বহু বছর আগে একমাত্র ছেলে সন্তান হারিয়েছেন চা বিক্রেতা মফিজ উদ্দীন (৭০)। অভাব অনটনের সংসার আলো করে আরও কয়েকটি সন্তান আসলেও জন্মের পরপরই মারা যায়। একমাত্র কন্যা সন্তানকে নিয়ে অভাব অনটনে চলছে এই বৃদ্ধ দম্পতির সংসার। সহায়সম্বল ও আয়ের একমাত্র অবলম্বন বাজারে একটি খুপরি চায়ের দোকান। সেখানে চা-বিস্কুট বিক্রি করে কোনো মতে জীবন চলছিল এই বৃদ্ধের। তবে এবার তাতে নজর পড়েছে আওয়ামী লীগ নেতা ও বাজার কমিটির সভাপতির। নানা ভাবে ভয়ভীতি দেখিয়ে তা দখলে নিতে চেষ্টা করেন তিনি। তাতে ব্যার্থ হয়ে সবশেষ জোর করে সেই চায়ের দোকানে তালা ঝুলিয়ে দখল করে নিয়েছেন বৃদ্ধ দম্পতির শেষ সম্বল। এ ঘটনা গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার গোসিংগা ইউনিয়নের গোসিংগা বাজারের মাছ মহল এলাকার।
সোমবার (৩ জুন) দুপুরে সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, মফিজ উদ্দীনের চায়ের দোকানে তালা ঝুলছে। দোকানের পাশেই মফিজ ও তার স্ত্রী দাঁড়িয়ে আছেন। এ সময় অনেকের কাছে এ বিষয়ে সহযোগিতাও চান তারা। তবে কেউ তাদের সহযোগিতা করতে এগিয়ে আসেনি। আজ বৃহস্পতিবার সকাল পর্যন্তও বৃদ্ধের দোকানে তালা ঝুলছিল। অভিযুক্ত আওয়ামী লীগ নেতা প্রভাবশালী হওয়ায় কেউ ভয়ে মফিজ উদ্দীনকে সহায়তা করতে এগিয়ে আসছেন না। নিজের আয়ের শেষ সম্বল চা দোকানটি ফিরে পেতে নিরুপায় বৃদ্ধ মফিজ উদ্দীন ও তার স্ত্রী সবার দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন। এ ঘটনায় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও থানায় অভিযোগ দিয়ে কোন সহায়তা পাননি অসহায় এই দম্পতি।
জানা গেছে, ভুক্তভোগী মফিজ উদ্দীন পাশের খিলপাড়া গ্রামের মৃত সুবেদ আলীর ছেলে। অন্তত ১২ বছর ধরে তিনি এ চায়ের দোকানটি চালাচ্ছেন। অভিযুক্ত বাজার কমিটির সভাপতি ও আওয়ামী লীগ নেতার নাম বোরহান উদ্দীন মোড়ল। তিনি গোসিংগা গ্রামের আলফাজ উদ্দীন মোড়লের ছেলে। তিনি গোসিংগা ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সদস্য ও বাজারের ব্যবসায়ী।
গত সোমবার ভুক্তভোগী মফিজ উদ্দীন দেশ রূপান্তরকে বলেন, এক সপ্তাহ আগে বোরহান মোড়ল ও তার লোকজন এসে আমাকে দোকান ছাড়তে বলে। এক সময় তার সাথে বাকবিতণ্ডা হয়। পরে বোরহান মোড়ল একটি তালা কিনে এনে সবার সামনেই জোর করে আমাকে বের করে দিয়ে চা স্টলে তালা ঝুলিয়ে আমাদের তাড়িয়ে দেয়।
মফিজের স্ত্রী ফজিলা খাতুন বলেন আমরা অনেকের কাছে সাহায্য চেয়েছি। সবাই ভয় পায় সভাপতিকে। আমরা গরীব বলে কেউ এগিয়ে আসছে না। নিরুপায় হয়ে ইউএনও স্যারের কাছে বিচার চেয়েছি। ইউএনও স্যার যদি আল্লাহর রহমতে আমাদের রক্ষা করে তাহলে কিছু খেয়ে বাঁচতে পারবো। আমাদের আর কোনো ব্যবস্থা নাই বেঁচে থাকার অবলম্বন হিসাবে। সরকারি খাস জমিতে একটা পলি-মোড়ানো ছাপরা ঘরে আমাদের বসবাস আর এই দোকানটি আয়ের একমাত্র অবলম্বন।
বাজারের একাধিক ব্যবসায়ী জানান, মফিজ উদ্দীন এখানে চায়ের দোকান দেওয়ার আগে এখানে মানুষ মল-মূত্র ত্যাগ করতো। পরে মফিজ এখানে একটা খুপরি ঘর করে চায়ের দোকান দেন। তিনি অন্তত ১২ বছর ধরে এখানে চা বিক্রি করে আসছেন।
তারা আরও বলেন, আশপাশে খাস জায়গায় বিল্ডিং করে ভাড়া দেওয়া হচ্ছে আর মফিজের দোকানের জন্য মার্কেট পজিশন নষ্ট হচ্ছে বলেই জোর করে মফিজকে বের করে দিয়ে তাঁর দোকান দখল করেছে বাজার কমিটির সভাপতি।
তাদের দাবি, সভাপতি বোরহান মোড়ল এ পজিশনটি তার এক বন্ধুর কাছে বিক্রি করে মোটা অঙ্কের টাকা নিতে চাচ্ছে। কিন্তু মফিজ তার নিজস্ব পজিশন না ছাড়ায় জোর করে দখল করেছে সভাপতি। তারা আরও বলেন এখন প্রায় সময় চা দোকানি মফিজ ও তার স্ত্রী দোকানের পাশে এসে দাঁড়িয়ে থাকে আর সবার কাছে সাহায্য চায়। কিন্তু কেউ তাদের সাহায্য করতে পারে না। তারাও অসহায়ের মত দোকানের পাশে দাঁড়িয়ে থেকে থেকে চলে যায়। পর দিন আবার আসেন।
বাজার কমিটির সভাপতি অভিযুক্ত বোরহান উদ্দীন মোড়ল মফিজের দোকানে তালা দেওয়ার বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, পরিস্থিতি এমনই ছিল, তালা ঝুলিয়ে দেওয়ার মতো। এ সময় বাজার কমিটির সম্পাদকও ছিল। এ দোকানের আরও দাবিদার আছে। তিনি দখলের অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, সময়মত দোকান বুঝিয়ে দেওয়া হবে মফিজকে।
গোসিংগা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সাইদুর রহমান শাহীন বলেন, আমরা স্থানীয় ভাবে বিষয়টি সমাধানের চেষ্টা করছি। ইউএনও স্যার বিষয়টি সমাধানের জন্য তাগিদ দিয়েছেন।
অভিযোগের তদন্ত অফিসার এসআই আশরাফুল আলম বলেন, একটা অভিযোগ আমরা পেয়েছি। ঘটনাস্থলে পুলিশ গিয়েছিল। বাজার কমিটি দায়িত্ব নিয়ে সমাধান করবে বলেছে।
শ্রীপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শোভন রাংসা বলেন, বৃদ্ধ এক দম্পতি আমার কাছে অভিযোগ নিয়ে এসেছিলেন। পরে এ বিষয়টি স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যানকে বলা হয়েছে সমাধান করে দিতে। আশা করি একটা সমাধান হবে।
