শুক্রবার, ৩১ মে ২০২৪, ১৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

পেনশন স্কিম সর্বজনীন হোক

আপডেট : ১৬ মে ২০২৪, ১২:৩৩ এএম

এখন যেমন বিসিএস মানেই সোনার হরিণ, এক সময় তেমনটা ছিল না। তবে সরকারি চাকরির একটা আলাদা কদর সবসময়ই ছিল। সরকারি চাকরি পাওয়া যেমন কঠিন, হারানোও কঠিন। একবার সরকারি চাকরি হয়ে যাওয়া মানে আজীবন নিশ্চিন্ত। নিয়মিত বেতন পাওয়া যাবে, বছর বছর ইনক্রিমেন্ট হবে, বেতন বাড়বে, মহার্ঘ্য ভাতা মিলবে, টিএ/ডিএ পাওয়া যাবে, কোয়ার্টার পাওয়া যাবে, রেশন মিলবে, বড় পদে গেলে গাড়ি মিলবে, নির্ধারিত ছুটি পাওয়া যাবে; তারচেয়ে বড় কথা হলো চাকরি জীবন শেষে প্রভিডেন্ট ফান্ড, গ্র্যাচুইটির মোটা অঙ্কের টাকা তো পাওয়া যাবেই। আরও পাওয়া যাবে আজীবন পেনশন সুবিধা। বেসরকারি চাকরিতে তুলনামূলকভাবে বেতন বেশি ছিল। কিন্তু চাকরির কোনো নিশ্চয়তা নেই। বসের মেজাজ খারাপ থাকলে ঝাড়ি খেতে হবে, বস পছন্দ না করলে ইনক্রিমেন্ট কম হবে, এমনকি চাকরিও চলে যেতে পারে। বেসরকারি কোনো প্রতিষ্ঠানেই পেনশনের কোনো ব্যবস্থা নেই। কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানে গ্র্যাচুইটি, প্রভিডেন্ট ফান্ড

থাকলেও অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানে তাও নেই। অধিকাংশ বেসরকারি চাকরিজীবীকে অবসরে যেতে হয় একেবারে শূন্য হাতে। তবুও অনেকে সারাজীবনের নিশ্চিন্তের সরকারি চাকরির চেয়ে তাৎক্ষণিক বাড়তি বেতনের বেসরকারি বা করপোরেট চাকরিই পছন্দ করতেন। কিন্তু দফায় দফায় বাড়তে বাড়তে সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বেসরকারি চাকরিজীবীদের বেতন ছুঁয়ে ফেলে, কোনো কোনো ক্ষেত্রে ছাড়িয়েও যায়। এখন অবস্থা এমন, সরকারি চাকরিজীবীদের বেতনও বেশি, সুযোগ-সুবিধাও বেশি, আজীবন পেনশনের সুবিধাও আছে।

মাত্র ১৬ লাখ সরকারি চাকরিজীবীর জীবন নিশ্চিন্ত, নির্ভার হলেও কোটি কোটি বেসরকারি চাকরিজীবী ও অপ্রাতিষ্ঠানিক পেশাজীবীর জীবন অনিশ্চয়তায় ঠাসা। ফলে সমাজে সৃষ্টি হয় প্রবল বৈষম্য। সর্বজনীন পেনশন স্কিম চালুর মাধ্যমে সেই বৈষম্য ঘোচানোর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। উচ্চাভিলাষী মনে হলেও সবার জন্য পেনশন ব্যবস্থা চালু হয়ে গেছে বাংলাদেশে। এটা এক বিস্ময়কর অগ্রগতি। আমার বিবেচনায় আওয়ামী লীগ সরকারের যত উন্নয়ন কর্মকা- তার সবার শীর্ষে থাকবে সর্বজনীন পেনশন স্কিম। উপকারভোগীদের সম্ভাব্য সংখ্যা বিবেচনায় এরচেয়ে বড় জনসম্পৃক্ত কর্মসূচি আর কিছু নেই। দেশের চার শ্রেণির প্রায় ১০ কোটি মানুষের কথা বিবেচনায় রেখে চালু করা হয়েছে সর্বজনীন পেনশন স্কিম। আগে থেকে চলমান সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সঙ্গে সর্বজনীন পেনশন স্কিমের বড় পার্থক্য হলো, পেনশন কর্মসূচিতে সবার অংশগ্রহণ থাকবে। এটা হবে সম্মানজনক এবং সবাই নিজেদের কর্মসূচি মনে করবে। সর্বজনীন পেনশন স্কিম বয়সী মানুষদের মর্যাদার জীবন নিশ্চিত করবে।

সর্বজনীন পেনশন স্কিমে প্রাথমিকভাবে চারটি প্যাকেজ ঘোষণা করা হয়েছে। প্রবাসীদের জন্য ‘প্রবাস’, বেসরকারি চাকরিজীবীদের জন্য ‘প্রগতি’, স্বকর্ম ও অপ্রাতিষ্ঠানিক কর্মে নিয়োজিতদের জন্য সুরক্ষা এবং বার্ষিক আয় ৬০ হাজার টাকার নিচে এমন নিম্ন আয়ের মানুষদের জন্য ‘সমতা’। সমতায় মাসিক চাঁদা এক হাজার টাকা, যার অর্ধেক দেবে সরকার। অন্য প্যাকেজে এক হাজার থেকে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত চাঁদা দেওয়ার সুযোগ থাকছে। ১৮ বছর থেকে ৫০ বছর বয়স পর্যন্ত যে কেউ এই স্কিমে অন্তর্ভুক্ত হতে পারবেন। ৬০ বছর বয়স হওয়ার পর থেকে তিনি আজীবন পেনশন পাবেন। আর মারা গেলেই নমিনি তার ৭৫ বছর হওয়া পর্যন্ত পেনশন পাবেন। কেউ যদি ১৮ বছরে অন্তর্ভুক্ত হন, তাহলে তিনি সর্বোচ্চ ৪২ বছর চাঁদা দিতে পারবেন। ‘প্রবাস’ স্কিমে কেউ যদি সর্বোচ্চ ৪২ বছর ১০ হাজার করে চাঁদা দেন, তাহলে মেয়াদ শেষে তিনি প্রতি মাসে ৩ লাখ ৪৪ হাজার ৬৫৫ টাকা করে পাবেন। প্রগতি বা সুরক্ষায় কেউ সর্বোচ্চ ৪২ বছর ৫ হাজার টাকা করে চাঁদা দিলে মেয়াদ শেষে তিনি প্রতি মাসে ১ লাখ ৭২ হাজার ৩২৭ টাকা করে পাবেন।

প্রকল্পটি উচ্চাভিলাষী মনে হলেও এটা সরকারের জন্য বোঝা তো নয়ই বরং আয়ের বড় সম্ভাবনা নিয়ে আসতে পারে। কারণ চালু হওয়া পেনশন স্কিমে সরকারকে কমপক্ষে ১০ বছর, সর্বোচ্চ ৪২ বছর পর টাকা শোধ করতে হবে। আর সবাইকে একসঙ্গে টাকা ফেরত দিতে হবে না। তার মানে আগামী ১০ বছর সরকার শুধু টাকা পাবে, কিন্তু এক টাকাও ফেরত দিতে হবে না। আগামী ১০ বছরে সংগৃহীত অর্থ দিয়ে যদি সরকার লাভজনক কাজে বিনিয়োগ করে তাহলে কইয়ের তেলে কই ভাজার পরও বাড়তি তেল থেকে যাবে। তা ছাড়া ‘প্রবাস’ প্যাকেজে প্রবাসীরা বৈদেশিক মুদ্রায় চাঁদা দেবেন। কিন্তু মেয়াদ শেষে ফেরত পাবেন টাকায়। তাই এই স্কিম সরকারের বৈদেশিক মুদ্রা আয়েরও উৎস হতে পারে। তা ছাড়া সফলভাবে এই স্কিম চালু করতে পারলে সামাজিক নিরাপত্তা খাতে ব্যয় কমে আসবে।

যথাযথ প্রচারণার অভাবে চমৎকার প্রকল্পটির শুরুতেই মুখ থুবড়ে পড়ার দশা। যেখানে ১০ কোটি মানুষ পেনশন স্কিমের আওতায় আসতে পারে, সেখানে প্রথম ১০ মাসে এক লাখের কিছু বেশি মানুষ পেনশন স্কিমে নিবন্ধন করেছেন। আসলে পেনশন স্কিম নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে কিছু ভয়, দ্বিধা, সংশয় রয়েই গেছে। বাংলাদেশে সারাজীবন সরকারি চাকরি করে পেনশন পেতেই মাথার ঘাম পায়ে ফেলতে হয়। সেখানে বেসরকারি চাকরিজীবীদের ৪২ বছর চাঁদা দেওয়ার পর পেনশন পেতে কয় বছর ঘুরতে হবে? এটা একটা বড় প্রশ্ন বটে। সরকার বদল হলে এই স্কিমের কী হবে, তা নিয়েও চিন্তা আছে কারও কারও। সরকার মানুষের মন থেকে সংশয় দূর করতে পারেনি। আর পারেনি বলেই নিবন্ধনের সংখ্যা হতাশাব্যঞ্জক। হতাশা কাটিয়ে পেনশন স্কিমকে আরও বেশি মানুষের কাছে নিতে নানা উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। সম্প্রতি সরকারের এক প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, চলতি বছরের ১ জুলাইয়ের পর থেকে স্বশাসিত, স্বায়ত্তশাসিত এবং রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থার চাকরিতে যারা যোগ দেবেন; তারা বিদ্যমান ব্যবস্থার মতো আর অবসরোত্তর পেনশন সুবিধা পাবেন না। বদলে নতুনদের সর্বজনীন পেনশনের ‘প্রত্যয়’ স্কিমে বাধ্যতামূলকভাবে আওতাভুক্ত করা হবে। সরকারের এই নতুন সিদ্ধান্ত প্রত্যাখ্যান করেছেন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা। বঞ্চিত হবেন, বৈষম্য সৃষ্টি হতে পারে; এই শঙ্কায় পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা এরই মধ্যে এই প্রজ্ঞাপন বাতিলের দাবিতে আন্দোলন শুরু করেছেন। তাৎক্ষণিকভাবে হয়তো বঞ্চনার অনুভূতি হতে পারে, তবে বছরের পর বছর ধরে চলে আসা সামগ্রিক বৈষম্য দূর করতে দেশের সব মানুষকে সর্বজনীন পেনশন স্কিমের আওতায় আনতে হবে। স্কিমের নামেই যেহেতু ‘সর্বজনীন’ শব্দটি রয়েছে, তাই একে একে সত্যি সত্যি সর্বজনীন করে তোলাটাও সরকারেরই দায়িত্ব। শুধু স্বশাসিত, স্বায়ত্তশাসিত, রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা নয়, ধাপে ধাপে সরকারি কর্মচারীদেরও পেনশন স্কিমের আওতায় আনতে হবে। একটা পর্যায়ে যেন বাংলাদেশের সব মানুষের সমান সুযোগ-সুবিধা পাওয়ার অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে। নতুন করে অন্তর্ভুক্তির কারণে যারা বঞ্চিত হতে পারেন, প্রাথমিকভাবে তাদের জন্য সরকার ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা করতে পারে। প্রয়োজনে পেনশন স্কিমের চাঁদার পরিমাণের টাকা বেতন বাড়িয়ে হলেও এই স্কিমের আওতায় আনতে হবে। পাবলিক বিশ^বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা বা নতুন যারা অন্তর্ভুক্ত হবেন, তারা বেতন বাড়ানোর আন্দোলন করতে পারেন। সেটা না করে পেনশন স্কিমে না যাওয়ার আন্দোলন কেন করছেন, বুঝতে পারছি না। পেনশন স্কিমের পেনশন তো সরকারি পেনশনের চেয়ে কম নয়, বরং বেশিই।

তবে সরকারকে সবার আগে পেনশন স্কিম নিয়ে সব দ্বিধা-সংশয় দূর করতে হবে। পুরো প্রকল্পটি দক্ষতার সঙ্গে পরিচালনা করতে হবে। সুরক্ষিত আইনি কাঠামো গড়ে তুলতে হবে। আস্থা অর্জন করতে পারলে বিপুল সংখ্যক মানুষ এই প্রকল্পে অন্তর্ভুক্ত হতে আগ্রহী হতে পারে। আর বিপুল সংখ্যক মানুষের অংশগ্রহণই এর টেকসই ভবিষ্যতের নিশ্চয়তা দেবে। কোনো আমলাতান্ত্রিক জটিলতা বা অনিয়ম যেন মহৎ এই উদ্যোগ ম্লান করে না দেয়, সেটা নিশ্চিত করতে হবে। সর্বজনীন পেনশন স্কিম যেন মানুষের ভরসার জায়গা হয়, ভোগান্তির নয়।

লেখক: বার্তা প্রধান, এটিএন নিউজ

Probhash2000@ gmail.com

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত