সোমবার, ১৭ জুন ২০২৪, ৩ আষাঢ় ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

ভারতের ভিসার ক্ষেত্রে বাড়তে পারে কড়াকড়ি

আপডেট : ২৮ মে ২০২৪, ০২:১৫ এএম

ভিসাপ্রক্রিয়া সহজ করতে নিকটতম প্রতিবেশী দেশ ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের আলোচনা চলছে। সম্প্রতি বাংলাদেশিদের জন্য পোর্ট এন্ট্রি ভিসা চালু নিয়েও দুই দেশের প্রতিনিধিরা ইতিবাচক মনোভাব প্রকাশ করেছেন। এরই মধ্যে ভারতের পশ্চিমবঙ্গে ঝিনাইদহ-৪ আসনের সংসদ সদস্য (এমপি) আনোয়ারুল আজীম আনারের হত্যাকাণ্ড বাংলাদেশিদের দেশটিতে ভ্রমণে কিংবা ভিসা পাওয়ার ক্ষেত্রে আরও বাড়তি সতর্কতা যোগ করতে পারে।

এ ঘটনায় কূটনৈতিক পাসপোর্টধারী বা লাল পাসপোর্টধারী ও ভিআইপিদের ক্ষেত্রে ভারতীয় ইন্টেলিজেন্স নজরদারি বাড়াবে বলে মনে করছেন কূটনৈতিক পর্যবেক্ষক ও আইন বিশ্লেষকরা। তারা বলছেন, বাংলাদেশের সাধারণ নাগরিকদের ভিসা পাওয়ার ক্ষেত্রে খুব জটিলতার আশঙ্কা নেই। আনারের এই ঘটনার পর এখন দেশের কোনো এমপি ভারতে প্রবেশের পর কোথায় যান, কোথায় থাকেন এ বিষয়গুলো নজরদারির মধ্যে পড়বে। যেহেতু এ ঘটনার সঙ্গে বাংলাদেশ থেকে যাওয়া ভারতে অবস্থানকারী নাগরিকদেরও সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেছে, তাই তদন্ত করতে গিয়ে এতে জড়িতদের শনাক্ত করবে দেশটির আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। ফলে অনেক সাধারণ অপরাধীরও খোঁজ পাওয়া যাবে। ভিসার ক্ষেত্রে জটিলতা না হলেও সতর্কতা আরও জোরদার করবে তারা। তবে এটিও সত্যি, বাংলাদেশের নাগরিকদের ভারত যাওয়ার সঙ্গে অর্থনীতিও যুক্ত। তাই বাংলাদেশিদের হয়রানি হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। ভারত সরকার নিজেদের মতো করে সতর্কতা এবং নিরাপত্তার বিষয়টি নিয়ে ভাববে।

এক বছর ধরে ভ্রমণ ও চিকিৎসা ভিসা পেতে সময় বেশি লাগায় বাংলাদেশের পক্ষ থেকে ভারতের সঙ্গে আলোচনা জোরদার করা হয়েছে। এ নিয়ে ঢাকায় নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনারের সঙ্গে সরকারের মন্ত্রীরা কথা বলেছেন। ফলে কয়েক মাস ধরে চিকিৎসা ভিসা দ্রুত পাওয়া যাচ্ছে। ভ্রমণ ভিসা পাওয়াও আগের তুলনায় সহজ হয়েছে।

কূটনৈতিক বিশ্লেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক ড. ইমতিয়াজ আহমেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সাধারণ কোনো নাগরিকের ক্ষেত্রে এমন ঘটনা হলে বিষয়টা অন্যরকম ছিল। কিন্তু আনোয়ারুল আজীম একজন লাল পাসপোর্টধারী। তাকে যেভাবে হত্যা করা হয়েছে সেটা ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থার জন্য ভাবার বিষয়। কারণ যিনি হত্যার মূল পরিকল্পনাকারী তিনি কলকাতায় ফ্ল্যাট কিনে কিংবা ভাড়া করে ছিলেন। আবার এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে স্বর্ণ চোরাচালান ও টাকা-পয়সার লেনদেনের কথা শোনা যাচ্ছে। শোনা যাচ্ছে, এর আগেও বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক এবং আনারের বন্ধু আখতারুজ্জামান শাহীন তাকে হত্যার উদ্যোগ নিয়েছিলেন। এই তদন্তে হয়তোবা আরও অনেক কিছু বেরিয়ে আসবে। ফলে সংসদ সদস্য এবং ভিআইপিদের বিষয়ে ভারতীয় কর্র্তৃপক্ষ নতুন করে সতর্কতার বিষয়টি ভাববে বলে আমি মনে করি। পাশাপাশি আমি মনে করি, এটি সাধারণ নাগরিকদের ক্ষেত্রে কঠোর করা উচিত হবে না। সাধারণ নাগরিকদের ক্ষেত্রে এ ধরনের নৃশংসতা বা ভয়াবহ কাণ্ড ঘটানো সম্ভব নয়।’

তিনি আরও বলেন, ‘এ ঘটনা শুধু বাংলাদেশিদের ভিসা পাওয়ার ক্ষেত্রেই যে নজরদারি বাড়বে তা নয়, অন্যান্য দেশের নাগরিকদের ক্ষেত্রেও ভারত সতর্ক থাকবে। যেহেতু সেখানে এ রকম একটি নৃশংসতা হয়েছে। বাংলাদেশের পক্ষ থেকেও এ বিষয়ে আলোচনার বিষয় রয়েছে।’

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের শিক্ষক এবং কূটনৈতিক পর্যবেক্ষক জাকির হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ভিসা পাওয়ার ক্ষেত্রে ভারত আরও কঠোর হলে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। পাশের দেশ বাংলাদেশ থেকে যাওয়া উচ্চপর্যায়ের নাগরিকদের মধ্যে আনার হত্যাকাণ্ড যেভাবে ঘটেছে, সেটি তাদের জন্য বেশ বিব্রতকর। এখন তারা এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে তাদের দেশের কোনো নাগরিক জড়িত আছে কি না সেটি খুঁজবে এবং এই হত্যাকাণ্ড এবং এর সিন্ডিকেটের সংশ্লিষ্টতা অবশ্যই খুঁজে বের করবে। সেই ক্ষেত্রে সীমান্তে কড়াকড়ি আরও বাড়তে পারে। তবে বাণিজ্যিক এবং দুই দেশের মধ্যে সম্পর্কের বিষয়টি বিবেচনায় সাধারণ নাগরিকরা অতিরিক্ত সতর্কতার মধ্যে না-ও পড়তে পারে। মোটকথা, এ ঘটনাটি সাধারণ নাগরিকদের চেয়ে উপকূলীয় এবং যারা ব্যবসায়ী তাদের ওপর নজরদারির প্রভাব বেশি পড়বে। সাধারণ নাগরিকদের ক্ষেত্রে ভারতের ভিসা পাওয়ার যে প্রক্রিয়া, সেটি বেশ সতর্কতার সঙ্গে দেশটি করে থাকে। কিন্তু লাল পাসপোর্টধারী বিশেষ করে এমপিদের বিষয়ে সব দেশই অনেক শিথিল থাকে। ইমিগ্রেশনে যখন একজন লাল পাসপোর্টধারী দাঁড়ান, তখন তার ব্যাপারে আসলে অতিরিক্ত সতর্কতার বেশ কিছু থাকে না। তিনি একটি দেশের সরকারের কিংবা সংসদের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি। লাল পাসপোর্টধারী হিসেবে সে সুবিধা তিনি পেয়ে থাকেন। এখন তার ব্যত্যয় ঘটতে পারে।’

জাতীয় নির্বাচন পর্যবেক্ষক পরিষদের চেয়ারম্যান অধ্যাপক নাজমুল আহসান কলিমউল্লাহ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সংসদ সদস্য আনোয়ারুল আজীমের এ ঘটনায় ভারতীয় কর্র্তৃপক্ষ ভিসার ক্ষেত্রে তাদের কিছু সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করতেই পারে। ভিন্ন দেশে গিয়ে ট্যুরিস্টদের মৃত্যু কিংবা দুর্ঘটনায় পড়া এটি স্বাভাবিক। কিন্তু আনারের ঘটনাটা স্বাভাবিক নয়। যেহেতু তিনি ভিআইপি এবং সেখানে বাংলাদেশিদের পরিকল্পনায় এই হত্যাকাণ্ডটি ঘটেছে, এখন ভারত চেষ্টা করছে তাদের নাগরিকদের কোনো সংশ্লিষ্টতা আছে কি না, তা খুঁজে বের করতে। যে চোরাচালানের কথা শোনা যাচ্ছে সে ধরনের বিষয়গুলোর সঙ্গে কারা যুক্ত সেটিও তারা বের করবে। ফলে সাধারণ নাগরিকদের ভিসা পাওয়ার জটিলতা যতটুকুই হোক না কেন, আমাদের সংসদ সদস্য বা ভিআইপিদের ওপর তাদের বিশ্বাস ও আস্থার জায়গাটা নিয়ে নতুন করে ভাববে তারা।’

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত