মঙ্গলবার, ২১ মে ২০২৪, ৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

বিবিধ প্রস্তুতি একই পরিণতি

আপডেট : ১৩ মে ২০২৪, ০৪:১৭ এএম

প্রস্তুতি বিবিধ রকমের হলেও ফলে খুব একটা পার্থক্য নেই, এই হচ্ছে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে বাংলাদেশের খেরোখাতা। সেনাবাহিনীর কমান্ডো প্রশিক্ষণ থেকে শুরু করে দেশের মাটিতে অস্ট্রেলিয়া এবং নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে সিরিজ, মধ্যপ্রাচ্যের আবহাওয়ার সঙ্গে মানিয়ে নিতে আগেভাগে ওমান যাওয়া কিংবা ঢাকা প্রিমিয়ার লিগকে ৫০ ওভারের ম্যাচ থেকে টি-টোয়েন্টিতে বদলে দেওয়া...তালিকায় আছে অনেক কিছু। তবে ঝাড়ফুঁকের মন্ত্রে যেমন রোগী বাঁচে না, তেমনি টি-টোয়েন্টির দক্ষতা বা মনোবল বাড়ানোর এসব টোটকা মোটেও কাজে দেয়নি। বাংলাদেশ আছে সেই তিমিরেই। বিশ্বকাপ খেলতে মার্কিন মুল্লুকে উড়ে যাওয়ার আগে সবশেষ ম্যাচে জিম্বাবুয়ের কাছে ৮ উইকেটের হার চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল বাংলাদেশ বৈশ্বিক আসরে যাওয়ার আগে, শক্তিশালী প্রতিপক্ষের বিপক্ষে মাঠে নামার আগে কতটা অপ্রস্তুত।

২০০৭ সালে বিশ্বকাপ শুরু হয় টি-টোয়েন্টি সংস্করণের। মূলত ২০০৭ ওয়ানডে বিশ্বকাপে বাংলাদেশ আর আয়ারল্যান্ডের অঘটনে আইসিসির বিপুল আর্থিক ক্ষতি পুষিয়ে নিতেই এই আয়োজন। মোহাম্মদ আশরাফুলের নেতৃত্বে দক্ষিণ আফ্রিকায় যাওয়ার আগে ক্রিকেটারদের সিলেটের স্কুল অব ইনফ্যান্ট্রি অ্যান্ড ট্যাকটিকসে দেওয়া হয়েছিল রোপ ক্লাইম্বিং, র‌্যাপলিংয়ের মতো সামরিক প্রশিক্ষণ। সেই আসরে ওয়েস্ট ইন্ডিজকে হারিয়ে চমক দেখিয়েছিল বাংলাদেশ। প্রায় একই দল নিয়েই ২০০৯ সালে ইংল্যান্ডে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের পরের আসর খেলতে যায় বাংলাদেশ। আসর শুরুর দিন দশেক আগেই ক্রিকেটাররা পৌঁছে যান ইংল্যান্ডে। নিজেদের ভেতর প্রস্তুতি ম্যাচও খেলেন। দলের সদস্য থাকা নাঈম ইসলাম স্মৃতি হাতড়ে বললেন, ‘ভালো প্রস্তুতি হয়েছিল, আমরা নিজেদের মধ্যে বেশ কয়েকটা সেশন করেছিলাম, একটু আগে আগে চলে গিয়েছিলাম ওখানে। কাউন্টি দলের বিপক্ষে প্রস্তুতি ম্যাচ খেলেছিলাম নাকি নিজেদের মধ্যে সেটা মনে নেই।’ এরপর মূল আসরের ফল ভারত এবং আয়ারল্যান্ডের কাছে হার!

২০১০ সালে ওয়েস্ট ইন্ডিজে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ নিয়ে বাড়তি কোনো প্রস্তুতি নেয়নি বাংলাদেশ, হয়তো ২০০৯ সালের ওয়েস্ট ইন্ডিজ সফরের সাফল্যই যথেষ্ট ভেবে! ফল দুই ম্যাচে পাকিস্তান এবং অস্ট্রেলিয়ার কাছে বড় ব্যবধানে হেরে গ্রুপ পর্ব থেকে বিদায়। 

পরের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ ২০১২ সালের সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে, শ্রীলঙ্কায়। ততদিনে দেশে ঘরোয়া টি-টোয়েন্টি টুর্নামেন্ট বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগ চালু হয়ে গেছে। শ্রীলঙ্কার সঙ্গে বাংলাদেশের আবহাওয়ার মিল খুঁজে পান যেখানে বেশিরভাগ ক্রিকেটার, সেখানে বাংলাদেশ দলকে প্রস্তুতি নিতে পাঠানো হয় ইউরোপে! স্কটল্যান্ড এবং নেদারল্যান্ডসের কাছে হেরে সেই প্রস্তুতি সম্পন্ন করে বাংলাদেশ, এরপর বিশ্বকাপে নিউজিল্যান্ড এবং পাকিস্তানের কাছে হেরে আবারও প্রথম রাউন্ড থেকেই বিদায়।

২০১৪ সালে নিজেদের মাটিতে বিশ্বকাপ, এবার সংস্করণে খানিকটা পরিবর্তন। গ্রুপ পর্বের নামে বাছাইপর্ব খেলতে হয় বাংলাদেশকে। বিশ্বকাপের আগে আগে শ্রীলঙ্কার সঙ্গে দুটো টি-টোয়েন্টি ম্যাচ খেলেছিল বাংলাদেশ আর চলে প্রস্তুতি। গ্রুপ পর্বে হংকংয়ের মতো অপেশাদার ক্রিকেটারদের নিয়ে গড়া দলের কাছে হার যদিও মূলপর্বে যাওয়া ঠেকাতে পারেনি, তবে সুপার এইটে এসে টানা ৪ হার বুঝিয়ে দেয় টি-টোয়েন্টিটা শিখতে বাকি বাংলাদেশের।

২০১৬’র টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে খেলতে যাওয়ার আগের রাতেই মিরপুরে এশিয়া কাপের ফাইনালে খেলল বাংলাদেশ। সেই আত্মবিশ্বাস নিয়ে ধর্মশালায় গিয়ে নেদারল্যান্ডস আর ওমানকে হারানো গেছে বটে, তবে সুপার এইটে উঠতেই সেই পুরাতন গল্প। বেঙ্গালুরুতে ৩ বলে ১ রান নিতে না পেরে ৩ উইকেট খুইয়ে ম্যাচ হারাটা তো ঢুকে গেছে ক্রিকেটের চিরায়ত বোকামির খাতায়। ৪ ম্যাচে ৪ হারে বিদায় প্রথম রাউন্ড থেকেই।

২০২১, মহামারী আক্রান্ত পৃথিবীতে বায়ো-বাবলের অন্দর মহলে ক্রিকেট। দেশের মাটিতে অস্ট্রেলিয়া এবং নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ৫ দুগুনে ১০টি টি-টোয়েন্টি খেলল বাংলাদেশ। কর্তাদের চোখে মিরপুরের কাদামাখা উইকেটে ন্যক্কারজনক টি-টোয়েন্টিতে অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডকে হারানোর কৃতিত্বটা জয়ের ধারা; গণমাধ্যমের কাছে ফাঁপা আত্মবিশ্বাস। এরপর গ্রুপ পর্বের শুরুটা স্কটল্যান্ডের কাছে হার দিয়ে! ওমান এবং পাপুয়া নিউগিনিকে হারিয়ে মূলপর্বে উত্তরণ হলেও সেখানে আর জয়ের দেখা মেলেনি বরং জোটে ৮৪ এবং ৭৩ রানের লজ্জা।

২০২২ অস্ট্রেলিয়া বিশ্বকাপের আগে এশিয়া কাপে শ্রীলঙ্কা ও আফগানিস্তানের কাছে হেরে সুপার ফোর পর্বে উঠতে না পারা থেকেই বাংলাদেশের বিশ্বকাপ ভবিষ্যৎটা আন্দাজ করে নেওয়া যায়। তবে এরপর বাংলাদেশ আমিরাতের সঙ্গে ৩ ম্যাচের সিরিজ জিতে ‘আত্মবিশ্বাস’ বাড়িয়ে নেয়। যদিও নিউজিল্যান্ডে গিয়ে পাকিস্তানকে সঙ্গী করে আয়োজিত ত্রিদেশীয় সিরিজের চার ম্যাচেই হারে বাংলাদেশ। সরাসরি সুপার টেনে খেলা বাংলাদেশ হারায় জিম্বাবুয়ে ও নেদারল্যান্ডসকে। হারে বাকি ৪ ম্যাচে। তবুও কাগজে কলমে সবশেষ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপই বাংলাদেশের সফলতম কারণ মূলপর্বে দুটো ম্যাচ জয়!

কেন নানাবিধ প্রস্তুতির পরও এই একই বৃত্তে আটকে যাওয়া? প্রশ্ন রাখা হয়েছিল বিপিএল ফ্র্যাঞ্চাইজি রংপুর রাইডার্সের কোচ সোহেল ইসলামের কাছে। দেশ রূপান্তরকে তিনি জানালেন, ‘অস্ট্রেলিয়া ওয়ানডেতে কত করে? ৩০০ থেকে ৩৫০, টেস্টে একদিনে ৪০০ রানও করে, টি-টোয়েন্টিতে ২০০ রান করে। আসলে রান করার অভ্যাসটা গড়ে ওঠে ব্যাটসম্যানের খেলার ধরনের ওপর। ছোটবেলা থেকেই ট্রু বাউন্সে ভালো উইকেটে ব্যাট করে আসে বলেই তাদের রান করার সক্ষমতা তৈরি হয়। ঘরোয়া ক্রিকেটে ব্যাটসম্যান বা বোলারদের উন্নতি নির্ভর করবে উইকেট কেমন আচরণ করে তার ওপর। একটু নিচের সারির লিগে গিয়ে দেখেন, ব্যাটসম্যানরা বল মারতেই পারবে না কারণ উইকেট অপ্রস্তুত। হঠাৎ করে গিয়ে অস্ট্রেলিয়াতে গিয়ে কেউ মারতে পারবে না। উইকেটের চরিত্র হচ্ছে আমাদের সবচেয়ে বড় অন্তরায়। উইকেট ভালো করে দিতে হবে, সব স্তরে। তাহলে বড় রান করার অভ্যাস তৈরি হবে। এটা একদিনে বা অল্প সময়ের কোচিংয়ে হয় না। ২০০৭ এবং ২০২৪ এর মধ্যে উইকেটের কোনো পার্থক্য আমি তো দেখি না। আমি যখন ৯৫-৯৬ সালে খেলতাম তখনো যেমন আড়াইশ রান হতো এক ম্যাচে (৫০ ওভার) এখনো সেই ২৫০ রানই হয়। সেজন্যই খেলার প্যাটার্নও বদল হয়নি। এই শট খেলতে না পারার প্রভাবটা সবচেয়ে বেশি এসে পড়ে টি-টোয়েন্টিতে যেটা চোখে পড়ে।’

এবারের প্রস্তুতি কেমন হলো সেটা জানতে সাবেক অধিনায়ক রাজিন সালেহকে প্রশ্ন করা হলে ঢাকা প্রিমিয়ার লিগে অপরাজিত চ্যাম্পিয়ন আবাহনীর ব্যাটিং কোচ রাজিন সালেহ বলেন, ‘প্রস্তুতি নিয়ে আমি সন্তুষ্ট নই, জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে আমরা সিরিজ জিতলেও ভালো ক্রিকেট খেলিনি। আমাদের ব্যাটসম্যানদের কাছ থেকে বড় রান, ভালো ইনিংস, বিশেষ করে টপ অর্ডারে ভালো ইনিংস দেখিনি। জিম্বাবুয়ের চেয়ে শক্তিশালী প্রতিপক্ষের বিপক্ষে খেলতে পারলে ভালো হতো, যদিও সামনে সেই সুযোগও নেই। আমার কাছে মনে হয় শতভাগ প্রস্তুতি হয়নি।’

বিগত টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপগুলোর আগে নানান রকমের প্রস্তুতি নিলেও ফল কমবেশি একই রকম। বড় দলগুলোর কাছে হার। এবারে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষেই ‘ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি অবস্থা’ বাংলাদেশ দলের। মার্কিন মুল্লুুকের বিশ্বকাপে শ্রীলঙ্কা বা দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে বাংলাদেশকে জয়ী দল হিসেবে কল্পনাও করা যাচ্ছে না। এমনকি নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষেও অঘটনের আশঙ্কা কম নয়। প্রস্তুতির প্রতিপক্ষ, কোচ, স্বাগতিক দেশ... সব কিছুই বদলায়, কেবল বদলায় না যেন বাংলাদেশের ভাগ্য।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত