সুখবর নেই ব্যবসা কর্মসংস্থানে

আপডেট : ০২ জুন ২০২৪, ০১:৫৯ এএম

বিদেশি মুদ্রার রিজার্ভের পর বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তার জায়গা হচ্ছে মূল্যস্ফীতি। রিজার্ভ ও মূল্যস্ফীতি সামাল দিতে আমদানি সংকোচন, তারল্য প্রবাহ কমিয়ে সুদহার বৃদ্ধি, ভ্যাট-ট্যাক্স বাড়ানোর মতো সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে সরকারকে। এর ফলে শুধু সাধারণ মানুষ নয়, ব্যবসা-বাণিজ্যের খরচ উল্লেখযোগ্য হারে বাড়তে যাচ্ছে।

এ ছাড়া ঋণ প্রবৃদ্ধি কমিয়ে আনার পাশাপাশি ঋণ ব্যয়বহুল হওয়ায় ব্যবসা সম্প্রসারণ ও মূলধনি বিনিয়োগ কমে গেছে, যা কর্মসংস্থানে বিরূপ প্রভাব ফেলছে।

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) শর্ত বাস্তবায়নে আগামী অর্থবছরে কর-জিডিপির অনুপাত শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ বাড়াতে হবে। বাড়তি কর আদায়ের এ চাপ ব্যবসায়ীদের ওপরও পড়বে। এ ছাড়া এবারের বাজেটে বিভিন্ন খাতে কর অব্যাহতি কমানো এবং পুঁজিবাজারের বিনিয়োগ থেকে মূলধনি আয়ের ওপর যে করছাড় সুবিধা রয়েছে, তা প্রত্যাহারের পরিকল্পনাও করছে সরকার। অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

সূত্র জানায়, আসন্ন ২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের আকার হতে যাচ্ছে ৭ লাখ ৯৬ হাজার ৯০ কোটি টাকা, যা চলতি অর্থবছরের চেয়ে ৪ দশমিক ৬ শতাংশ বেশি। এ ক্ষেত্রে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৪ লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকা। চলতি ২০২৩-২৪ অর্থবছরের বাজেটে এই লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা রয়েছে ৪ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা। তবে পরে এটি সংশোধন করে ৪ লাখ ১০ হাজার কোটি টাকা করা হয়েছে। ৭০ হাজার কোটি টাকা বা ১৭ শতাংশ রাজস্ব আয় বাড়াতেই সরকার বিভিন্ন ক্ষেত্রে ভ্যাট ও কর বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে। তথ্যপ্রযুক্তিসহ কর অব্যাহতি পাওয়া কয়েকটি খাত থেকে এই সুবিধা প্রত্যাহার করে নেওয়া হতে পারে।

রাজস্ব আয় বাড়ানোর পরিকল্পনার অংশ হিসেবে শূন্য শুল্কের অর্ধশতাধিক পণ্যে আগামী অর্থবছর থেকে ১ শতাংশ হারে আমদানি শুল্ক আরোপ হতে পারে। বর্তমানে বেশ কিছু পণ্য আমদানিতে শুল্ক নেই। এ ধরনের পণ্যের সংখ্যা ৩২৯। এই তালিকায় আছে খাদ্যপণ্য, সার, গ্যাস, ওষুধশিল্পের কাঁচামাল, কৃষি উপকরণ ইত্যাদি। আগামী বাজেটে ওই তালিকার ১৫-২০ শতাংশ পণ্য আমদানিতে ন্যূনতম ১ শতাংশ হারে শুল্ক আরোপ হতে পারে। যেসব পণ্যে ১ শতাংশ আমদানি শুল্ক বসানোর চিন্তা করা হচ্ছে, তার প্রাথমিক তালিকায় আছে কয়লা, জিপসাম, বিভিন্ন ধরনের রাসায়নিক, প্লাস্টিক কয়েল, পেপার বোর্ড, স্টিলজাতীয় পণ্য, শিল্পের কাঁচামাল, যন্ত্রপাতি-যন্ত্রাংশ ইত্যাদি, যেগুলো শিল্পে ব্যবহার হয়। নতুন করে বসানো হলে শিল্পের উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাবে, যা ব্যবসার খরচ বাড়িয়ে তুলবে।

ব্যবসার খরচ আরও বেড়ে যাবে কি না এমন প্রশ্নের জবাবে ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি আশরাফ আহমেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, তিন-চারটি পণ্য ছাড়া, বিশেষ করে ইউক্রেন থেকে যেগুলো আসে কিংবা রেড সি থেকে, এগুলোর দামের একটা বড় ধরনের উত্থান হয়েছিল। সেগুলো এখন কমে এসেছে। কিন্তু শিল্পের কাঁচামালের জন্য শুল্ক বাড়ানো হবে, তখন এটার প্রভাব সরাসরি পড়বে পণ্যের ওপর।

তিনি বলেন, সরকারি ভোক্তার ওপর চাপ না পড়লেও শিল্পের ওপর এর চাপ তো থাকবেই। তা ছাড়া ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়নের কারণে কাঁচামাল আমদানির খরচ বেড়ে গেছে।

ব্যবসায়ীদের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা কমে যেতে পারে কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে আশরাফ আহমেদ বলেন, এটার জন্য রপ্তানি সক্ষমতা কমবে না; কিন্তু মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কিছুটা চাপ পড়বে। এর কারণ হলো খাদ্যের বাইরে যেসব পণ্য আছে, সেগুলোর মূল্যস্ফীতি খুব বেশি না। যখনই কাঁচামালের দাম বাড়ে আমাদের ক্যাপিটাল মেশিনারিজের চাহিদা বেড়ে যায়। তখন আমরা যদি ব্যাংকের ঋণ না বাড়াতে পারি, তখন পণ্যের সক্ষমতার ওপর চাপ পড়বে; অর্থাৎ ঋণের প্রবাহ কমে গেলে মন্দার অবস্থা তৈরি হয়।

জানা গেছে, আসন্ন বাজেটে সিগারেটের সম্পূরক শুল্ক ও মোবাইল ফোনে কথা বলা বা ইন্টারনেটের ওপর সম্পূরক শুল্ক বাড়ানোর ঘোষণা আসতে পারে। এসব ক্ষেত্রে আরও ৫ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক যোগ হতে পারে। বর্তমানে অ্যামিউজমেন্ট পার্ক ও থিমপার্কে প্রবেশে এবং রাইডে চড়তে সাড়ে ৭ শতাংশ ভ্যাট দিতে হয়। এটি বাড়িয়ে ১৫ শতাংশ করার পরিকল্পনা রয়েছে। কোমল পানীয়, কার্বোনেটেড বেভারেজ, এনার্জি ড্রিংকস, ফলের জুস, আমসত্ত্বের ওপর ভ্যাট ৫ থেকে বাড়িয়ে ১০ শতাংশ করা হতে পারে। এ ছাড়া কার্বোনেটেড বেভারেজের ওপর ন্যূনতম কর আরও ২ শতাংশ বাড়িয়ে ৫ শতাংশ হতে পারে।

ইতিমধ্যেই রপ্তানিতে প্রণোদনা কমানোর লক্ষ্যে আইএমএফের পরামর্শ ও অর্থ বিভাগের সিদ্ধান্ত শেষে বাংলাদেশ ব্যাংক প্রজ্ঞাপন জারি করেছে। নতুন বাজেটে প্রণোদনা আরও কমতে পারে।

৬ জুন সংসদে ‘সুখী, সমৃদ্ধ, উন্নত ও স্মার্ট বাংলাদেশ বিনির্মাণে অঙ্গীকার’ শীর্ষক নতুন বাজেট উপস্থাপন হবে। তাতে আইএমএফের শর্ত বাস্তবায়নের ঘোষণা থাকবে। ঘোষিত মুদ্রানীতিতেও আইএমএফের শর্ত বাস্তবায়নের উদ্যোগ দেখা গেছে।

আইএমএফের ঋণ কর্মসূচির অন্যতম শর্ত হলো, আগামী অর্থবছরে কর-জিডিপির অনুপাত শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ বাড়াতে হবে। রাজস্ব বাড়ানোর ক্ষেত্রে করের আওতা সম্প্রসারণ, কর প্রশাসনের সংস্কার ও আদায়-প্রক্রিয়া স্বয়ংক্রিয়করণের পাশাপাশি কর অব্যাহতি ও শুল্ক-কর ছাড় আগামী তিন অর্থবছরের মধ্যে শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনার পরামর্শ দিয়েছে সংস্থাটি। এনবিআর এই প্রথম আগামী বাজেটে কর অব্যাহতি ও শুল্ক-কর ছাড় কমিয়ে রাজস্ব বাড়ানোর কৌশল নিয়েছে। এর বাইরে এনবিআরবহির্ভূত কর থেকে ১৫ হাজার কোটি টাকা এবং করবহির্ভূত অন্যান্য খাত থেকে ৪৫ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব অর্জনের কথা বলা হয়েছে।

এ ছাড়া পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ করে ৪০ লাখ টাকার বেশি মুনাফার ওপর ‘ক্যাপিটাল গেইন’ কর আরোপের সিদ্ধান্ত আসতে পারে। এ হার হতে পারে ১৫ শতাংশ। বিত্তশালীদের কাছ থেকেও বাড়তি কর আদায়ের পদক্ষেপ থাকছে বাজেটে। ব্যক্তিশ্রেণির করদাতাদের সর্বোচ্চ করহার ২৫ থেকে বাড়িয়ে ৩০ শতাংশ করা হচ্ছে। কমিউনিটি সেন্টার ভাড়া নিতে গেলেও রিটার্ন জমার সনদ বাধ্যতামূলক হতে পারে।

আইএমএফের আরও একটি বড় শর্ত অনুযায়ী, জ্বালানি ও বিদ্যুতে ভর্তুকি কমিয়ে আনতে হবে। সরকার ভর্তুকি তুলে নিতে ইতিমধ্যে জ্বালানি তেলের দাম নির্ধারণে আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সমন্বয় করছে। পাশাপাশি আগামী অর্থবছরও চারবার বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, সরকার বর্তমানে বিদ্যুতে মাসে প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দিচ্ছে। নতুন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হলে আগামী অর্থবছরের শেষের দিকে এই ভর্তুকি মাসে দুই থেকে আড়াই হাজার কোটি টাকায় নেমে আসবে। একইভাবে আগামী তিন অর্থবছরের মধ্যে এ খাতে ভর্তুকি শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনার মতো সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।

বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনায় আগামী বাজেট অনেকটা সংকোচনমূলক হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ২০১৮ সালের দ্বিতীয়ার্ধের মুদ্রানীতিতে বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি ধরা হয়েছিল ১৬ দশমিক ৮ শতাংশ। করোনা-পরবর্তী সময়ে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে উচ্চ মূল্যস্ফীতি ঠেকাতে ধারাবাহিকভাব এই ঋণ প্রবৃদ্ধি কমিয়ে চলতি বছরের জুনের জন্য ১০ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়। মূল্যস্ফীতির কারণে ঋণের সুদহারও বাজারভিত্তিক করা হয়েছে। ফলে একদিকে ঋণপ্রবৃদ্ধি কমিয়ে আনা ও অন্যদিকে সুদহার বৃদ্ধিতে ব্যবসায়ীদের জন্য ঋণ ব্যয়বহুল করা হয়েছে। এ কারণে ব্যবসা সম্প্রসারণ ও মূলধনি বিনিয়োগও কমে গেছে, যা কর্মসংস্থানে বিরূপ প্রভাব ফেলছে।  

বর্তমানে সংসদ সদস্যরা বিনা শুল্কে গাড়ি আমদানি করতে পারেন। তবে বৈষম্য কমাতে এ সুবিধা বাতিল করতে রাজি হয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। ২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে সংসদ সদস্যদের গাড়ি আমদানির ওপর ২৫ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক ও ১৫ শতাংশ কর আরোপ করা হয়েছে। পাশাপাশি হাইটেক পার্কের জন্য আমদানি করা যেসব গাড়ি আগে শুল্কমুক্ত সুবিধা পেত, সেই সব গাড়ির ওপর শুল্ক আরোপ করা হবে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত