পটুয়াখালীর রাঙ্গাবালী উপজেলার উপকূলীয় এলাকায় নদী ও সাগরে বছরের শুরু থেকেই মাছের দেখা নেই; বিশেষ করে ইলিশের জন্য হাহাকার চলছে। মার্চ-এপ্রিল টানা দুই মাস তেঁতুলিয়া নদীতে ইলিশ অভয়াশ্রমের নিষেধাজ্ঞা শেষে জেলেদের আশা ছিল ইলিশের দেখা মিলবে। কিন্তু কাক্সিক্ষত ইলিশের দেখা না পেয়ে হতাশ তারা। বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, বৃষ্টি না হওয়া এবং তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে পানি গরম হওয়ায় ইলিশসহ যেকোনো মাছই ধরা পড়ছে কম। জেলেদের এমন দুঃসময়ের মধ্যেই ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’ হয়ে আজ সোমবার থেকে শুরু হচ্ছে সাগরে সব ধরনের মাছ ধরার ওপর ৬৫ দিনের নিষেধাজ্ঞা। এই সময়ে সংসারের খরচ, দাদন ও ঋণের টাকার জোগান হবে কোথা থেকে, এ নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন তারা।
সরেজমিনে দেখা গেছে, উপজেলার বিভিন্ন মৎস্য ঘাটে জেলেদের তেমন তৎপরতা নেই। আগুনমুখা নদীর তীরে জাল সেলাই করছেন একদল জেলে। সাগরে মাছ ধরতে না গিয়ে দুই সপ্তাহ ধরে জাল মেরামত করছেন তারা।
জেলে ট্রলারের মাঝি উপজেলার ছোটবাইশদিয়া ইউনিয়নের কোড়ালিয়া গ্রামের ইব্রাহিম হোসেন বলেন, ‘সাগরে এখন তো মাছ মিলছেই না; বরং জালে আটকা পড়ছে ছোট ছোট কাঁকড়া। এতে ছেঁড়া পড়ছে জাল। এমন দুরবস্থায় পড়েছেন অনেক জেলেই। তাই আগেভাগেই তীরে ফিরে এসেছি।’
কোড়ালিয়া গ্রামের জেলে মান্নান চৌকিদার বলেন, ‘কদিন আগে তেঁতুলিয়া নদীতে দুই মাসের অবরোধ গেছে। ভাবছি অবরোধের পর মাছ পামু। কিন্তু মাছের জন্য অপেক্ষা করতে করতে এখন আবারও ৬৫ দিনের অবরোধ আইয়া পড়ছে। এখন জাইল্ল্যাগো গ্রাম ছাইড়া ঢাকা যাওয়া ছাড়া উপায় নাই।’
উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা ইমরান হোসেন বলেন, ‘ইলিশের প্রজনন নিশ্চিত করতে এবং উৎপাদন বাড়াতে ২০ মে থেকে ২৩ জুলাই পর্যন্ত ৬৫ দিন বঙ্গোপসাগরে সব ধরনের মাছ ধরায় নিষেধাজ্ঞা
থাকবে। নিষেধাজ্ঞাকালীন নিবন্ধিত তালিকাভুক্ত প্রত্যেক জেলেকে দুই ধাপে ৮৬ কেজি করে চাল দেওয়া হবে।’
জানা গেছে, রাঙ্গাবালী উপজেলায় মোট ১৬ হাজার ৮০৯ জন নিবন্ধিত জেলে রয়েছেন। তবে জেলেদের দাবি, নিবন্ধনের বাইরেও অসংখ্য জেলে রয়েছেন, যারা নিষেধাজ্ঞাকালীন সরকারি খাদ্যসহায়তা থেকে সব সময় বঞ্চিত।
আগুমনুখা নদীর পাড়ে ট্রলার মেরামতের কাজে ব্যস্ত জেলে মামুন হাওলাদার বলেন, ‘ভাই, জাইল্ল্যারা চাল পায় না। সরকার তো আমাগো লাইগা দেয়। কিন্তু আমরা পাই না। আমাগো চাল পায় খাইয়া লইয়া যারা ভালো আছে তারা। এই যে এহন ৬৫ দিনের অবরোধ আইছে, আমরা এহন কী করমু কন? একটু খাইয়া লইয়া যে সময় পার করমু, মাছও তো পাই নাই কোনো। সঞ্চয় তো দূরের কথা, সংসার আর দাদন-ঋণের টাকা দিমু ক্যামনে হেইডাই ভাবতাছি।’
উপজেলার কোড়ালিয়া মৎস্য সমিতির সভাপতি জহির হাওলাদার বলেন, ‘৬৫ দিনের নিষেধাজ্ঞা মেনে আমাদের দেশের জেলেরা যখন মাছ ধরা থেকে বিরত থাকবে। ঠিক তখন এক মাসের বেশি সময় ভারতের জেলেরা গভীর বঙ্গোপসাগরে মাছ ধরতে আসে। তাই দুই দেশের একই সময় নিষেধাজ্ঞা হলে সরকারের উদ্দেশ্য সফল হবে।’
এ বিষয়ে শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিশারিজ, অ্যাকোয়াকালচার ও মেরিন সায়েন্স অনুষদের সহযোগী অধ্যাপক মীর মোহাম্মদ আলী বলেন, ‘আমাদের দেশের উপকূলীয় অভয়াশ্রমের জেলেরা সবচেয়ে বেশি সংকটে। কারণ, ইলিশের জন্য অক্টোবরে ২২ দিনের অবরোধ, নভেম্বর থেকে জুন পর্যন্ত ৮ মাস জাটকা ধরা নিষেধ, মার্চ-এপ্রিল দুই মাস অভয়াশ্রমে মাছ ধরা নিষেধ এবং এই ৬৫ দিনের অবরোধ তো আছেই। এখন এই ৬৫ দিনের অবরোধটাই ভারতে ৬০ দিন, ১৫ এপ্রিল থেকে ১৪ জুন পর্যন্ত। আমাদের দেশে ২৩ জুলাই পর্যন্ত নিষেধাজ্ঞা থাকায় এক মাসের বেশি সময় ধরে আমাদের জেলেরা বিরত থাকলেও ভারতের জেলেরা ঠিকই মাছ ধরতে পারছে। ফলে আমাদের দেশের জেলেরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বিষয়টি বিবেচনা করে দুই দেশের নিষেধাজ্ঞা সমান হওয়া এবং আন্তঃদেশীয় একটি ব্যবস্থাপনা দরকার।’
