মঙ্গলবার, ১৮ জুন ২০২৪, ৪ আষাঢ় ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

জিপিএর পূর্বযুগে ছিল বোর্ড স্ট্যান্ড

আপডেট : ১২ মে ২০২৪, ০৬:২৬ পিএম

এসএসসি পরীক্ষার ফল প্রকাশিত হয়েছে। সারাদেশে বিদ্যালয়গুলোতে জিপিএ ৫ পাওয়া শিক্ষার্থীদের আনন্দ উচ্ছ্বাস চলছে। বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থায় এটি সর্বোচ্চ ফল। এবছর সারা দেশ থেকে ১ লাখ ৮২ হাজার ১২৯ শিক্ষার্থী জিপিএ ৫ পেয়েছে। টেলিভিশন চ্যানেলগুলোতে নামী কলেজে শিক্ষার্থীর দলবদ্ধ আন্দন্দ প্রচার করছে। কারো কারো প্রতিক্রিয়া নিচ্ছে। আগামীকালের পত্রিকার পাতায় তাদের গ্রুপ ছবি প্রকাশ হবে। অনেকের লক্ষ্য উদ্দেশ্য পৃথকভাব প্রকাশিত হবে। বিশেষ করে যারা পারিবারিক টানাপোরণের মধ্য থেকে জিপিএ ৫ পেয়েছে তাদের গল্পগুলো প্রকাশিত হবে। এই বিপুল সংখ্যক বোর্ড সেরা জিপিএ ৫ পাওয়াদের মধ্যে হাতেগুনা কয়েকজনের কথাই আমরা জানবো। কিন্তু দেশে আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থায় জিপিএ পদ্ধতি চালু হবার আগে বোর্ড সেরা যারা হতেন তাদের চিহ্নিত করা হতো বোর্ড স্ট্যান্ড ছাত্র হিসেবে। প্রতি বোর্ড থেকে ২০ জন শিক্ষার্থী থাকতেন এই মেধা তালিকায়। তাদের ছবি প্রকাশ হতে পত্রিকার পাতায়। ফলে দেশ সেরা শিক্ষার্থীদের চিনে রাখতো সকলেই।

বোর্ড স্ট্যান্ড করা শিক্ষার্থীদের মর্যাদা ছিল অন্যরকম। শুধু স্কুলে না, সমাজেও তাকে সবাই আলাদাভাবেই দেখতো। একজন মেধাবী শিক্ষার্থী হিসেবে সমাজ ও পরিবারে তার আলাদা কদর ছিল। কলেজগুলো সেরা এসব ছাত্র-ছাত্রীকে পেতে মরিয়া হয়ে থাকতো। কেমন ছিল সেসব অনুভূতি। ১৯৯৩ সালে কুমিল্লা বোর্ড থেকে এসএসসিতে দ্বিতীয় হয়েছিলেন প্রফেসর মুহাম্মদ হাফিজ উদ্দিন ভূইয়া। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরের কুন্ডা উচ্চ বিদ্যালয় থেকে তিনি এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেন।


বোর্ড স্ট্যান্ড করা শিক্ষার্থীদের মর্যাদা ছিল অন্যরকম। শুধু স্কুলে না, সমাজেও তাকে সবাই আলাদাভাবেই দেখতো। একজন মেধাবী শিক্ষার্থী হিসেবে সমাজ ও পরিবারে তার আলাদা কদর ছিল। কলেজগুলো সেরা এসব ছাত্রছাত্রীকে পেতে মরিয়া হয়ে থাকতো।

কেমন ছিল সেসব অনুভূতি। ১৯৯৩ সালে কুমিল্লা বোর্ড থেকে এসএসসিতে দ্বিতীয় হয়েছিলেন প্রফেসর মুহাম্মদ হাফিজ উদ্দিন ভূঁইয়া। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরের কুন্ডা উচ্চ বিদ্যালয় থেকে তিনি এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেন। বোর্ড স্যান্ড করার অনুভূতি জানতে চাইলে তিনি বলেন, যেদিন ফল ঘোষণা হয়,  সেদিন আমি চট্টগ্রামে ছিলাম। সকাল ১০টায় ফল প্রকাশ হয়। দুপুর ১২টার রেডিও খবরে শুনছিলাম ফল ঘোষণার সংবাদ। প্রথমে ঢাকা বোর্ডে ২০ জন স্ট্যান্ড করাদের নাম ঘোষণা হল। পরে যখন কুমিল্লা বোর্ডের ফল ঘোষণা হচ্ছিল তখন প্রথম যে হয়েছে সে ক্যাডেট কলেজের ছাত্র। দ্বিতীয় নাম যখন ঘোষণা হচ্ছিল তখন শুনছিলাম ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরের নাম শুনলাম। আমার আগ্রহ বেড়ে গেল কে সে। তারপর শুনি আমার স্কুলের নাম। আমার বুকে দুক দুক করছিল। তার পর শুনি আমার নাম পড়ছে। সে যে কেমন অনুভূতি তা ভাষায় প্রকাশ করা যাবে না। এদিকে ফল ঘোষণার পর আমার স্কুলে এসে ভিড় করছিল আশে পাশের গ্রামে লোকজন। সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরে দেখি লোকজনে ঠাসা । সবাই এসে আমাকে ঘিরে ধরেছে। সবাই আন্দন্দ করছে। মিষ্টি ফুলে গোটা গ্রাম সয়লাব হয়ে গেল। সবাই আমাকে দেখতে আসছে। সবার মুখে মুখে আমার নাম। সে যে কি অনুভূতি ভাষায় প্রকাশ করা যাবে না।

তিনি বলেন, আমি এইচএসসিতেও দ্বিতীয় হয়েছিলাম। কিন্তু এসএসসিতে দ্বিতীয় হওয়ার অনুভূতি পাইনি। মনে হয়েছে এটাই তো হওয়ার কথা। সবচেয়ে ভালো লাগার বিষয় ছিল, রেজাল্টের পর দিন পত্রিকায় আমার ছবি ছাপা হয়েছে। পরে প্রধানমন্ত্রীর হাত থেকে সেরা ছাত্রের পুরস্কার নিয়েছি। সেটা অনেক অনেক ভালো লাগার বিষয়। প্রফেসর হাফিজ বলেন, এখন লাখের ওপর ছেলে মেয়েরা জিপিএ ৫ পায়, কিন্তু আমাদের সময় স্ট্যান্ড করার যে অনভূতি এরা তো পাবে না। কারণ আমাদের সময় একটি জেলা থেকে এক জন দুইজন স্ট্যান্ড করতো। তাদের সবাই চিনতো। নাম জানতো। এখন জিপিএ ৫ পাওয়াদের তো সেভাবে কেউ জানে না।

২০০১ সালে শিক্ষা ব্যবস্থায় জিপিএ পদ্ধতি প্রবর্তনের আগে মেধা বিভাজন হত ডিভিশনের মাধ্যমে। মোট ১০০০ নম্বরের মধ্যে ৪৫০ এর ওপর যারা পেতেন তারা দ্বিতীয় বিভাগ, ৬০০ নম্বরের বেশি যারা পেতেন তারা প্রথম বিভাগ পেতেন। এই প্রথম বিভাগের মধ্যে যারা ৭৫০ এর ওপর নম্বর পেতেন তাদের স্টার মার্কস প্রাপ্ত বলে চিহ্নিত করা হতো। ফল প্রকাশের পর রোল নম্বরের পাশে স্টার চিহ্ন থাকতো। এছাড়া বোর্ডের মধ্যে সর্বোচ্চ নম্বরধারী ২০ জনকে স্ট্যান্ড করা ছাত্র হিসেবে চিহ্নিত করা হতো। এরাই ছিল মেধাতালিকায় সেরা শিক্ষার্থী। বিজ্ঞান ও মানবিক বিভাগে বিভাজন ছিল এসএসসি পরীক্ষা। সাধারণত বিজ্ঞানের শিক্ষার্থীদের বেশিসংখ্যক প্রথম বিভাগ ও স্টার মার্কস পেত। মানবিক বিভাগে তুলনামূলক কম থাকতো। বোর্ড স্ট্যান্ড করার বাইরে যারা স্টার মার্কস পেতেন তাদেরও মেধাবী শিক্ষার্থী হিসেবে চিহ্নিত করা হতো স্কুলে বা সমাজে। কলেজে ভর্তিতেও এরা ভালো শিক্ষার্থী হিসেবে স্বীকৃতি পেত।

আগের শিক্ষা মূল্যায়ন পদ্ধতি নিয়ে মত-দ্বিমত রয়েছে। আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে মিল রেখে মূল্যায়ন পদ্ধতিতে জিপিএ পদ্ধতি এসেছে। এই পদ্ধতিতে ৮০ শতাংশ নম্বরের বেশি যারা পাচ্ছেন তারা এ-প্লাস প্রাপ্ত হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছেন। যেটা মেধাতালিকার সর্বোচ্চ ফল। আগে ৮০০ নম্বরের বেশি পেলেও সবাই বোর্ডের ২০ জনের তালিকায় আসতেন না। ফলে অনেকের মধ্যে হতাশাও কাজ করত। এখন এ-প্লাস পেলে সর্বোচ্চ ফল পাচ্ছে শিক্ষার্থীরা। আর এদের সংখ্যা সারাদেশে লাখ ছাড়িয়ে যাচ্ছে। তারপর বোর্ড স্ট্যান্ড হওয়ার যে উচ্ছ্বাস সেটা খুঁজে পাওয়া যায় না।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত