‘গত ৩০ মার্চ থেকে ঢাকায় থাকার পর গতকাল সকালে বাড়িতে ফিরেছি। বাড়িতে ফিরেও শান্তি নেই। গ্রামের লোকজন নানান কথা শুনাচ্ছে। তাই বাড়ি থেকে বের হতে পারছি না। অন্যদিকে ঋণের চাপ তো আছেই।’ সম্প্রতি বন্ধ হওয়া শ্রমবাজার মালয়েশিয়া যেতে না পেরে গ্রামের বাড়িতে ফিরে এমন পরিস্থিতির মুখে পড়েছেন মো. সাইফুল্লাহ।
নাটোরের সিংড়া উপজেলার এ যুবক মালয়েশিয়া যাওয়ার স্থানীয় দালালকে ৬ লাখ ২০ হাজার টাকা দেন। সেই দালাল নারায়নগঞ্জের গ্রীন লাইন ওভারসিসের মাধ্যমে তাকে মালয়েশিয়া পাঠানোর আশ্বাস দেন। কিন্তু গত ৩১মে এজেন্সি তাকে টিকিট দিতে পারেনি। তাই সাইফুল্লাহ মালয়েশিয়া যাওয়ার স্বপ্নভঙ্গ হয়েছে।
ভুক্তভোগী সাইফুল্লাহ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘গত ৩১মে রাত ১২টা পর্যন্তও স্বপ্ন ছিল মালয়েশিয়া যাওয়ার। কিন্তু তা হয়নি। এখনও স্বপ্ন দেখছি। তাই গত দুইদিন যাবৎ ঢাকাতেই ছিলাম। এজেন্সির সঙ্গে কয়েক দফায় যোগাযোগ করেছি। এজেন্সি মালিক আগামী বুধবার পর্যন্ত সময় নিয়েছে। আশ্বাস দিয়েছে মালয়েশিয়া নিতে না পারলে টাকা ফেরত দিবে। তার কথার ওপর ভর করে গ্রামে ফিরেছি। তবে এই আশ্বাস কতটুকু বাস্তবায়ন হবে তা নিয়ে আমি সন্দিহান। তবে আশা রাখছি অন্তত টাকাগুলো ফেরত পাবো।
তার মতো ওই এজেন্সির অধীনে ২৪ জনের গত ৩১মে মালয়েশিয়া যাওয়ার কথা। তাদের ভিসা ও ওয়ার্ক পারমিট থাকলেও এজেন্সি শেষ পর্যন্ত টিকিট করতে পারেনি। তাই তাদের বিদেশ যাওয়া হয়নি। সরকারি হিসেবে দেশটিতে যেতে না পারা ১৬ হাজার ৯৭০ জন কর্মীরও একই অবস্থা। প্রত্যেকেই সরকারের হস্তক্ষেপের ওপর চেয়ে আছেন। তাদের চাওয়া, হয় টাকা ফেরত দেয়া হোক নয়তো বিশেষ ব্যবস্থাপনায় মালয়েশিয়া যাওয়া সুযোগ দেওয়া হোক। তবে সেটি কতটুকু সম্ভব, তা সময়েই বলে দিবে।
এদিকে মালয়েশিয়া শ্রমবাজারের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে গতকাল সংবাদ সম্মেলন করেছে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী শফিকুর রহমান চৌধুরী। তিনি বলেন, মালয়েশিয়ায় শ্রমবাজার বারবার সিন্ডিকেট বা চক্রের কারণে বন্ধ হচ্ছে। সিন্ডিকেটে সরকারের প্রভাবশালী সংসদ সদস্যদের নামও এসেছে সংবাদমাধ্যমে।
তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে প্রতিমন্ত্রী বলেন, এই তদন্তের মাধ্যমে যে বা যারা দোষী সাব্যস্ত হবেন তাদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
সিন্ডিকেটের বিষয়ে সরকারের অবস্থান জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমরা সিন্ডিকেটে বিশ্বাস করি না। আমরা চাই, আমাদের আড়াই হাজার এজেন্ট আছে, তাদের মাধ্যমে কর্মীরা বিদেশ যাক।’
প্রতিমন্ত্রী আরও বলেন, ইতিমধ্যে ৪ লাখ ৭৬ হাজার ৬৭২ কর্মী মালয়েশিয়া গেছেন। ১৬ হাজার ৯৭০ জন যেতে পারেননি। তবে বায়রার কাছে লিস্ট চাওয়া হলেও তারা দেয়নি।
এ বিষয়ে ছয় সদস্যের তদন্ত কমিটি করা হয়েছে জানিয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, সাত দিনের মধ্যে কমিটি প্রতিবেদন দেবে। কমিটিতে অতিরিক্ত সচিব নূর মোহাম্মদ মাহবুবকে প্রধান করা হয়েছে। যারা দোষী হবে তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে শ্রমবাজার চালুর বিষয়ে আমরা আশাবাদী।
এদিকে মালয়েশিয়া যেতে না পারা শ্রমিকদের নিয়ে বাংলাদেশ এসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং এজেন্সীজ (বায়রা) যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মো. ফখরুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, এর দায়ভার অবশ্যই ওই ১০০ রিক্রুটিং এজেন্সিকে নিতে হবে। এর জন্য সব এজেন্সি দায়ী হবে না। তবে ওই ১০০ এজেন্সির বাইরে কোন এজেন্সি টাকা নিলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আমরা চাই যতদ্রুত সম্ভব ক্ষতিগ্রস্থ কর্মীদের সকল টাকা ফেরত দেওয়া হোক। নয়তো মালয়েশিয়া সরকারের সঙ্গে কথা বলে বিশেষ ব্যবস্থায় তাদের পাঠানো হোক।
