জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বড় মেয়ে, আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ৪৪তম স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস আজ শুক্রবার। বঙ্গবন্ধু হত্যাকা-ের পর দীর্ঘ নির্বাসন জীবন শেষে ১৯৮১ সালের এই দিনে বাংলাদেশের মাটিতে পা রাখেন টানা চার বারের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সপরিবারে নির্মম হত্যাকাণ্ডের শিকার হন। এ সময় তার দুই কন্যা শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা প্রবাসে থাকায় প্রাণে বেঁচে যান। পরে ১৯৮১ সালের ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত দলের কাউন্সিলে শেখ হাসিনার অনুপস্থিতিতে তাকে আওয়ামী লীগের সভাপতি নির্বাচিত করা হয়। ঐক্যের প্রতীক হয়ে ভাঙনের হাত থেকে আওয়ামী লীগকে রক্ষা করেন তিনি।
ওই বছরের ১৭ মে বিকেল সাড়ে ৪টায় ইন্ডিয়ান এয়ারলাইনসের একটি বোয়িং বিমানে ভারতের রাজধানী দিল্লি থেকে কলকাতা হয়ে তৎকালীন ঢাকার কুর্মিটোলা বিমানবন্দরে এসে পৌঁছান শেখ হাসিনা। বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার পর প্রথমবারের মতো মাতৃভূমিতে ফেরেন শেখ হাসিনা। বৈরী আবহাওয়া উপেক্ষা করে বঙ্গবন্ধুকন্যাকে একনজর দেখতে সেখানে ছুটে আসেন লাখো মানুষ। মিছিল আর জনস্রোতের শহরে পরিণত হয় রাজধানী ঢাকা। সকাল থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত চলে সেøাগান। ঝড়-বৃষ্টিও মিছিলের গতিরোধ করতে পারেনি। রাজধানীর মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে লাখো জনতার সংবর্ধনায় বঙ্গবন্ধুকন্যা সেদিন বলেছিলেন, ‘সব হারিয়ে আমি আপনাদের মধ্যে এসেছি। বঙ্গবন্ধুর নির্দেশিত পথে তার আদর্শ বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে জাতির পিতার হত্যার প্রতিশোধ গ্রহণে আমি জীবন উৎসর্গ করতে চাই।’
তিনি আরও বলেছিলেন, ‘আমার আর হারাবার কিছুই নেই। পিতা-মাতা, ভাই কামাল, জামাল, রাসেল সবাইকে হারিয়ে আমি আপনাদের কাছে এসেছি। আমি আপনাদের মধ্যেই তাদের ফিরে পেতে চাই। আপনাদের নিয়েই আমি বঙ্গবন্ধুর নির্দেশিত পথে তার আদর্শ বাস্তবায়ন করে বাংলার দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফোটাতে চাই। বাঙালি জাতির আর্থ-সামাজিক তথা সার্বিক মুক্তি ছিনিয়ে আনতে চাই।’
আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস উপলক্ষে দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের গতকাল বৃহস্পতিবার এক বিবৃতিতে বলেন, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের হত্যাকাণ্ডের পর শেখ হাসিনার স্বদেশ প্রত্যাবর্তন একটি যুগান্তকারী ও তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা। সেই থেকে তিনি প্রায় পাঁচ দশক আওয়ামী লীগকে নেতৃত্ব দিয়ে যাচ্ছেন।
দিবসটি উপলক্ষে আওয়ামী লীগসহ বিভিন্ন সামাজিক সাংস্কৃতিক সংগঠন দেশব্যাপী কর্মসূচি নিয়েছে।
কর্মসূচি :
আজ সকাল ৯টায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকারি বাসভবন গণভবনে আওয়ামী লীগের নেতারা শুভেচ্ছা বিনিময় করবেন। বিকেল সাড়ে ৩টায় তেজগাঁওয়ে ঢাকা জেলা আওয়ামী লীগ ভবনে আলোচনা সভা হবে। এতে বক্তব্য রাখবেন জাতীয় নেতারা ও বরেণ্য বুদ্ধিজীবীরা। সভায় সভাপতিত্ব করবেন আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন।
এ ছাড়া মসজিদ, মন্দির, প্যাগোডা, গির্জাসহ সব ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে দেশব্যাপী বিশেষ প্রার্থনা করা হবে। বাদ জুমা বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদসহ দেশের সব মসজিদে দোয়া ও মিলাদ মাহফিল হবে। সকাল ৯টায় মিরপুর ব্যাপ্টিস্ট চার্চে খ্রিস্টান সম্প্রদায়, সকাল ১০টায় রাজধানীর মেরুল বাড্ডায় আন্তর্জাতিক বৌদ্ধ বিহারে বৌদ্ধ সম্প্রদায় এবং সকাল সাড়ে ১১টায় ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দিরে হিন্দু সম্প্রদায় প্রার্থনা সভার আয়োজন করবে। দলের ত্রাণ ও সমাজকল্যাণ উপ-কমিটি এদিন এতিমখানায় খাবার বিতরণ করবে।
দিবসটি উপলক্ষে কেন্দ্রীয় কর্মসূচির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণের জন্য সারা দেশে আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনগুলোর সর্বস্তরের নেতাকর্মীদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন ওবায়দুল কাদের।
এদিকে, আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ৪৪তম স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবসে দেশের বিভিন্ন এতিমখানায় খাবার বিতরণ করছে দলটির ত্রাণ ও সমাজকল্যাণ উপ-কমিটি। কর্মসূচির অংশ হিসেবে আজ রাজধানীর আজিমপুর সলিমুল্লাহ মুসলিম এতিমখানা, মোহাম্মদপুর সলিমুল্লাহ রোডের এতিমখানা, সোবহানবাগ মসজিদ সংলগ্ন এতিমখানা, বাড্ডা বেরাইদ রহিম উল্লাহ এতিমখানায় খাবার সামগ্রী বিতরণ করা হবে।
একই সঙ্গে সিলেট হযরত শাহজালালের (রহ.) মাজার সংলগ্ন এতিমখানা এবং চট্টগ্রাম হযরত শাহ আমানতের (রহ) মাজার সংলগ্ন এতিমখানা ও গরীব উল্লাহ শাহের (রহ) মাজার সংলগ্ন এতিমখানাতেও খাবার সামগ্রী বিতরণ করা হবে। এ ছাড়াও ত্রাণ ও সমাজকল্যাণ উপ-কমিটির সদস্যদের উদ্যোগে দেশের বিভিন্ন জেলা সদরের এতিমখানাগুলোতে সুষম খাবার পরিবেশন করা হবে।
আগামীকাল শনিবার দুপুর ১টায় চট্টগ্রামের কদম মোবারক এতিমখানায় সুষম খাবার বিতরণ কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হবে। এতে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন আওয়ামী লীগের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ।
ছাত্রলীগের কর্মসূচি : আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ৪৪তম স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস উপলক্ষে শোভাযাত্রা ও সমাবেশ করেছে বাংলাদেশ ছাত্রলীগ। গত বৃহস্পতিবার বিকেলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যানটিন থেকে বর্ণাঢ্য এ শোভাযাত্রা শুরু হয়ে ফুলার রোড হয়ে টিএসসির রাজু ভাস্কর্যে এসে শেষ হয়। পরে সেখানে সংক্ষিপ্ত সমাবেশ হয়।
‘তুমি দেশের, তুমি দশের’ শীর্ষক এ শোভাযাত্রায় জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছবি সংবলিত প্ল্যাকার্ড বহন এবং বিভিন্ন সেøাগান দেন সংগঠনের নেতাকর্মীরা। এতে ছাত্রলীগের বিভিন্ন ইউনিটের সহস্রাধিক নেতাকর্মী অংশ নেন।
শোভাযাত্রা শেষে আয়োজিত সমাবেশে সভাপতির বক্তব্য দেন ছাত্রলীগ সভাপতি সাদ্দাম হোসেন। তিনি বলেন, ‘সামরিক স্বৈরশাসকদের রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে জনতার নায়কের বেশে বঙ্গবন্ধু তনয়া দেশরতœ শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তনই বাংলাদেশের বিজয়ের গল্প রচনা করেছে। এই প্রত্যাবর্তনই বাংলাদেশের পরিবর্তনের সূচনা করেছে। এমন সময় বঙ্গবন্ধু তনয়া দেশরতœ শেখ হাসিনা প্রত্যাবর্তন করেছেন, যখন এই বাংলাদেশে ছিল কারফিউ গণতন্ত্র, যখন মিলিটারি ডিক্টেটররা প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে দেশ পরিচালনা করত, তখন রাজনৈতিক দল মানে ছিল সামরিক স্বৈরশাসকরা।’
সাদ্দাম আরও বলেন, ‘আমাদের শুধু রাজনৈতিক অর্জন নয়। এ দেশের মানুষের যে জীবন বদলে যাওয়া প্রত্যেকটির সঙ্গেই বঙ্গবন্ধু তনয়া দেশরতœ শেখ হাসিনা সম্পৃক্ত। শুধু সামষ্টিক অর্জন নয়, সবার ব্যক্তিগত যে জীবন, ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা, ব্যক্তিগত বেদনা বঙ্গবন্ধু তনয়া দেশরতœ শেখ হাসিনা বদলে দিয়েছেন। শেখ হাসিনার সাফল্যের আগে বেদনাদায়ক বাস্তবতা নিয়ে বাংলাদেশের মানুষকে জীবন পরিচালনা করতে হয়েছে। বাংলাদেশের মানুষের খাদ্যাভ্যাস, জীবনাচারণ, সাংস্কৃতিক জীবন, প্রযুক্তি ব্যবহারের যে অভিজ্ঞতা, কর্মসংস্থানের যে সুযোগ কোনো কিছুই আমাদের ছিল না। বঙ্গবন্ধু তনয়া দেশরতœ শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তনের কারণে আমাদের জীবন বদলে গেছে। এ কারণেই বঙ্গবন্ধু তনয়া দেশরতœ শেখ হাসিনা আমাদের কাছে বাংলাদেশ।’
ছাত্রলীগ সাধারণ সম্পাদক শেখ ওয়ালী আসিফ ইনানের সঞ্চালনায় সমাবেশে আরও বক্তব্য দেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সভাপতি মাজহারুল কবির শয়ন, সাধারণ সম্পাদক তানভীর হাসান সৈকত, ঢাকা মহানগর দক্ষিণ ছাত্রলীগের সভাপতি রাজিবুল ইসলাম বাপ্পি, সাধারণ সম্পাদক বাবু সজল কু-ু, ঢাকা মহানগর উত্তর ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক সাগর আহমেদ শামীম প্রমুখ।
