মানুষ সৃষ্টিকাল থেকে চলছে অর্থের আধিপত্যে। ব্যতিক্রম বাদে, এর সঙ্গে যখন যোগ হয় রাজনীতি, তখন ‘নীতি’ অগ্রাহ্য হয়। এর কারণ হচ্ছে, অর্থ ছাড়া রাজনীতি অচল। সামন্তযুগে জমির মালিকদেরই অর্থনৈতিক ক্ষমতা ছিল। মজুরি নির্ধারণে শ্রম আইনের ভূমিকার মতোই তারা নির্ধারণ করতে পারত শ্রমিকদের মজুরি। পুঁজিপতিদের হাতে সব সময় থাকে অর্থনৈতিক ক্ষমতা। এটা নতুন কিছু নয়। এই তারাই আবার নিয়ন্ত্রণ করে রাজনীতি। সেই ক্ষমতার রাজনীতিই তৈরি করে আইন। এমন ধারাই চলে আসছে অনাদিকাল থেকে। রাহুল সাংকৃত্যায়ন জানাচ্ছেন, বেদভিত্তিক আদিম সাম্যবাদী সমাজব্যবস্থায় মানুষ খাদ্য সংগ্রহ করে জীবনযাপন করত। পরবর্তীকালে যাগযজ্ঞে পশু-বলি ও সোমরস যুক্ত হয়েছে। তারও পরে শুরু হয়েছে বিনিময়প্রথা। আর দাস বা ক্রীতদাসব্যবস্থা এবং সামন্ততন্ত্রের সন্ধিক্ষণে শুরু হয়েছে, হালফিলের বিনিময়ের মাধ্যম হিসেবে মুদ্রাব্যবস্থা ও সুদভিত্তিক অর্থনীতি। বেদের অপর নাম ‘শ্রুতি’। এটি রচিত হয়েছে খ্রিস্টপূর্ব ৮০০-১৫০০। তখনই আমরা পাই ঋগে¦দ, যজুর্বেদ, অথর্ববেদ এবং সোমবেদ। সেখানে রয়েছে নানা ধরনের শিক্ষাকথা। অর্থনীতি ও রাজনীতির পারস্পরিক সম্পর্কের কথা যজুর্বেদের দ্বিতীয় খন্ড শুক্ল যজুর্বেদেই আমরা পাচ্ছি।
পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র এবং পৃথিবীর সব রাষ্ট্র ও জীবকে নিয়ন্ত্রণ করছে অর্থে বলবান মানুষ, গোষ্ঠী, দেশ। এমনই চলছে অনাদি কাল থেকে। আমরা যা-ই বলি না কেন, সব কর্মই নিয়ন্ত্রণ অর্থজোরে। এই জোরই নিয়ন্ত্রণ করে রাজনীতি। ফলে রাজনীতিবিদরা শাস্ত্রজ্ঞানে বিজ্ঞ অর্থনীতিবিদদের, তথাকথিত রাজনীতির বাইরে রেখে একটি অসম অর্থব্যবস্থা চাইবেনএটাই স্বাভাবিক। যেমনটি বলছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন। বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণাপ্রতিষ্ঠান (বিআইডিএস) আয়োজিত ‘বাংলাদেশের অগ্রযাত্রায় আগামীর করণীয়’ শীর্ষক বইয়ের মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে ড. ফরাসউদ্দিন এ কথা বলেন। বইটির লেখক তিনিই জানা গেল দেশ রূপান্তরে শুক্রবার প্রকাশিত ‘অর্থনীতিবিদদের আজ্ঞাবহ দেখতে চান রাজনীতিকরা’ প্রতিবেদনের মাধ্যমে। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থনৈতিক উপদেষ্টা মসিউর রহমান। বিশেষ অতিথি ছিলেন সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অর্থ উপদেষ্টা ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ ও ইস্টওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির উপাচার্য শামস রহমান। এর বাইরে আরও অনেক বিদগ্ধজন বক্তব্য দেন। আলোচনায় ফরাসউদ্দিন বলেন, ‘অর্থনীতিবিদরা জ্ঞানী; গণমাধ্যমে বা টেলিভিশনে তারা কথা বলেন। রাষ্ট্র পরিচালনাকারীদের উচিত, আমন্ত্রণ জানিয়ে তাদের কথা শোনা; সেটা করা গেলে খুব ভালো হতো।’ তিনি বলেন, ‘আমি বড় অর্থনীতিবিদ নই। তবু মনে করি, প্রচলিত পথে দারিদ্র্যবিমোচনের পরিবর্তে শিল্পায়নের মাধ্যমে দারিদ্র্যবিমোচনের পদক্ষেপ নেওয়া দরকার।’
শুধু দারিদ্র্যবিমোচনের বিষয় নয়, সব ক্ষেত্রেই সংশ্লিষ্ট অভিজ্ঞদের নিয়ে নির্দিষ্ট বিষয়ে সম্মিলিত সিদ্ধান্তে আসতে না পারলে কোনো সমস্যারই উপযুক্ত সমাধান আসবে না। অর্থনীতিবিদ ড. ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ বলছেন, ‘আমাকে অনেকেই প্রশ্ন করেন, বাংলাদেশের সরকার কী প্রকৃতির? ডেমোক্রেসি ইনডেক্স অনুযায়ী, বাংলাদেশের সরকারকে বলা যায়, গণতন্ত্রের আনুষ্ঠানিকতার ভেতরে কর্র্তৃত্ববাদী সরকার। এ ধরনের সরকারের জনপ্রিয়তা থাকবে। এ ধরনের সরকার সব সময়ই চায় অর্থের উন্নয়নের মধ্যে থেকে শক্তি সঞ্চার করতে। এভাবে শক্তির সঞ্চার করতে গেলে নীতির বিচ্যুতি ঘটে।’ তিনি আরও বলেন, ‘এ ধরনের কর্র্তৃত্ববাদী সরকার অর্থনৈতিক উন্নয়নে শক্তি সঞ্চার করে। ফলে সুযোগের বৈষম্য তৈরি হয়। সুযোগের বৈষম্যের ফলে দেশে ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষতি হয়েছে।’
রাজনীতির ধর্মই হচ্ছে, বহুমাত্রিক পথের সন্ধান করে নিজেকে টিকিয়ে রাখার জন্য নানা ধরনের কৌশলের আশ্রয় নেওয়া। তবে যে রাজনৈতিক দর্শনে দেশ এবং জনগণপ্রেম প্রাধান্য পায়, সেই ধারার রাজনীতিই শেষ পর্যন্ত জয়ী হয়। তবে সবকিছুতে রাজনীতির আজ্ঞাবহ হলে শুধুই থেকে যায় কেবলমাত্র জি, আজ্ঞে, ইয়েস। রাজনীতিবিদরা তখন অর্থনীতিবিদদের হুকুমের আজ্ঞাবহ হিসেবে দেখতে চাইবেন, এটাই স্বাভাবিক। এখানে বিস্মিত হওয়ার কিছু নেই।
