মঙ্গলবার, ১৮ জুন ২০২৪, ৪ আষাঢ় ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

পরিযায়ী পাখি দিবস আজ

বিপদগ্রস্ত পরিযায়ী পাখি

আপডেট : ১১ মে ২০২৪, ১২:৫৯ পিএম

বাংলাদেশের সৌন্দর্যের একটি বড় অংশ এ দেশের পাখিরা। ভৌগোলিকভাবে এ দেশ জীববৈচিত্র্য তথা বন্যপ্রাণীতে এতটাই সমৃদ্ধ, যা পৃথিবীর অন্য কোনো এলাকার থেকে অনেক বেশি।

দেশে যে পাখিগুলো আছে তার বড় একটি অংশ পরিযায়ী পাখি। এদের মধ্যে ২২৫ প্রজাতি শীতকালীন পরিযায়ী, ১২টি গ্রীষ্ম পরিযায়ী, ১৪টি পান্থ পরিযায়ী, ১২০টি ভবঘুরে এবং বাকিরা আবাসিক। আর এ শীতকালীন পরিযায়ী পাখিদের বড় একটি অংশ জলচর পরিযায়ী পাখি।

বাংলাদেশের গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র-মেঘনা অববাহিকার প্রধান নদীর চরগুলো শীতকালীন জলচর পরিযায়ী পাখিদের এক অনন্য আবাসস্থল। শীত এলেই বিভিন্ন প্রজাতির বুনোহাঁস আর সৈকত পাখিতে পরিপূর্ণ হয় এই এলাকাগুলো। ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর কনজারভেশন অ্যান্ড ন্যাচার (আইইউসিএন) বাংলাদেশের তথ্য অনুযায়ী, আমাদের ৩৮ প্রজাতির ঝুঁকিগ্রস্ত পাখিদের মধ্যে ২২ প্রজাতি, অর্থাৎ প্রায় ৬০ শতাংশ এই নদনদীকেন্দ্রিক। বিভিন্ন মানিকজোড়, বগা-বগলা, সৈকত পাখি, বুনোহাঁস আর বিভিন্ন প্রজাতির শিকারি পাখিতে সমৃদ্ধ থাকে সবসময় এই পাখিদের রাজ্য।

বৃহত্তর ফরিদপুর, যশোর, কুষ্টিয়া এবং খুলনা, বরিশাল ও রাজশাহী বিভাগের কিছু এলাকা নিয়ে পদ্মা অববাহিকাকে কেন্দ্র করে তৈরি হয়েছে গঙ্গা প্লাবনভূমি এলাকা। এখানে রয়েছে জলাভূমির বৈচিত্র্য। রয়েছে ২৬০টির বেশি প্রজাতির পাখি, যার মধ্যে ১১২ প্রজাতিই পরিযায়ী।

পাখিদের মধ্যে মানিকজোড়, বিভিন্ন প্রজাতির বুনোহাঁস, পরিযায়ী বুনোহাঁস, ডুবুরি, সৈকত পাখি, বগা-বগলা, বক, কাস্তেচরা, কোয়েল, বটেরা, ঈগল, শাহীন, টিয়া, পানকৌড়ি, সাপপাখি, মদনটাক, মাছরাঙা, হরিয়াল, কোকিল, পাপিয়া, ঘুঘুসহ বিভিন্ন প্রজাতির গায়ক পাখি উল্লেখযোগ্য। প্রতি বছর পাখিদের পরিযানের সময় বিপুলসংখ্যক পরিযায়ী পাখি এই এলাকার ওপর দিয়ে চলাচল করে। বাংলাদেশের মোট ঝুঁকিগ্রস্ত পাখির অর্ধেকের দেখা মেলে এ অঞ্চলে।

জলাশয়, হাওর ছাড়াও বাঁওড়ও পাখিদের অন্যতম আশ্রয়কেন্দ্র। দেশে ৫ হাজার ৪৮৮ হেক্টর এলাকা এই বাঁওড়ের অন্তর্ভুক্ত। তবুও বাঁওড়ের জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের বিষয়টি খুবই উপেক্ষিত। বাঁওড়গুলোতে টিকে আছে প্রায় ২০০ প্রজাতির পাখি, যার মধ্যে ৭০ প্রজাতি পরিযায়ী।

বাঁওড় শুষ্ক মৌসুমে অনেকটা শুকিয়ে যায়। বর্ষাকালে বিভিন্ন প্রজাতির শাপলাসহ নানা ধরনের ভাসমান উদ্ভিদে পরিপূর্ণ থাকে বাঁওড়। ভাসমান পাতার ফাঁকে জলময়ূর, জলপিপি, ডাহুক, কোড়ার ছোটাছুটি এক অদ্ভুত মনোরম দৃশ্য।

শীতে পানি কমে গেলে, জলজ উদ্ভিদগুলোর নিচে তৈরি হয় পাখিদের খাদ্যের এক অপূর্ব ভান্ডার। ঝাঁকে ঝাঁকে আসে পাখি। বাঁওড়ের পাখিদের মধ্যে অন্যতম হলো বিভিন্ন প্রজাতির দেশি ও পরিযায়ী বুনোহাঁস। সরালি, বালিহাঁসের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে বেশি। তবে শীতে যখন পাখি কমে যায়, তখন সরালি আর বালিহাঁস দুটোই বাড়ে। তখন আসে পরিযায়ী বুনোহাঁস যেমন; মৌলবি হাঁস, পিয়াং হাঁস, তিলি হাঁস, ভূতি হাঁসসহ আরও অনেক পাখি। বাঁওড়ের অন্যতম এক গুরুত্বপূর্ণ পাখি ডুবুরি। বড় পানকৌড়ি, ডাহুক, ঝিল্লি, গুড়গুড়িসহ বিভিন্ন পাখিদের জলজ উদ্ভিদের মধ্যে স্বতঃস্ফূর্ত বিচরণ দেখা যায় এ সময়। শিকারি পাখিদের মধ্যে হ্যারিয়ার ঈগল, বাজ, মধুবাজ, চিল, পেঁচাসহ আরও নানান প্রজাতির পাখির দেখা মেলে।

বৃহত্তর রাজশাহী, রংপুর ও দিনাজপুরে রয়েছে অসংখ্য বিল। এ বিলগুলো কেন্দ্র করে টিকে আছে অসংখ্য পাখি। যাদের মধ্যে রয়েছে আইইউসিএনের লাল তালিকায় (বিপদগ্রস্ত) থাকা পাখিদের একটি বড় অংশ। সাদা গলা মানিকজোড়, মদনটাক, কালো গলা মানিকজোড়, রাঙা মানিকজোড়, ছোট ধলাকপাল রাজহাঁস, বড় গুটি ঈগল, কালা মাথা কাস্তেচরা, বাংলা শকুন, দেশি গুটি ঈগল উল্লেখযোগ্য। বিভিন্ন প্রজাতির বুনোহাঁস, কাস্তেচরা, ডুবুরি, মানিকজোড়, সাপপাখি, পানকৌড়ি, লাল ঠেঙ্গি, বিভিন্ন প্রজাতির সৈকত পাখি এখানকার উল্লেখযোগ্য জলচর পাখি।

উত্তরের আন্তঃদেশীয় সীমানা এলাকার নদীগুলো পাখিদের জন্য এক অনন্য আবাসস্থল। মানুষের চলাচল কম থাকায় পাখিরা এ জায়গাগুলোকে নিজের নিরাপদ আবাসস্থল হিসেবে বেছে নিয়েছে। বড় নদীগুলো যেমন পদ্মা আর যমুনা এখানে তৈরি করেছে চরকেন্দ্রিক পাখিদের আবাসস্থল, ঠিক তেমনি তিস্তা, ডাহুক, পুনর্ভবা, মহানন্দার প্রবেশমুখও পাখিদের নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসেবে পরিচিত।

গ্রামাঞ্চল বাদেও, ঢাকা শহরে আছে প্রায় ২০০ প্রজাতির পাখি, যার প্রায় ৫০টিই পরিযায়ী। এর মধ্যে আছে জলচর পরিযায়ী পাখিও। কিন্তু বর্তমানে কংক্রিটের স্তূপের নিচে হারিয়ে যাচ্ছে এ পাখিরা। বর্তমানে সব থেকে ঝুঁকিতে রয়েছে জলচর পাখিরা। ঢাকা শহর একসময় জলাশয়ে পরিপূর্ণ ছিল আর এ জলাশয়গুলো ছিল সারস, বুনোহাঁস, জলজ পাখি, মানিকজোড়, শিকারি পাখিতে পরিপূর্ণ। কালের পরিক্রমায় সব থেকে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত জলজ পরিবেশ। এত কিছুর পরও কত প্রজাতির পাখি টিকে আছে জানলে কিছুটা হলেও অবাক হবেন। ঢাকা শহরে ১৬২ প্রজাতির পাখি টিকে আছে এখনো। বিভিন্ন তৃণভূমিতে দেখা মেলে ছয় প্রজাতির মুনিয়ার, যার মধ্যে লাল মুনিয়া অন্যতম। এ ছাড়া চার প্রজাতির টিয়া যার মধ্যে হীরামন টিয়া, মদনা টিয়া, চন্দনা টিয়া বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ঢাকার উদ্ভিদ উদ্যানে দেখা মেলে গোলাপি সাহেলী, সুইনহোস সাহেলী, কেশরী ফিঙ্গে, ছোট ভীমরাজের।

বছরে ৪০ প্রজাতির বেশি অতিথি পাখি আসে এ ঢাকা শহরে। এগুলোর মধ্যে আছে মাছমুরাল, বিভিন্ন প্রজাতির খঞ্জনা, জিরিয়া, বাটান, চ্যাগা, ছোট কান পেঁচাসহ বিভিন্ন প্রজাতির ফুটকি ও চুটকি জাতীয় পাখিরা। দেখা মেলে বিভিন্ন শিকারি পাখির। কিন্তু এরা হারাচ্ছে এদের আবাসস্থল, ক্রমেই নষ্ট হচ্ছে এদের প্রাকৃতিক পরিবেশ। ঢাকার বাইরেও শহরগুলোতে নগরায়ণ হচ্ছে। এর ফলে কিছু প্রজাতির পাখি যেমন ময়না, শালিক, চিলসহ আবর্জনাভুক কিছু পাখি জীবনধারণের সুযোগ-সুবিধা, খাদ্যের উৎসের প্রাচুর্যতা, কিংবা বিভিন্ন ধরনের ঝুঁকি থেকে মুক্ত থাকে, যার ফলে তাদের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে অনেক বেড়ে যায়। কিন্তু জলাশয়ের সংখ্যা হ্রাস পাওয়ায় জলাশয়কেন্দ্রিক পাখির পরিমাণ এখানে অত্যন্ত নাজুক।

অন্য শহরগুলোর আজ থেকে ১০ বছর পর যেন ঢাকার মতো অবস্থা না হয়, তা নিয়ে ভাবার সময় এসেছে। আর ঢাকার অন্তত যে জলাভূমিগুলো টিকে আছে সেগুলো সংরক্ষণে আরও গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ জরুরি।

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ক্রমাগত বাড়ছে বিভিন্ন ধরনের জলযান, বিশেষ করে ইঞ্জিনচালিত নৌকা, যা আমাদের নদীকেন্দ্রিক পাখিদের নির্বিঘ্ন বিচরণে অন্তরায়। আরেক বিপদ শিকারিরা। ফাঁদ পেতে স্থানীয় কিছু শিকারিও পাখি ধরে বিক্রি করে; জনসচেতনতার ঘাটতিই মূলত এসবের প্রধান কারণ। পর্যটনের ক্ষেত্রেও পরিবেশভিত্তিক জনসচেতনার প্রয়োজন রয়েছে। প্রকৃতি নোংরা করা, বন উজাড় করে পর্যটন স্থাপনা তৈরি; এসব আদতে আমাদের জন্যই ঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।

লেখক : বন্যপ্রাণী পরিবেশবিদ, সিইজিআইএস বাংলাদেশ

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত