বন্ডের বিপরীতে টাকা ছাড়লে মূল্যস্ফীতি বাড়ে না

আপডেট : ০৬ মে ২০২৪, ০১:২১ এএম

বিদ্যুৎ ও সারের বকেয়া পরিশোধে সরকার ২৬ হাজার কোটি টাকার বন্ড ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ইতিমধ্যে বিদ্যুতের বকেয়ার জন্য ১৭ হাজার ৫৯১ কোটি টাকার বন্ড ইস্যু করা হয়েছে। এই বন্ড বাণিজ্যিক ব্যাংক হয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকে যাচ্ছে। যেসব বন্ডের বিপরীতে বাজারে টাকা ছাড়ছে বাংলাদেশ ব্যাংক। যদিও বন্ডের মাধ্যমে বাজারে টাকা ছাড়লে মূল্যস্ফীতি বাড়বে না বলে মনে করেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আবদুর রউফ তালুকদার।

গতকাল রবিবার রাজধানীর প্যান-প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলে ‘পরিবর্তিত বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে উন্নয়নের পথ অনুসন্ধান’ শীর্ষক আন্তর্জাতিক সেমিনারে সাবেক অর্থ সচিব মুসলিম চৌধুরীর করা এক প্রশ্নের জবাবে গভর্নর এ কথা বলেন।

মুসলিম চৌধুরী বলেন, বর্তমানে দেশে সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি বাস্তবায়ন হচ্ছে। অথচ, সরকার বিদ্যুৎ ও সারের বকেয়া পরিশোধে প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকার বন্ড ইস্যু করেছে। সেসব বন্ড দিয়ে ব্যাংকগুলো এসএলআর সংরক্ষণ করছে। দেশের মানি মাল্টিপ্লেয়ার যদি বর্তমানে ৫ হয় তাহলে অর্থনীতিতে এটা ১ লাখ কোটি টাকার হিট করবে। বাড়বে মূল্যস্ফীতি। আর এতে মুদ্রানীতি ও রাজস্ব নীতি দুটোই ব্যর্থ হবে।

এর জবাবে গভর্নর আবদুর রউফ তালুকদার বলেন, আমরা সরকারকে ডিভল্বমেন্ট করে বা সরকারি বন্ড সরাসরি ক্রয় করে বাজারে টাকা ছাড়ছি না। ব্যাংকগুলো সরকারের বন্ড ক্রয় করে ওই বন্ডের বিপরীতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ধার নিচ্ছে। ব্যাংকগুলোর টাকার সংকট হওয়ায় আমরা তাদের ধার দিচ্ছি। সরকারের ইস্যু করা এসব বন্ডের বিপরীতে বাজারে টাকার সরবরাহ বাড়লেও মূল্যস্ফীতিতে তার প্রভাব পড়বে না। সুতরাং অর্থনীতিতে ১ লাখ কোটি টাকার হিট করার সুযোগ নেই।

এর আগে ২০২৩-২৪ অর্থবছরের বাজেট পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে টাকা ছাপিয়ে সরকারকে ঋণ দিতে মূল্যস্ফীতি বাড়বে না বলেও মন্তব্য করেছেন গভর্নর। সে সময় যুক্তি হিসেবে তিনি বলেছিলেন, সরকার ঋণ নিয়ে দেশের উন্নয়ন কাজে ব্যয় করে। সরকারি কর্মচারীদের বেতনভাতা দেয় না তাই তা মূল্যস্ফীতিতে প্রভাব ফেলবে না। যদিও ওই বক্তব্যের সঙ্গে বর্তমানে তিনি একমত নন।

তিনি বলেন, বর্তমান সুদহার নির্ধারণের ব্যবস্থাটি একটি অন্তর্বর্তীকালীন ব্যবস্থা। এক্ষেত্রে বাজারভিত্তিক সুদহার নির্ধারণে ব্যাংকের স্বাধীনতা থাকবে। বিনিময় হারের বিষয়ে গভর্নর বলেন, এক্ষেত্রে কিছুটা প্রতিকূলতা আছে। অন্তর্বর্তীকালীন ব্যবস্থা হিসেবে আমরা ক্রলিং পেগ পদ্ধতি চালু করতে যাচ্ছি। পরবর্তী সময়ে এটিও বাজারভিত্তিক করে দেওয়া হবে। মুদ্রানীতি প্রণয়ন কমিটিতে আগে অভ্যন্তরীণ কর্মকর্তারা থাকলেও বর্তমানে আমরা বাইরের বিশেষজ্ঞদেরও এখানে অন্তর্ভুক্ত করেছি।

এ সময় বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, বাংলাদেশের মুদ্রানীতির চেয়ে রাজস্ব নীতির ব্যাপকতা বেশি। মুদ্রানীতি আমাদের দেশে পরোক্ষভাবে কাজ করে। বাংলাদেশ ব্যাংক মূল্যস্ফীতি কমাতে সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি গ্রহণ করেছে। যদিও মূলস্ফীতিতে এখনো কাক্সিক্ষত কোনো অর্জন নেই। অথচ, এ কারণে বেসরকারি বিনিয়োগে বড় ধরনের ধস নেমেছে। যা প্রভাব ফেলছে কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে। সুতরাং বুঝতে হবে এই মুদ্রানীতিতে গলদ আছে।

তিনি বলেন, মুদ্রানীতি গ্রহণ করার ক্ষেত্রে পুরোপুরি সংকোচনমূলক বা পুরোপরি ছেড়ে দেওয়া যাবে না। এমনিতেই আমরা ৯/৬ সুদের হার করে দেশের অনেক ক্ষতি করেছি। এগুলো থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে। এনবিআর রাজস্ব নীতির মাধ্যমে রাজস্ব আদায় করবে। এটা তাদের কাজ। বাংলাদেশ ব্যাংককে গবেষণা করে মুদ্রানীতি দিতে হবে। স্নো, পাউডার আর বিলাসী পণ্যের আমদানিতে নিষেধাজ্ঞা দিয়ে ডলার মার্কেট বা মূল্যস্ফীতি কোনো কিছুই নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না। উল্টো এসব কারণে ছোট উদ্যোক্তারা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। যারা আমাদের অর্থনীতির সবচেয়ে বড় শক্তি। সুতরাং তাদের সুবিধা দিতে হবে।

সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, মূল্যস্ফীতি কমাতে কিছুটা সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি হতে পারে। তবে সবার আগে আমাদের ছোট উদ্যোক্তারা ঋণ পাচ্ছে কি না বা নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হচ্ছে কি না তার দিকে নজর দিতে হবে। ব্যাংকগুলো এমনিতেই ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের ঋণ দিতে চায় না। তার ওপরে সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি গ্রহণ করলে তো তারা আরও দেবে না। তারা অতি লাভ ও ঝুঁকিহীন সরকারি বন্ডে বিনিয়োগ করবে। সুতরাং ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের ঋণ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি নিশ্চিত করেই কিছুটা সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি গ্রহণ করা যেতে পারে। তবে এই সংকোচনের জন্য যদি কর্মসংস্থান কমে যায় তাহলে মানুষ না খেয়ে মারা যাবে। মনে রাখতে হবে, যখন আর্থিক মন্দা শুরু হয় তখন মন্দা আরও চড়াও হবে এমন কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করা যাবে না।

তিনি আরও বলেন, বর্তমানে আমাদের আর্থিক হিসাব নেতিবাচক। এর প্রধান কারণ হচ্ছে আমাদের দেশে বিদেশি বিনিয়োগ আসছে না। আর এটা আসবে কীভাবে? এদেশের প্রতিটি দরজা, প্রতিটি টেবিল ও প্রতিটি ব্যক্তিকে ঘুষ দিতে হয়। এজন্য দেশি উদ্যোক্তারাই তো দেশে বিনিয়োগ করতে চান না। তারা বিদেশি টাকা পাচার করতে মরিয়া। তাহলে বিদেশিরা কীভাবে আমাদের দেশে বিনিয়োগ করবেন। তাই আমাদের ওইসব দিকেও নজর দিতে হবে। আর রেমিট্যান্স যদি বাড়াতে হয় তাহলে হুন্ডি ও টাকা পাচার বন্ধের বিকল্প নেই বলেও মনে করেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাবেক এই গভর্নর।

সেমিনারে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আবদুর রউফ তালুকদার ছাড়াও উপস্থিত ছিলেন সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ, ড. আতিউর রহমান, ফজলে কবীর, অর্থ মন্ত্রণালয়ের সাবেক সচিব ড. এম তারেক এবং মোহাম্মদ মুসলিম চৌধুরী।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত