দুই চিকিৎসককে মারধরের প্রতিবাদে ২৪ ঘণ্টার জন্য (মঙ্গলবার ভোর ৬টা থেকে বুধবার ভোর ৬টা পর্যন্ত) রোগীদের সেবা বন্ধ করে দিয়েছে বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন (বিএমএ) চট্টগ্রাম শাখা। কর্মসূচির অংশ হিসেবে গতকাল মঙ্গলবার ভোর ৬টা থেকে চট্টগ্রামে চিকিৎসকদের ব্যক্তিগত চেম্বার এবং রোগ নির্ণয়কেন্দ্রে পরীক্ষা-নিরীক্ষা বন্ধ থাকে। আজ ভোর ৬টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টা এ কর্মসূচি পালন হবে।
চিকিৎসকদের এ কর্মসূচির ফলে চট্টগ্রাম ও আশপাশের জেলা থেকে নগরীর বিভিন্ন বেসরকারি হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে সেবা নিতে আসা অসংখ্য রোগী ফিরে যান বিনা চিকিৎসাতেই। গতকাল সকাল থেকে নগরের বেসরকারি সিএসসিআর, মেডিকেল সেন্টার, পার্কভিউ হসপিটাল, চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন হাসপাতাল, এপিক, শেভরনসহ বিভিন্ন চিকিৎসাসেবা প্রতিষ্ঠানে ভিড় জমে রোগী ও তাদের স্বজনদের।
সকাল ১০টায় ফেনীর ছাগলনাইয়া থেকে ছয় বছরের সন্তানকে নিয়ে প্রবর্ত্তক মোড়ে বেসরকারি সিএসসিআর হাসপাতালে এসেছিলেন আবদুল মোতালেব। চিকিৎসাসেবা বন্ধ থাকায় বিপাকে পড়েন তিনি। সকাল ১০টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত অপেক্ষা করে আট বছরের শিশুকন্যার চিকিৎসা না পেয়ে একই হাসপাতাল থেকে হতাশ হয়ে ফেরেন নগরের চান্দগাঁও এলাকার গৃহবধূ মরিয়ম বেগম।
গতকাল বেলা ১১টায় রাঙ্গামাটি থেকে সড়ক দুর্ঘটনায় আহত স্বামী চিং মং চাকমার সিটি স্ক্যান করাতে নগরের কাতালগঞ্জে বেসরকারি রোগ নির্ণয়কেন্দ্র ইবনে সিনায় এসেছিলেন স্ত্রী শুভ্র চাকমা। দুপুর ১টা পর্যন্ত অপেক্ষার পর তিনি জানতে পারেন চিকিৎসকদের কর্মবিরতির কারণে বুধবার ভোর ৬টা পর্যন্ত কোনো রোগীর পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হবে না। অবশেষে হতাশ হয়ে অসুস্থ স্বামীকে নিয়ে ইবনে সিনা ত্যাগ করেন তিনি।
গতকাল বেলা ১১টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত নগরের বিভিন্ন বেসরকারি হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার ঘুরে অসংখ্য রোগী ও তাদের স্বজনদের ভোগান্তির চিত্র দেখা যায়। নগরের পাঁচলাইশ এলাকায় শেভরন ডায়াগনস্টিক সেন্টারে গিয়ে দেখা যায়, বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে আসা শতাধিক নারী-পুরুষ ও শিশুর জটলা। তাদের একজন রুবেল কান্তি ধর। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘লিপিড প্রোফাইল, সিবিসি পরীক্ষার জন্য রক্তের নমুনা দিতে এসেছি। সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত অপেক্ষা করছি। কিন্তু যারা নমুনা নেবেন তারা চেম্বারে নেই। আমাদের কী দোষ?’
চমেক হাসপাতালের অদূরে পপুলার ডায়াগনস্টিক সেন্টারে গিয়েও দেখা গেছে একই চিত্র। চিকিৎসকদের ব্যক্তিগত চেম্বার বন্ধ।
দুই চিকিৎসককে মারধরের জেরে গত ১৮ এপ্রিল চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সামনে অনুষ্ঠিত প্রতিবাদ সভা থেকে এ কর্মসূচি আহ্বান করে বিএমএ চট্টগ্রাম শাখা। এর আগে ২০ এপ্রিল চট্টগ্রামের চিকিৎসকরা দুই ঘণ্টার কর্মবিরতি পালন করেন। ধারাবাহিক কর্মসূচির অংশ হিসেবে গতকাল সকাল ৬টা থেকে ২৪ ঘণ্টা ব্যক্তিগত চেম্বার বন্ধ রাখার পাশাপাশি ল্যাব, ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও বেসরকারি হাসপাতালে রোগী ভর্তি বন্ধ রাখা হয়।
জাহাঙ্গীর হোসেন নামে এক যুবক তার মায়ের কিডনি পরীক্ষার জন্য সকাল থেকে এপিক, ইবনে সিনা, সিএসসিআর এবং শেভরন রোগ নির্ণয়কেন্দ্রে গিয়ে পরীক্ষা করাতে ব্যর্থ হন। তিনি বলেন, ‘আমাদের কী দোষ, এটা কি মগের মুল্লুক?’
চিকিৎসকদের কর্মবিরতির কারণে রোগীদের ভোগান্তির কথা স্বীকার করে পার্কভিউ হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ডা. রেজাউল করিম বলেন, ‘চিকিৎসকদের সামাজিক নিরাপত্তা নেই। দুই চিকিৎসককে রোগীর স্বজনরা মারধর করলেন। ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে থানায় মামলা হয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত একজন আসামিকেও গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ।’
এ প্রসঙ্গে বিএমএ চট্টগ্রাম শাখার সভাপতি ডা. মুজিবুল হক খান বলেন, ‘আমাদের সহকর্মীকে মারধরের ঘটনায় কর্মসূচি ঘোষণা করেছি। তবে জরুরি চিকিৎসাসেবা এ কর্মসূচির আওতামুক্ত থাকবে।’
গত ১৪ এপ্রিল চট্টগ্রাম নগরের জিইসি মোড়ে মেডিকেল সেন্টার হাসপাতালে রোগীর স্বজনরা রিয়াজ উদ্দিন নামে এক চিকিৎসককে মারধর করেন। তার আগে ১১ এপ্রিল পটিয়ার একটি হাসপাতালে রক্তিম দাশ নামে অন্য এক চিকিৎসকের ওপর হামলা হয়। এর প্রতিবাদে চিকিৎসকদের ধারাবাহিক কর্মসূচি চলছে।
