বুধবার, ১৯ জুন ২০২৪, ৫ আষাঢ় ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

খেপুপাড়ায় আঘাত হানতে পারে ঘূর্ণিঝড় রেমাল

আপডেট : ২৬ মে ২০২৪, ০৬:৪৫ এএম

পূর্ব-মধ্য বঙ্গোপসাগর ও পশ্চিম-মধ্য বঙ্গোপসাগর এলাকায় অবস্থানরত গভীর নিম্নচাপটি ঘূর্ণিঝড়ে রূপ নিয়েছে। গতকাল শনিবার সন্ধ্যা ৬টায় নিম্নচাপটি ঘূর্ণিঝড় ‘রেমাল’-এ পরিণত হয়। আজ রবিবার সন্ধ্যার পর থেকে সোমবার সকালের মধ্যে পশ্চিমবঙ্গের সাগরদ্বীপ থেকে পটুয়াখালীর খেপুপাড়ার মধ্যবর্তী এলাকার মধ্য দিয়ে অতিক্রম করতে পারে। এ জন্য মোংলা ও পায়রা সমুদ্রবন্দরকে ৭ নম্বর বিপদসংকেত এবং চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার সমুদ্রবন্দরকে ৬ নম্বর বিপদসংকেত দেখিয়ে যেতে বলা হয়েছে। এ ছাড়া দেশের উপকূলে স্বাভাবিকের চেয়ে তিন থেকে পাঁচ ফুট উচ্চতার জলোচ্ছ্বাস হতে পারে।

ওমানের দেওয়া রেমাল নামের অর্থ ‘বালু’। সাগর থেকে আসা ঘূর্ণিঝড়ের সঙ্গে জলোচ্ছ্বাসে ডুবতে পারে সুন্দরবনসহ দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল। ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ১৩৫ কিলোমিটার বেগে উপকূল অতিক্রম করতে যাওয়া এই ঝড়ের সঙ্গে স্বাভাবিক জোয়ারের সময় মিলে গেলেই উপকূলে বাড়তে পারে বিপদ।

গতকাল রাত ৮টা ৩০ মিনিটে আবহাওয়া অধিদপ্তরের ৮ নম্বর বিশেষ বুলেটিনে বলা হয়, পূর্ব-মধ্য বঙ্গোপসাগর এলাকায় অবস্থানরত গভীর নিম্নচাপটি গতকাল সন্ধ্যা ৬টায় ঘূর্ণিঝড় ‘রেমাল’-এ পরিণত হয়েছে। ঘূর্ণিঝড়টি আজ রবিবার সন্ধ্যার পর থেকে সোমবার সকালের মধ্যে পশ্চিমবঙ্গের সাগরদ্বীপ থেকে পটুয়াখালীর খেপুপাড়ার মধ্যবর্তী এলাকার মধ্য দিয়ে অতিক্রম করতে পারে। ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে উপকূলীয় জেলা সাতক্ষীরা, খুলনা, বাগেরহাট, পিরোজপুর, ঝালকাঠি, বরগুনা, বরিশাল, ভোলা, পটুয়াখালী, নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর, ফেনী, কুমিল্লা, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও তাদের কাছাকাছি দ্বীপ ও চরগুলোর নিচু এলাকা স্বাভাবিক জোয়ারের চেয়ে তিন থেকে পাঁচ ফুটের বেশি উচ্চতার জলোচ্ছ্বাসে প্লাবিত হতে পারে।   

এর আগে ৩ নম্বর সতর্কতাসংকেত জারি করার পর উপকূলীয় এলাকায় লঞ্চসহ সব ধরনের নৌযান চলাচল বন্ধের নির্দেশ দিয়েছে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ)। কর্তৃপক্ষের নৌ নিরাপত্তা ও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা বিভাগের পরিচালক মো. জয়নাল আবেদীন স্বাক্ষরিত জরুরি বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, সম্ভাব্য ঘূর্ণিঝড় রেমাল নিয়ে আবহাওয়া সংকেত অনুসরণ করতে হবে। নৌচালকদের নিরাপদ আশ্রয়ে থাকার এবং নৌযান নিরাপদ আশ্রয়ে রাখার কথা জানান তিনি।

এ ছাড়া কক্সবাজার ও কলকাতা রুটে বাংলাদেশ বিমানের ফ্লাইট চলাচল বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।

