মঙ্গলবার, ২১ মে ২০২৪, ৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

জাতীয় পর্যায়ে ‘স্বপ্নজয়ী মা’ হলেন জামালপুরের অবিরণ নেছা

আপডেট : ১৩ মে ২০২৪, ০৭:১৮ পিএম

জাতীয় পর্যায়ে ‘স্বপ্নজয়ী মা’ হলেন জামালপুর জেলার দেওয়ানগঞ্জ উপজেলার ডাংধরা ইউনিয়নের সোনাকুড়া গ্রামের মোছা. অবিরণ নেছা। প্রত্যন্ত অঞ্চলে অল্প বয়সে বিয়ে হওয়া অবিরনের ছয় সন্তানের চারজনই দেশের নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখাপড়া শেষে সরকারের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে কর্মরত আছেন। 

তার এক ছেলে ড. মো. রফিকুল ইসলাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়ালেখা শেষ করে জাপান থেকে পিএইচডি ডিগ্রি লাভ অর্জন করেন। বর্তমানে নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ফলিত রসায়ন ও কেমিকৌশল বিভাগে সহযোগী অধ্যাপক। আরেক ছেলে মো. রেজাউল করিম বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের মৎস্য বিজ্ঞান অনুষদ থেকে অনার্স-মাস্টার্স শেষে ৩১ তম বিসিএস প্রশাসন ক্যাডারে যোগদান করেন। বর্তমানে তিনি অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক হিসেবে রংপুরে কর্মরত আছেন। 

ছোট ছেলে ডা. এস. এম. আরিফুল ইসলাম ঢাকার শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস ডিগ্রি শেষে ৪০ তম বিসিএস স্বাস্থ্য ক্যাডারে যোগদান করে বর্তমানে নিজ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে মেডিকেল অফিসার হিসেবে আছেন। ছোট মেয়ে নুরুন্নাহার নুরী নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগ থেকে লেখাপড়া শেষে বর্তমানে উপজেলার সোনাকুড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষিকা হিসেবে কর্মরত আছেন। আর দুই সন্তানের একজন ব্যবসায়ী ও বড় মেয়ে গৃহিণী। এ বছরের ‘বিশ্ব মা দিবস-২০২৪ ’এ স্বপ্নজয়ী এই মাকে জাতীয় পর্যায়ে সম্মাননা দেয় মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়।
 
সোমবার বিকেলে রাজধানীর ইস্কাটন গার্ডেনে মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের সম্মেলন কক্ষে ‘বিশ্ব মা দিবস-২০২৪’ উদ্‌যাপন অনুষ্ঠানে এই স্বপ্নজয়ী মায়ের হাতে বিশেষ সম্মাননা স্মারক, সনদ, ২০ হাজার টাকার প্রাইজবন্ড এবং উত্তরীয় পরিয়ে দেন মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী সিমিন হোসেন (রিমি) এমপি। অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন মন্ত্রণালয়ের সচিব নাজমা মোবারেক। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (ডিজি) কেয়া খান। 

অনুষ্ঠানে জানানো হয়-প্রত্যন্ত গ্রামে নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারে বেড়ে ওঠা সংগ্রামী অবিরণ নেছার স্কুলে পড়ার সৌভাগ্য হয়নি। অল্প বয়সেই তার বিয়ে হয় মো. আলমাস হোসেনের সঙ্গে, যিনি কৃষি কাজের পাশাপাশি ছোট ব্যবসা করতেন। দারিদ্র্যের মধ্য দিয়ে ছয় (০৬) সন্তানকে নিয়ে চলে তাদের অভাবের সংসার। তিনি বাড়িতে ফলের গাছ ও সবজি চাষের পাশাপাশি হাঁস-মুরগি, গরু, ছাগল-ভেড়া পালন করে স্বামীর অভাবের সংসারে হাল ধরেন। 

নিজে পড়াশোনা না করতে পারলেও সন্তানদের পড়াশোনার বিষয়ে তিনি ছিলেন অত্যন্ত আগ্রহী। তিনি স্বপ্ন দেখতেন সন্তানেরা পড়াশোনা শেষ করে একদিন বড় অফিসার হবে। একটা সময় গিয়ে সন্তানদের পড়াশোনার খরচ জোগান দেওয়া তাদের জন্য কষ্টসাধ্য হয়ে উঠলেও তিনি ভেঙে পড়েননি। শত কষ্টের মাঝে সন্তানদের পড়াশোনার খরচ চালিয়ে যান। 

এ নিয়ে পাড়া-প্রতিবেশী, আত্মীয়-স্বজনসহ অনেকে বিরূপ মন্তব্য করলেও তিনি তার লক্ষ্য থেকে বিন্দুমাত্র পিছপা হননি। ধৈর্য ধরে আল্লাহর কাছে সাহায্য চাইতেন। যাতে করে শত কষ্টের মাঝেও তিনি তার সন্তানদের পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারেন। 

স্বপ্নজয়ী মা অবিরণ নেছা  জানান, সন্তানদের শিক্ষা দেওয়া ছিল আমার জীবনের সর্বোচ্চ আন্তরিক প্রচেষ্টা। যে কারণে সন্তানদের সুশিক্ষিত ও আলোকিত মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে পেরেছি। সন্তানেরা এখন সমাজে সুপ্রতিষ্ঠিত ও মানুষের কল্যাণে নিবেদিত। আসলে এই ধরনের রাষ্ট্রীয় পুরস্কারে ভূষিত হবো কখনো ভাবিনি। 

তিনি আরও বলেন, আমি আমার সন্তানদের মানুষের মতো মানুষ করার চেষ্টা করেছি মাত্র, ফলাফল হিসেবে পেয়েছি সন্তানের সফলতা। আজ তার স্বীকৃতি স্বরুপ ‘স্বপ্নজয়ী মা’ সম্মাননা পেয়ে আমার অনেক ভালো লাগছে। 

তার ছেলে রংপুরের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক(এডিসি) রেজাউল করিম জানান, এর আগেও তার মা জীবনসংগ্রামের স্বীকৃতিস্বরূপ মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের ‘জয়িতা অন্বেষণ কার্যক্রম’ এর আওতায় ২০২২ সালে ‘সফল জননী’ ক্যাটাগরিতে উপজেলা ও জেলা পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ জয়িতা নির্বাচিত হয়ে বিভাগীয় পর্যায়ে মনোনীত হয়েছেন এবং পাবলিক ইউনিভার্সিটি স্টুডেন্ট অ্যাসোসিয়েশন অব ডাংধরা কর্তৃক ‘রত্নগর্ভা মা’ সম্মাননা স্মারকে ভূষিত হয়েছেন। তিনি আমাদের সমাজে সবার জন্য অনুকরণীয় একজন স্বপ্নজয়ী মা

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত