লোকসভায় জয়-পরাজয়ের টানাপড়েন

আপডেট : ১৫ মে ২০২৪, ১২:৩০ এএম

ভারতের লোকসভা নির্বাচনই দেশটির কেন্দ্রীয় শাসন ক্ষমতা নির্ধারণ করে। তাই এই নির্বাচন সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ। যে দল বা জোট এই নির্বাচনে সংখ্যাধিক আসন পাবে তারাই ভারতের এককেন্দ্রিক শাসনের ক্ষমতা লাভ করবে। বর্তমান শাসক দল বিজেপি নির্বাচনে জয়ী হতে মরিয়া হয়ে উঠেছে। নানা ছক-কৌশল প্রয়োগ করে ছলে, বলে এবং কৌশলে ক্ষমতায় টিকে থাকতে হেন কোনো গর্হিত কাজ অবশিষ্ট রাখেনি। প্রথম দফা নির্বাচনে বিভিন্ন জরিপের খবর প্রকাশ পেয়েছে, তাতে ইন্ডিয়া জোট এগিয়ে আছে এই সংবাদের পর ক্ষমতাসীনরা দিশেহারা হয়ে সর্বপ্রথম আক্রমণ করেছে মুসলিম সম্প্রদায়কে। কেননা বিজেপি জানে তাদের পক্ষে মুসলিমরা ভোট দেবে না। তাই মুসলমানদের বিরুদ্ধে অসাংবিধানিক ঘৃণা, বিদ্বেষ প্রকাশে দেশটির প্রধানমন্ত্রী পর্যন্ত কা-জ্ঞান হারিয়ে বসেছেন।

বিজেপির ভোটের প্রধান উৎস ভারতের সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দু ভোটাররা। হিন্দু ভোট বিভক্তির আশঙ্কায় ইন্ডিয়া জোটকে দুর্বল করার নানা উদ্যোগ গ্রহণ করে কিছুটা সফলতা পেয়েছে বিজেপি। যেমন বিহারের নীতিশ কুমার ইন্ডিয়া জোটের প্রথম সারির একজন ছিলেন। তাকে যে কোনো উপায়ে ইন্ডিয়া জোট থেকে বের করে বিজেপি জোটে শামিল করেছে। পশ্চিম বাংলার মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ইন্ডিয়া জোটে ছিলেন। কিন্তু তার দলের পাহাড়সম অনিয়ম-দুর্নীতির ট্রাম্প কার্ড দেখিয়ে তাকে ইন্ডিয়া জোট থেকে বের করতে পেরেছেন। অবশ্য মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক উত্থানে আরএসএস প্রত্যক্ষ সহায়তা করেছিল। এমন কি তিনি বিজেপি সরকারের জোট সঙ্গী হয়ে কেন্দ্রীয় রেলমন্ত্রীও হয়েছিলেন। তৃণমূল কংগ্রেসের নির্বাচন কমিশনে তালিকাভুক্তিতে তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আদভানি সুপারিশ পর্যন্ত করেছিলেন। গুজরাট দাঙ্গায় অভিযুক্ত গুজরাটের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বিরুদ্ধে বিরোধীরা ঐক্যবদ্ধ প্রতিবাদ করলেও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তখন নীরব থেকেছেন। বিজেপির সঙ্গে মমতার সখ্য নতুন নয়। পশ্চিম বাংলা থেকে বামফ্রন্ট সরকারের পতনে মমতার তৃণমূল কংগ্রেস, আরএসএস এবং বিজেপি ঐক্যবদ্ধ হয়েছিলেন বহু পূর্ব থেকেই। সাম্প্রতিক সময়ে নন্দীগ্রামে পুলিশের ছদ্মবেশে তৃণমূলের ক্যাডার বাহিনীর হত্যাকা-ের সংবাদ ফাঁস হয়েছে। নন্দীগ্রাম ইস্যু নিয়ে ঘোলা জলে মৎস্য শিকার করেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের উত্থান। আর এতে যেমন আরএসএস, বিজেপির প্রত্যক্ষ ভূমিকা ছিল, তেমনি পশ্চিম বাংলার কতিপয় বামবিরোধী লেখক, সাহিত্যিক, গায়ক, অভিনেতা, অভিনেত্রীরা সদলবলে মমতার পাশে দাঁড়িয়ে সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করে বামদের পরাজয়ে ভূমিকা পালন করেছিলেন।

আমি গায়ক প্রতুল মুখোপাধ্যায়ের গান শুনতে নেতাজী ইনডোর স্টেডিয়ামে গিয়েছিলাম। প্রতুল বাবু গানের পূর্বে বলেছিলেন, ‘আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ অর্জন হচ্ছে পশ্চিম বাংলা থেকে বামফ্রন্ট সরকারকে বিদায় করতে পারা।’ সাহিত্যিক মহাশ্বেতা দেবীও প্রায় একই রকম উক্তি করেছিলেন। গায়ক সুমন, অভিনেত্রী অপর্ণা সেনরা নন্দীগ্রামের হত্যাকান্ডের অভিযোগ তুলে সারা রাজ্য মাতিয়ে তুলেছিলেন। সাম্প্রতিক নন্দীগ্রামের হত্যকান্ডের খবর ফাঁস করে দিয়েছে তৃণমূলের সংগঠক যিনি বিজেপিতে যোগ দিয়ে বিধানসভার সদস্য হয়েছেন। প্রকৃত ঘটনা ফাঁসের বোমা ফাটিয়ে তৃণমূলের তথাকথিত শিল্পী-সাহিত্যিকদের মুখে চুন কালি এঁটে দিয়েছেন। যারা নন্দীগ্রাম ইস্যু নিয়ে পথে নেমে তৃণমূলের পক্ষে জনমত গড়ে তুলেছিলেন, তারা এখন অনেকটা আত্মগোপনে চলে গেছেন। পশ্চিম বাংলায় এবার বাম-কংগ্রেস জোট শূন্য না থেকে কিছু আসন পাবার সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে।

ভারতীয় পুঁজিপতিরা দেশটির ক্ষমতায় কোন দল আসবে সেটা নির্ধারণে এ যাবৎ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে এসেছে। মোদি সরকার নির্বাচনী ফান্ড সংগ্রহের মাধ্যমে আইন-কানুনের তোয়াক্কা না করে দেদার অর্থ করপোরেটদের থেকে আদায় করেছে। ওই টাকা দিয়ে দল ভাঙছে, দল ও নেতা কিনছে গণতন্ত্রের বারোটা ইতিমধ্যে বাজিয়ে দিয়েছে। তেলেঙ্গানায় এক নির্বাচনী সমাবেশে মোদি বলেছেন, বছরের পর বছর ধরে কংগ্রেস আদানি, আম্বানিদের বিরুদ্ধে নানা অপকীর্তির কথা বললেও সাম্প্রতিক সময়ে কিছু বলছে না। তবে কি তাদের মধ্যে প্রীতির সম্পর্ক সৃষ্টি হয়েছে! জবাবে রাহুল গান্ধী বলেছেন, মোদির কথায় প্রমাণ করে আমাদের অভিযোগ মিথ্যা ছিল না। ওই সব পুঁজিপতিদের অর্থ নিয়ে রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান তাদের হাতে তুলে দিয়েছে। আদানি, আম্বানিদের থেকে কত টাকা মোদি সরকার নিয়েছে তার সমস্ত টাকা দেশের জনগণের কাছে তবে ফেরত দিক। আমরা এ বিষয়ে জোর তদন্তের দাবি করছি। এটা অসত্য নয়, ভারতের রেল পরিষেবা কৃষকদের উৎপাদিত পণ্য করপোরেটদের কাছে বিক্রিতে বাধ্য করে ওই সব কৃষিপণ্য মজুদ করার অজস্র স্থাপনা তারা গড়ে তুলেছিল। এর বিরুদ্ধে কৃষকরা বৃহত্তর আন্দোলন গড়ে তুলেছিল। ফলে সরকার করপোরেটদের কৃষিপণ্যের মুনাফা নিশ্চিতকরণের পথ থেকে সরে আসতে বাধ্য হয়। পুনার রেল স্টেশনের প্ল্যাটফরম টিকিটের মূল্য ছিল মাত্র পাঁচ টাকা। মোদি সরকার স্টেশনটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের হাতে তুলে দেওয়ার ফলে প্ল্যাটফরমের টিকিটের মূল্য এখন পঞ্চাশ টাকা। জনগণের পকেট কেটে করপোরেটদের নানা প্রকার সুযোগ-সুবিধার বিনিময়ে করপোরেটদের থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা নির্বাচনী বন্ডের মাধ্যমে আদায় করে ভোটের বৈতরণী পার হতে অকাতরে টাকা ঢালছে। সিপিএম ও কংগ্রেস জোটের একমাত্র বিধানসভার সদস্য নওশাদ সিদ্দিকী। তাকে পর্যন্ত জোট ত্যাগ করিয়ে পৃথক নির্বাচনে অংশ নিয়ে মুসলিম ভোটের ভাগাভাগিতে যুক্ত করেছে বিজেপি।

আমাদের পার্শ্ববর্তী ত্রিপুরা রাজ্যে মাত্র দুটি লোকসভা আসন। সেখানে ইতিমধ্যে নির্বাচন নামক তামাশা সম্পন্ন হয়েছে। ভোটারদের ভোটকেন্দ্রে যেতে দেওয়া হয়নি। একতরফা ছাপ্পা ভোট মেরে জয় প্রায় নিশ্চিত করেছে। এমনকি তিন-চারটি ভোটকেন্দ্রে ১০৪% ভোট পড়েছে তেমন সংবাদ আগরতলার পত্রিকা প্রমাণসহ ছেপেছে। প্রতিপক্ষ কংগ্রেস-বামফ্রন্ট পুলিং এজেন্টদের কেন্দ্র থেকে জোরপূর্বক গলা ধাক্কা দিয়ে বের করে দেওয়া হয়েছে। একজন পোলিং অফিসার প্রতিবাদ করলে তাকে কেন্দ্রের বাইরে নিয়ে বেধড়ক পিটিয়েছে বিজেপির কর্মীরা।

ভারতকে বিশ্বের বৃহত্তর গণতান্ত্রিক দেশ হিসেবে গণ্য করা হয়। বাস্তবতা হচ্ছে, কেমন গণতন্ত্র সেটা গণমাধ্যমের কল্যাণে ক্রমাগত প্রকাশ হয়ে পড়েছে। নিরঙ্কুশ ক্ষমতা লাভের পর এবং পরপর নির্বাচিত হয়ে বিজেপি চরম ফ্যাসিবাদী হিসেবে নিজেদের প্রমাণ দিয়ে এসেছে। সংসদে বিরোধীদের স্বল্প উপস্থিতিতে ইচ্ছামতো বিভিন্ন কালা-কানুন পাস করিয়ে গণতান্ত্রিক ভারতকে হিন্দুত্ববাদী রাজতান্ত্রিক শাসনাধীনের পথে ঠেলে দিয়েছে। মুক্তবুদ্ধির চর্চার ওপর বিধিনিষেধ জারি করে গণমাধ্যমের এবং লেখকদের কণ্ঠরোধ করা হয়েছে। দেশটির স্বাধীন প্রতিষ্ঠানগুলো পর্যন্ত সরকারের হুকুমের দাসে পরিণত। বাবরি মসজিদ মামলার রায় প্রদানে মুখ্য ভূমিকা পালনকারী ভারতের সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি রঞ্জন গগৈ অবসর গ্রহণের পরপরই বিজেপি দলীয় বিধান সভার সদস্য হয়েছেন। স্বাধীন নির্বাচন কমিশন পর্যন্ত মোদি সরকারের আজ্ঞাবহ প্রতিষ্ঠানে পরিণত। সিবিএ, ইডি সরকারের ইচ্ছানুযায়ী চালিত। জনগণের আস্থা ভরসা অবশিষ্ট নেই আজ্ঞাবহ ভারতীয় নির্বাচন কমিশনের ওপরও। এ ছাড়া বেসামরিক আমলাতন্ত্র এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনী একদলীয় শাসনের বৃত্তে আটকে পড়েছে।

খাদ্য, পণ্যসহ জ্বালানির মূল্য ক্রমাগত বৃদ্ধির ফলে জনগণের ত্রাহি অবস্থা। পাশাপাশি সরকার ট্যাক্সের ক্ষেত্র ক্রমাগত সম্প্রসারণ করে জনগণের অধিক কষ্টে উপার্জিত অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছে। ভারতের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ কোনো ক্ষেত্রেই ভালো নেই। হিন্দু জাগরণে তাদের ভোট প্রাপ্তির হিসেবে তাই এবার গরমিল দেখিয়ে মোদি সরকার হেন কোনো অপকীর্তি বাদ রাখেনি, ক্ষমতাকে ধরে রাখার জন্য। অবস্থাদৃষ্টে মোদি সরকারের পতনের আভাস-ইঙ্গিত তাই লোকের মুখে মুখে এবং নির্বাচনী পর্যবেক্ষকরাও তেমন ইঙ্গিত দিয়েছে। মোদি সরকার ক্ষমতা ধরে রাখতে রামমন্দির তড়িঘড়ি উদ্বোধন করেছে বটে। কিন্তু এতে তেমন সাড়া জাগাতে পারেনি। অন্যান্য বারের মতো এবারও জনগণকে ঢালাওভাবে নানা প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে বটে, তবে অতীতের প্রতিশ্রুতির কোনোটির বাস্তবায়ন না-করার ফলে মানুষ আর মোদি ও অমিত শাহর প্রতিশ্রুতির প্রতি আস্থা রাখছে না। নির্বাচনে রাষ্ট্রযন্ত্রকে ঢালাও ব্যবহার করে জয়ী হয়ে বিজেপি যদি ফের সরকার গঠন করে তবে সেটা হাড্ডাহাড্ডি প্রতিযোগিতায় অতি সামান্য সংখ্যাগরিষ্ঠতায় কিংবা আঞ্চলিক দলকে খরিদ করেই সম্ভব হতে পারে। তাই এবারের লোকসভা নির্বাচনে মোদি সরকার জিতবে, না ভারতের জনগণ জিতবে এই প্রশ্নটি সামনে চলে এসেছে। এ জন্য আমাদের অপেক্ষা করতে হবে আগামী ৩ জুন পর্যন্ত।

লেখক: নির্বাহী সম্পাদক, নতুন দিগন্ত

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত