রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলার ৩নং বড়বিল ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার আড়াই বছর পর পরাজিত চেয়ারম্যান প্রার্থী অ্যাডভোকেট শামছুল হুদার পক্ষে রায় দিয়েছেন আদালত। টানা দুই দিন ভোট গণনার পর সোমবার (২২ এপ্রিল) রাত ৯টার দিকে রংপুর নির্বাচনী ট্রাইব্যুনাল আদালতের বিচারক ওয়াহিদুজ্জামান এ রায় দেন।
তবে গতকাল মঙ্গলবার সন্ধ্যায় এই রায়ের কপি পাওয়ার বিষয়টি জানিয়েছেন বিজয়ী চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট শামছুল হুদা।
এর আগে চলতি মাসের ৪ এপ্রিল একই আদালতে ৪নং গঙ্গাচড়া সদর ইউনিয়নে প্রায় দুই বছর দায়িত্ব পালন করা চেয়ারম্যান মাজহারুল ইসলাম লেবুকে অবৈধ ঘোষণা করে নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী মাহফুজার রহমান দুলুকে ৩২৭ ভোটে বিজয়ী ঘোষণা করেন বিজ্ঞ নির্বাচনী ট্রাইব্যুনাল আদালত।
সূত্র মতে, প্রায় আড়াই বছর আইনি লড়াই শেষে রংপুরের গঙ্গাচড়ার দুই ইউনিয়নের নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগের মামলায় বিজ্ঞ আদালতের রায়কে স্বাগত জানিয়েছেন স্থানীয় জনগণ। তারা রীতিমত নির্বাচনে আমেজে এলাকায় ব্যান্ড পার্টি দিয়ে আনন্দ শোভাযাত্রা বের করে। তারা আরও বলেন, আগামীতে এই রায় দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।
জানা গেছে, ২০২১ সালের ২৬ ডিসেম্বর রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলার ৩নং বড়বিল ও ৪নং গঙ্গাচড়া সদর ইউনিয়নে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ওই দিন ৩নং বড়বিল ইউপিতে ৬ হাজার ২৩৫ ভোট দেখিয়ে আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী শহীদ চৌধুরী দ্বীপকে চেয়ারম্যান ঘোষণা করা হয়। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী অ্যাডভোকেট শামছুল হুদা পান ৬ হাজার ১০০ ভোট। পরে ভোট কারচুপি হচ্ছে-এমন অভিযোগ এনে শামছুল হুদা পুনঃরায় ভোট গণনার জন্য রংপুর ট্রাইব্যুনাল আদালতে মামলা দায়ের করেন।
দীর্ঘ আড়াই বছর পর গত রবিবার ও সোমবার টানা দুইদিন ওই ভোট গণনা শেষে রাত ৯টার দিকে ৪০২ ভোট বেশি পেয়ে শামছুল হুদার পক্ষে রায় ঘোষণা করেন বিজ্ঞ বিচারক।
রায় শুনে অ্যাডভোকেট শামছুল হুদা আবেগাপ্লুত হয়ে এ প্রতিবেদককে বলেন, এ রায় আমার পক্ষে নয়, ইউনিয়নবাসীর পক্ষে হয়েছে। কারণ তারা আমাকে ভোট দিয়ে ইউপি চেয়ারম্যান নির্বাচিত করছিলেন। কিন্তু কিছু অসাধু কর্মকর্তার যোগসাজশে ইউনিয়নবাসীর সেই রায় ছিনিয়ে নেয় আওয়ামীলীগ প্রার্থী। আজ আদালত থেকে ইউনিয়নবাসী তাদের কাঙ্খিত রায় ফিরে পেয়েছেন। এতে ইউনিয়নবাসী ও আমি খুব খুশি।
এ বিষয়ে মোবাইলে বড়বিল ইউনিয়নের ইউপি চেয়ারম্যান শহীদ চৌধুরী দ্বীপের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি সাংবাদিক পরিচয় পেয়ে ফোন কেটে দেন। পরে আর তিনি ফোন রিসিফ করেননি।
রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলার ৪নং গঙ্গাচড়া সদর ইউনিয়নের সেই নির্বাচনে প্রার্থী ছিলেন ৫ জন। ভোটের দিন গণনা শেষে রিটার্নিং অফিসার ১২৬ ভোটে বিজয়ী ঘোষণা করেন মাজহারুল ইসলাম লেবুকে। তিনি আওয়ামীলীগ মনোনীত প্রার্থী ছিলেন। তিনি ভোট পান ৮ হাজার ৮৯৯। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী মাহফুজার রহমান দুলু পান ৮ হাজার ৭৭৩ ভোট।
অনিয়ম, ভোট কারচুপির অভিযোগে তিনিও মামলা করেন। পরে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ মোতাবেক দীর্ঘ আইনি লড়াই শেষে চলতি মাসের ৪ এপ্রিল জেলা জজ, বিবাদী পক্ষের আইনজীবী ও নির্বাচন কমিশনের প্রতিনিধির উপস্থিতিতে পুনঃরায় ভোট গণনা করা হয়। গণনা শেষে নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী মাহফুজর রহমান দুলুকে ৩২৭ ভোটে বিজয়ী ঘোষণা করেন বিজ্ঞ নির্বাচনী ট্রাইব্যুনাল আদালত।
দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ে বিজয়ী মাহফুজার রহমান দুলু দেশ রূপান্তরকে জানান, লাঙ্গল প্রতীক নিয়ে আমি নির্বাচন করেছিলাম। ভোটের দিন রাতে হঠাৎ ফলাফল পরিবর্তন করে আমাকে পরাজিত করা হয়। এ ঘটনায় আমি মামলা করি। দীর্ঘ বিচার প্রক্রিয়া শেষে গঙ্গাচড়াবাসী জয় হয়েছে। তিনি এলাকার ভোটারসহ বার কাউন্সিলের আইনজীবী ও বিচারকদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন।
তবে রায় মেনে নিয়েছেন আদালতের রায়ে পরাজিত প্রার্থী মাজহারুল ইসলাম লেবু। তিনি সাংবাদিকদের জানন, গত প্রায় দুই বছর নিষ্ঠার সাথে দায়িত্ব পালন করেছি।
দুই জন প্রার্থী ও গঙ্গাচড়া ও বড়বিল ইউনিয়নের সাধারণ মানুষের সাথে কথা বলে জানা গেছে, অনেক দেরিতে হলেও বিজ্ঞ আদালতে রায়ে বিজয়ী হতে পারায় তারা অনেক উচ্ছ্বসিত। তারা ওই নির্বাচনে বিজয়ী প্রার্থীকে পরাজিত দেখানোর সাথে জড়িতদের শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।
সার্বিক বিষয়ে গঙ্গাচড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নাহিদ তামান্না দেশ রূপান্তরকে জানান, এখনও আদালতের রায়ে কপি আমি পাইনি। পেলে বিজ্ঞ আদালত ও নির্বাচন কমিশন যেভাবে নির্দেশনা দেয় সেইভাবে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিব। তবে ওই নির্বাচনে যাদের বিরুদ্ধে কারচুপির অভিযোগ আনা হচ্ছে সে প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ওই সময়েতো আমি ছিলাম না। আগামী নির্বাচনগুলোতে প্রিজাইডিং অফিসার ও সহকারী প্রিজাইডিংসহ যারা নির্বাচনী দায়িত্ব পালন করবেন তারা সঠিকভাবে ভোট গণনা ও ফলাফল ঘোষণা করেন সে বিষয়ে সতর্ক থাকব।
