টানা চতুর্থবার ক্ষমতায় আসা আওয়ামী লীগ সরকারের এই মেয়াদের প্রথম বাজেট আজ সংসদে উপস্থাপন করা হবে। যে সময়ে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন বিদেশি মুদ্রার, ঠিক সেই সময়ে দুঃসংবাদ এলো রপ্তানি আয়ে। আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় মে মাসে রপ্তানি কমেছে ১৬ শতাংশ। গ্যাস, বিদ্যুৎ না পাওয়ায় মোট দেশজ উৎপাদনে শিল্পের প্রবৃদ্ধিও কমে যাচ্ছে।
রপ্তানিকারকরা বলছেন, ন্যূনতম মজুরি বৃদ্ধি, বিদ্যুৎ-গ্যাস-পরিবহন খরচ বৃদ্ধি, ব্যাংক সুদ সিঙ্গেল ডিজিট থেকে ১৪-১৫ শতাংশ হওয়া এবং এই সংকটময় সময়ে নগদ সহায়তা কমিয়ে আনার ফলে শিল্প প্রতিযোগিতা সক্ষমতার দিক থেকে পিছিয়ে পড়ছে। গতকাল বুধবার রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) প্রকাশিত মাসিক হালনাগাদ প্রতিবেদনে দেখা যায়, মে মাসে রপ্তানি আয় কমেছে ১৬ শতাংশ। পণ্য রপ্তানি থেকে মে মাসে আয় হয়েছে ৪ দশমিক শূন্য ৭ বিলিয়ন ডলার, যা গত বছরের এ সময়ের তুলনায় ১৬ দশমিক শূন্য ৬ শতাংশ কম। গত বছর মে মাসে আয় হয়েছিল ৪ দশমিক ৮৪ বিলিয়ন ডলার। মূলত তৈরি পোশাকের রপ্তানি কমে যাওয়ায় সদ্য শেষ হওয়া মে মাসে রপ্তানি আয় ব্যাপক হারে কমে গেছে। গত এপ্রিল থেকেই রপ্তানি আয় কমতে শুরু করেছে।
অবশ্য টানা দুই মাস রপ্তানি আয় কমলেও চলতি অর্থবছরের জুলাই-মে পর্যন্ত ১১ মাসে সামান্য হলেও প্রবৃদ্ধি ধরে রেখেছে বাংলাদেশ। এ সময় পর্যন্ত রপ্তানি আয় বেড়েছে ২ শতাংশ। পণ্য রপ্তানি থেকে আয় হয়েছে ৫১ দশমিক ৫৪ বিলিয়ন ডলার, যা গত বছরের একই সময়ে ছিল ৫০ দশমিক ৫২ বিলিয়ন ডলার।
রপ্তানি কমার কারণ হিসেবে বাংলাদেশ তৈরি পোশাক উৎপাদনকারী ও রপ্তানিকারক সমিতির সভাপতি এসএম মান্নান কচি বলেন, সম্প্রতি বিশ্ব অর্থনীতিতে মূল্যস্ফীতি এবং তা নিয়ন্ত্রণে সুদহার বৃদ্ধির ফলে ভোক্তাদের ক্রয়ক্ষমতা কমে এসেছে, ফলে পোশাকের খুচরা বিক্রি ও আমদানি কমেছে। চলতি বছরের জানুয়ারি-মার্চ সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের বৈশি^ক পোশাক আমদানি কমেছে ৭ দশমিক ১৮ শতাংশ এবং ইউরোপের কমেছে ১২ দশমিক ৮৪ শতাংশ। পাশাপাশি চলতি অর্থবছরের মার্চ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপে বাংলাদেশের প্রধান পণ্যের দরপতন হয়েছে ৮ থেকে ১৮ শতাংশ। রপ্তানি কমে যাওয়ার এগুলোই অন্যতম কারণ।
এ ব্যবসায়ী নেতা বলেন, শিল্প প্রতিযোগিতা সক্ষমতার দিক থেকে যে পিছিয়ে পড়ছে, তার কিছুটা প্রতিফলন রপ্তানি প্রবৃদ্ধিতে ফুটে উঠেছে।
মে মাসে রপ্তানি কমে যাওয়ায় চলতি অর্থবছরের ১১ মাসে সামগ্রিকভাবে পণ্য রপ্তানি প্রবৃদ্ধির হারও কমে গেছে। এপ্রিলের শেষে পণ্য রপ্তানিতে প্রবৃদ্ধি ছিল ৩ দশমিক ৯৩ শতাংশ। মে শেষে সামগ্রিক পণ্য রপ্তানিতে প্রবৃদ্ধি ২ দশমিক শূন্য ১ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।
ইপিবির তথ্যে দেখা যায়, চলতি অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসে (জুলাই থেকে মে) ৫ হাজার ১৫৪ কোটি ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়েছে। গত অর্থবছরের একই সময়ে রপ্তানি হয়েছিল ৫ হাজার ৫৩ কোটি ডলারের পণ্য।
ইপিবির তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, চলতি অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসে তৈরি পোশাক, কৃষি প্রক্রিয়াজাত পণ্য, প্লাস্টিক পণ্য ও চামড়াবিহীন জুতা রপ্তানি বাড়লেও চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, পাট ও পাটজাত পণ্য, হোম টেক্সটাইল, হিমায়িত খাদ্য, আসবাব, বাইসাইকেলসহ বিভিন্ন পণ্যের রপ্তানি কমে গেছে।
চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে মে পর্যন্ত ১১ মাসে মোট পণ্য রপ্তানির ৮৫ শতাংশ আয় তৈরি পোশাক খাত থেকে এসেছে। এ সময় ৪ হাজার ৩৮৫ কোটি ডলারের তৈরি পোশাক রপ্তানি হয়েছে। এই রপ্তানি গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ২ দশমিক ৮৬ শতাংশ বেড়েছে।
তৈরি পোশাকের পর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ পণ্য রপ্তানি আয় চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য খাত থেকে এসেছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসে ৯৬ কোটি ডলারের চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য রপ্তানি হয়েছে। এই রপ্তানি গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ১৪ দশমিক ১৭ শতাংশ কম।
শিল্প খাত সংকটে আছে জানিয়ে ব্যবসায়ী নেতা কচি বলেন, ‘পোশাক খাতকে নিত্যনতুন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে টিকে থাকতে হচ্ছে। আমরা একদিকে এনবিআর, বন্দর ও ব্যাংকিং-সংক্রান্ত জটিলতা মোকাবিলা করছি। অন্যদিকে শিল্পাঞ্চলের বাইরে নতুন কোনো কারখানায় গ্যাস-বিদ্যুৎ সংযোগ ও ব্যাংকঋণ না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার, যা আমরা প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছি।’ এ ধরনের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন হলে বিনিয়োগ ও রপ্তানি আরও বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে বলে তিনি জানান।
তথ্যবিশ্লেষণে দেখা যায়, অর্থবছরের ১১ মাসে পোশাক রপ্তানি প্রবৃদ্ধি ২ দশমিক ৮৬ শতাংশে নেমে এসেছে। এ সময় পোশাক রপ্তানি দাঁড়িয়েছে ৪৩ দশমিক ৮৫ বিলিয়ন ডলার। ২০২২-২৩ অর্থবছরের একই সময় রপ্তানি ছিল ৪২ দশমিক ৬৩ বিলিয়ন ডলার এবং প্রবৃদ্ধি ছিল ১০ দশমিক ৬৭ শতাংশ।
মূলত, এপ্রিল ও মে মাসে রপ্তানি একটানা কমে যাওয়ার ফলে ১১ মাসের গড় রপ্তানিতে মন্দাভাব সুস্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে। এ সময়ে পোশাক রপ্তানি লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় ৭ দশমিক ৬৩ শতাংশ পিছিয়ে পড়েছে। মে মাসে নিটওয়্যার পণ্যের প্রবৃদ্ধি ২০ দশমিক ৭৫ শতাংশ কমেছে এবং ওভেন পোশাক রপ্তানি ১২ দশমিক ৪৮ শতাংশ কমেছে।