আবহাওয়া অধিদপ্তরের ৭ নম্বর বিশেষ বুলেটিনে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, মোংলা ও পায়রা সমুদ্রবন্দরের জন্য ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্ক সংকেত দেখানো হয়েছিল।

ওই বুলেটিন অনুযায়ী, ঘূর্ণিঝড়ে পরিণত হওয়ার আগে গভীর নিম্নচাপটি সোজা উত্তর দিকে অগ্রসর হচ্ছিল। পরে ৮ নম্বর বুলেটিনে বলা হয়, ঘূর্ণিঝড়টি সন্ধ্যা ৬টায় চট্টগ্রাম থেকে ৪৫৫ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে, কক্সবাজার থেকে ৪০০ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে, মোংলা সমুদ্রবন্দর থেকে ৪০৫ কিলোমিটার দক্ষিণে ও পায়রা সমুদ্রবন্দর থেকে ৩৬৫ কিলোমিটার দক্ষিণে অবস্থান করছিল। ঘূর্ণিঝড় কেন্দ্রের ৫৪ কিলোমিটারের মধ্যে বাতাসের একটানা গতিবেগ ঘণ্টায় ৬২ কিলোমিটার, যা দমকা অথবা ঝড়ো হাওয়ার আকারে ৮৮ কিলোমিটার পর্যন্ত বৃদ্ধি পাচ্ছে। একই সঙ্গে উত্তর বঙ্গোপসাগরে মাছ ধরার নৌকা, ট্রলারগুলো উপকূলের কাছাকাছি নিরাপদে থাকতে বলা হয়েছে।

কোন দিক দিয়ে যাবে রেমাল : আবহাওয়া অধিদপ্তর চট্টগ্রাম কার্যালয়ের হাইড্রোমিটার পর্যবেক্ষণাগারের সহকারী পরিচালক ড. মো. ছাদেকুল আলম বলেন, ‘ঘূর্ণিঝড় নিয়ে যতগুলো মডেল রয়েছে, সব মডেল বলছে, ঝড়টি ভারতের পশ্চিমবঙ্গের সাগরদ্বীপ ও পটুয়াখালীর খেপুপাড়ার মধ্যবর্তী এলাকা দিয়ে যাবে। তবে ঘূর্ণিঝড়ের কেন্দ্র কোন দিক দিয়ে যাবে, তা এখনই বলা যাচ্ছে না। আমাদের মডেল ও আঞ্চলিক আবহাওয়া কেন্দ্রের মডেল অনুযায়ী, তা খেপুপাড়ার ওপর দিয়ে যেতে পারে।’

অন্যদিকে এশিয়ান মেটিওরোলজিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ড. মোহন কুমার দাশ বলেন, ‘গভীর নিম্নচাপটি (গতকাল রাত ৮টায়) এখনো উপকূল থেকে প্রায় ৩০০ কিলোমিটার দূরে রয়েছে। তাই উপকূলের কাছাকাছি যত আসবে, তত তা বাম দিকে বাঁক নিতে পারে। যদি বাঁক নেওয়া অব্যাহত থাকে, তাহলে ঝড়টি ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত (সাতক্ষীরার রায়মঙ্গল নদীর মোহনা) দিয়ে উপকূল অতিক্রম করতে পারে। সে ক্ষেত্রে আমাদের উপকূলভাগে ক্ষয়ক্ষতি কম হতে পারে।’ তিনি আরও বলেন, আর যদি বাম দিকে বাঁক না নেয়, তাহলে তা পটুয়াখালীর খেপুপাড়ার ওপর দিয়ে উপকূল অতিক্রম করতে পারে।

ভয় দেখাচ্ছে জোয়ার ও জলোচ্ছ্বাস : ২০০৯ সালের ২৫ মে ঘূর্ণিঝড় ‘আইলা’র কারণে উপকূলে ব্যাপক ক্ষতি হয়েছিল। সেবারও বাড়তি জোয়ার ছিল। রেমালও একই সময়ে অতিক্রম করতে যাচ্ছে। আর তখন যদি জোয়ার থাকে, তাহলে জলোচ্ছ্বাসের উচ্চতা অনেক বেড়ে যাবে। আবহাওয়া অধিদপ্তরের ফোরকাস্টিং অফিসার জেবুন নেসা বলেন, ‘আমাদের জলোচ্ছ্বাস মডেলে দেখা যাচ্ছে, মেঘনা মোহনা এলাকায় জোয়ারের উচ্চতা সবচেয়ে বেশি হতে পারে। আর এই পয়েন্টে জোয়ার শুরু হবে আজ রবিবার বিকেল সাড়ে ৫টায়। সাড়ে ৫টায় শুরু হয়ে প্রায় ৬ ঘণ্টা জোয়ার চলতে থাকার পর ভাটা শুরু হবে। এখন এ সময়ের মধ্যে যদি রেমাল উপকূল অতিক্রম করে, তাহলে জলোচ্ছ্বাসের উচ্চতা অনেক বেড়ে যাবে।’

দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের পশুর নদ এলাকায় জোয়ারের সময় জানতে চাইলে তিনি বলেন, পশুর নদে হীরণপয়েন্ট, সুন্দরীকোটা ও মোংলা নামে তিনটি স্থানে জোয়ারের পয়েন্ট রয়েছে। এই তিনটি স্থানে কাল (আজ) দুপুর ১২টা ১৫ মিনিট থেকে দুপুর ১টা ৪৫ মিনিটের মধ্যে জোয়ার শুরু হবে। তাই এই পয়েন্ট দিয়ে যদি সন্ধ্যার পর ঘূর্ণিঝড়টি উপকূল অতিক্রম করে, তখন সাগরে ভাটা থাকবে। ফলে উপকূলে ক্ষয়ক্ষতি কম হতে পারে।

ভারী বৃষ্টিপাত হবে দেশ জুড়ে : উপকূলে যদি জোয়ার, জলোচ্ছ্বাস ও বাতাসের আতঙ্ক থাকে, তাহলে সারা দেশে রয়েছে ভারী বৃষ্টিপাতের শঙ্কা; বিশেষ করে চট্টগ্রাম, পার্বত্য চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার এবং সিলেট এলাকায় ভারী বৃষ্টিপাত বেশি হতে পারে বলে জানিয়েছেন আবহাওয়াবিদ এ কে এম নাজমুল হক। তিনি বলেন, ‘ঝড়টি উপকূলে ওঠার আগেই কাল সকাল থেকেই দেশের বিভিন্ন এলাকায় বৃষ্টিপাত ঝরাবে। তবে সবচেয়ে বেশি বৃষ্টিপাত হবে রবি ও সোমবার।’

এদিকে গতকাল দুপুর থেকে দেশের বিভিন্ন এলাকায় বৃষ্টিপাত শুরু হয়ে গেছে। চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রাম এলাকায় বৃষ্টি হয়েছে। রাঙ্গামাটিতে গতকাল সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় ২৭ মিলিমিটার, সীতাকু-ে ২২, কুতুবদিয়ায় ২১, টেকনাফে ১৭ ও বান্দরবানে ১৪ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে। এদিকে এই বৃষ্টিপাতের কারণে দেশ জুড়ে কমে এসেছে তাপপ্রবাহের প্রভাব। আজ থেকে সারা দেশে তাপমাত্রা আরও কমবে বলে জানান আবহাওয়াবিদ মনোয়ার হোসেন। এ ছাড়া কালবৈশাখীর মৌসুম হওয়ায় দেশের কোথাও কোথাও কালবৈশাখীও হতে পারে।

ঘূর্ণিঝড় প্রস্তুতি

গতকাল সচিবালয়ে নিজ দপ্তরে এক সংবাদ সম্মেলনে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী মো. মহিববুর রহমান বলেছেন, রাত ১২টা-১টা (গতকাল) নাগাদ ১০ নম্বর মহাবিপদ সংকেত জারি হতে পারে। প্রবল এই ঘূর্ণিঝড় মোকাবিলায় ৮০ হাজার স্বেচ্ছাসেবক এবং ৪ হাজার আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে।

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ঘূর্ণিঝড়ের আঘাতে সাতক্ষীরা থেকে চট্টগ্রামের কক্সবাজার পর্যন্ত কমবেশি ক্ষতি হতে পারে। ৭ থেকে ১০ ফুট উচ্চতার জলোচ্ছ্বাস হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে। ঘূর্ণিঝড়ের সময় প্রচুর বৃষ্টি হতে পারে জানিয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘পাহাড়ে ভূমিধস হতে পারে।’

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত