তথ্যপ্রযুক্তির অবিস্মরণীয় উন্নতির এই যুগে অনেকেই অভিযোগ করেন অবাধ তথ্য চলাচলের ফলে তরুণ প্রজন্ম পথভ্রষ্ট হচ্ছে। সে কথার কিছু সত্যতা থাকলেও ইতিবাচক দৃষ্টান্তও অপ্রতুল নয়। কুড়িগ্রামের সদ্য এসএসসি পাস করা তরুণ ফাহাদ আল ফারাবী মহাকাশের গ্রহ-নক্ষত্র পর্যবেক্ষণের জন্য নিজেই বানিয়ে নিয়েছেন দূরবীক্ষণ যন্ত্র। লিখেছেন জেলি খাতুন
স্বপ্ন দেখতে নেই মানা, এই স্বপ্ন দেখেছে কুড়িগ্রাম জেলার ফাহাদ আল ফারাবী। এ সময়ে যখন তরুণদের হাতের স্মার্টফোন পাবজি, ফ্রি ফায়ারের মতো বিভিন্ন গেমের নেশা ডুবিয়ে দিয়েছে একটা প্রজন্মের অধিকাংশকে, তখন কজনেরই বা আগ্রহ থাকে আকাশের চাঁদ, তারা দেখার? সংখ্যাটা হয়তো হাতে গোনা যাবে। এই হাতে গোনা কয়েকজনের একজন ফাহাদ আল ফারাবী। তিনি নিজের আগ্রহকে পূর্ণতা দিয়েছেন নিজেই। নিজেই তৈরি করেছেন দূরবীক্ষণ যন্ত্র। দূর আকাশের চাঁদ, তারা দেখার সেই জটিল বৈজ্ঞানিক যন্ত্র তৈরি করে প্রায় হতবাক করে দিয়েছে পুরো এলাকাকে।
ফাহাদের বাবা মো. জয়নুল আবেদিন। তিনি উলিপুর স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিরাপদ খাদ্য পরিদর্শক হিসেবে কর্মরত আছে। মা মোছা. পারভীন খন্দকার শিশু নিকেতন রাজারহাট বিদ্যালয়ের একজন শিক্ষিকা। চারজনের পরিবারে অপর সদস্য বড় ভাই ফাহমিদ আল জাবের। দূরবীক্ষণ যন্ত্র তৈরিতে ফাহাদকে তিনি সব সময় সব দিক থেকে প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে সাহায্য করেছেন।
ফাহাদ আল ফারাবীর ছোটবেলা থেকেই সৌরজগৎ ও মহাবিশ্বের রহস্যের প্রতি আকর্ষণ ছিল। তখন থেকেই তার ইচ্ছা ছিল যে, তার নিজের একটি টেলিস্কোপ হবে এবং সেই টেলিস্কোপ দিয়ে মহাকাশ পর্যবেক্ষণ করবেন। টেলিস্কোপের দাম একেবারে কম নয়। সবকিছু ভেবে সিদ্ধান্ত নেন প্রয়োজনে প্রয়োজনীয় জিনিস কিনে নিজেই তৈরি করবেন টেলিস্কোপ। ২০২০-২০২১ সালের দিকে শুরুও করেন টেলিস্কোপ তৈরির কাজ। কিন্তু সে সময় প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র না পাওয়ায় কাজ বন্ধ করে দিতে হয় ফাহাদকে। প্রয়োজনীয় জিনিস না পাওয়া যাওয়ার সঙ্গে অর্থের সংকুলান না হওয়াও কাজ বন্ধ হওয়ার একটি কারণ।
ফাহাদ শুধু মহাকাশ নিয়ে কৌতূহলীই নয়, একজন উদীয়মান দাবা খেলোয়াড়ও। এই তরুণ দাবাড়ু অংশ নিয়েছেন বিভিন্ন জাতীয় প্রতিযোগিতায়। অর্জন করেছেন সম্মানজনক স্থান ও স্বীকৃতি। ২০২২ সালে শেখ কামাল ৪৭তম জাতীয় ‘বি’ দাবা চ্যাম্পিয়নশিপ ২০২২ প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে ৯০তম স্থান অধিকার করেন। সে বছরই অনুষ্ঠিত মার্সেল ২য় বিভাগ দাবা লিগ ২০২২-এ দলীয়ভাবে অংশ নিয়ে ১১তম স্থান অধিকার করেন তিনি। পরের বছর শেখ কামাল জাতীয় যুব দাবা চ্যাম্পিয়নশিপ ২০২৩ আসরের অনূর্ধ্ব-১৮ বিভাগে অংশ নেন তিনি। এবার সপ্তম স্থান অধিকার করেন। শেখ কামাল দ্বিতীয় বাংলাদেশ যুব গেমসের দলীয় ইভেন্টে অংশ নিয়ে দ্বিতীয় স্থান অধিকার করেন। এই অর্জনের ফলে তিনি তার জেলা কুড়িগ্রামসহ জাতীয়ভাবে যেমন পরিচিতি লাভ করেন, উদীয়মান দাবাড়ু হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করেন তেমনি উপবৃত্তি হিসেবে পান কিছু অর্থ। এই অর্থ তাকে সাহায্য করে নিজের টেলিস্কোপ তৈরিতে। বাকি অর্থের জোগান দেন তার মাস্টার্সে পড়ুয়া বড় ভাই।
করোনার মহামারীর প্রভাব হ্রাস পাওয়ায় বাজারে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র পাওয়া যেতে শুরু করে। অর্থের একটা ব্যবস্থা হওয়ায় এবং প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র সহজলভ্য হওয়ায় ফাহাদ টেলিস্কোপ তৈরির কাজ শুরু করেন পুনরায় ২০২৪ সালে। টেলিস্কোপ তৈরির কাজ বন্ধ থাকার আরেকটি কারণ ছিল এসএসসি পরীক্ষা। পরীক্ষার পরে মেলে অখন্ড অবসর। এ সময় আত্মনিয়োগ করেন টেলিস্কোপ তৈরিতে। তার এই টেলিস্কোপ তৈরিতে ব্যয় হয়েছে প্রায় সতেরো-আঠারো হাজার টাকা। দাবাড়ু হিসেবে পাওয়া উপবৃত্তি ও বড় ভাইয়ের কাছ থেকে পাওয়া অর্থ সাহায্য দিয়ে টেলিস্কোপের যন্ত্রাংশ কিনে নিজের স্বপ্নকে বাস্তব রূপ দিয়েছেন ফাহাদ। ফাহাদ টেলিস্কোপ তৈরিতে সাশ্রয়ী প্রযুক্তি ব্যবহার করেছেন। তার কারণে এই মানে টেলিস্কোপ বাজারে কিনতে যেখানে পঁয়ত্রিশ থেকে চল্লিশ হাজার টাকার প্রয়োজন হয় সেখানে ফাহাদ তৈরি করেছেন প্রায় অর্ধেক দামে। এই টেলিস্কোপ তৈরিতে ব্যবহৃত হয়েছে মিরর সেট, মিরর সেল, পিভিসি পাইপ, ফোকাসার, দুটি আইপিস ও কাঠ।
ফাহাদ তার তৈরি এই টেলিস্কোপের নাম দিয়েছেন তার পোষা প্রাণী বিড়ালের নামে। তার বিড়ালের নাম নেকো। আর ফাহাদের টেলিস্কোপের নাম NEKO-K-1। এখন পর্যন্ত ফাহাদের টেলিস্কোপ দিয়ে বৃহস্পতি ও শনি গ্রহ এবং এদের ৪টি করে উপগ্রহ পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হয়েছে। ফাহাদ আশা করছেন বাকি গ্রহগুলোও পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হবে।
এসএসসি পরীক্ষায় কৃতকার্য হওয়ার পরে ফাহাদ তার নিজ জেলার কলেজেই ভর্তি হতে চায়। মাধ্যমিকের মতো উচ্চ মাধ্যমিকেও বিজ্ঞান বিভাগেই পড়ার ইচ্ছা আছে তার। আপাতত এই তরুণের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা হচ্ছে এই টেলিস্কোপটিকে আরও উন্নত করার এবং এই টেলিস্কোপের মাউন্টকে লিভার সিস্টেম করার! শুধু তাই নয়, তার ইচ্ছা আছে কীভাবে টেলিস্কোপিক মিরর বা আয়নাগুলো তৈরি করা হয় সেটি শেখার। তাহলে দেশে বসেই দেশীয় প্রযুক্তিতে স্বল্পমূল্যে টেলিস্কোপ তৈরি করে তার মতো যারা জ্যোতির্বিজ্ঞানে আগ্রহী, কিন্তু দাম বেশি বলে কিনতে পারছেন না তাদের স্বল্পমূল্যে দিতে পারবেন তিনি। এমন স্বপ্ন দেখা তরুণরাই দেশকে নেতৃত্ব দিয়ে বিশ্ব দরবারে তুলে ধরবে বাংলাদেশকে।
