থ্যে ১ শতাংশেরও কম। স্থিতিশীল দুর্নীতি দূর করতে এজন্য রাজনৈতিক সদিচ্ছা প্রয়োজন।’
বইটির আরেক লেখক অধ্যাপক সায়মা হক বিদিশা বলেন, ‘একদিকে ব্যাংক ভালো ব্যবসা করছে, অন্যদিকে ব্যাংক খাতে আবার ঋণখেলাপি বাড়ছে। এটাই একটি স্ববিরোধী অবস্থান তৈরি করছে, যাকে আমরা প্যারাডক্স বলছি। রাষ্ট্রীয় বাণিজ্যিক ব্যাংকের অনিয়ম-দুর্নীতি বেসরকারি ব্যাংকে এসে পড়ছে।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক এমএম আকাশ বলেন, ‘আমাদের দেশের মানুষ নিয়ে চিন্তা করতে হবে কারা সিদ্ধান্ত নেয় আর কারা নীতি গ্রহণ করে। আমাদের দেশের আর্থিক খাতের সুশাসন না হলে সেখানে আরও বেশি সমস্যা হবে। এখন দেখার বিষয় বর্তমান ক্ষমতাসীন দল কীভাবে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতাকে ব্যবহার করে এগুলো নিয়ন্ত্রণ করছে।’
আলোচনায় যুক্তরাজ্যের উলস্টার ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ড. এস আর ওসমানি বলেন, সাধারণত, সুশাসন না থাকলে উন্নয়ন হয় না। তবে বাংলাদেশে তা সম্ভব হয়েছে। সেদিক থেকে গ্রন্থের নামকরণ সার্থক।
‘ইজ দ্য বাংলাদেশ প্যারাডক্স সাসটেইনেবল?’ গ্রন্থটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক সায়মা হক বিদিশাসহ কয়েকজন শিক্ষক রচনা করেন। সম্পাদনা করেন যৌথভাবে সানেমের নির্বাহী পরিচালক এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক সেলিম রায়হান, ড. ফ্রাঁসোয়া বুরগনিওন ও ড. ওমর সালাম।
গ্রন্থের বিভিন্ন দিক তুলে ধরে ড. সেলিম রায়হান বলেন, বইটির প্রথম অধ্যায়ে বাংলাদেশের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো, অংশীজনদের জরিপ প্রাথমিক শিক্ষা, ব্যাংকিং খাত এবং ভূমি প্রশাসনে প্রাতিষ্ঠানিক চ্যালেঞ্জ নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। উন্নয়ন টেকসই না হওয়ার আশঙ্কার পেছনে অন্য কারণ হিসেবে তিনি বলেন, একটি শক্তিশালী সংস্কারবিরোধী জোট রয়েছে, যা দুর্নীতির চক্রকে ভাঙতে বাধা দেয়।
অন্যদের মধ্যে আলোচনায় অংশ নেন পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট-পিআরইর চেয়ারম্যান ড. জায়েদী সাত্তার, ড. এম হাসান, ড. সায়মা হক, ড. মনজুর হোসেন, ড. কাজী মারুফুল ইসলাম প্রমুখ।