শনিবার, ১৫ জুন ২০২৪, ১ আষাঢ় ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

বিনিয়োগ কমার শঙ্কা আছে : এফবিসিসিআই

আপডেট : ০৯ জুন ২০২৪, ০২:২৮ এএম

নতুন অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের জন্য সরকারকে অভিনন্দন জানালেও ঘাটতি অর্থায়নের উৎস ব্যবসায়ীদের মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রস্তাবিত বাজেট অনুযায়ী, ঘাটতি মেটাতে সরকার ব্যাংক থেকে ১ লাখ ৩৫ হাজার ৫০০ কোটি টাকা ঋণ নেবে। দেশের শীর্ষ ব্যবসায়ীক সংগঠন ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বার্স অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এফবিসিসিআই) মনে করছে, সরকারের অধিক মাত্রার ঋণের কারণে বেসরকারি খাতের ঋণে বাধা সৃষ্টি হবে। তাতে বেসরকারি বিনিয়োগ কমে যাবে, যার বিরূপ প্রভাব পড়বে কর্মসংস্থানে। গতকাল শনিবার রাজধানীর মতিঝিলে এফবিসিসিআই আইকন ভবনে ২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের বিষয়ে প্রতিক্রিয়া জানাতে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে এফবিসিসিআই সভাপতি মাহবুবুল আলম এমন অভিমত প্রকাশ করেন।

লিখিত বক্তব্যে তিনি বলেন, বাজেট ঘাটতি মেটাতে স্থানীয় ব্যাংক ব্যবস্থার পরিবর্তে যথাসম্ভব সুলভ সুদে ও সতর্কতার সঙ্গে বিদেশি উৎস থেকে অর্থায়নের ওপর নজর দেওয়া যেতে পারে। তবে নিত্যপণ্য, চিকিৎসাসেবা, আইটি খাতসহ বাজেটের নানা ইতিবাচক সিদ্ধান্তগুলোকে স্বাগত জানিয়ে সরকারকে ধন্যবাদ জানান তিনি।

এফবিসিসিআই সভাপতি বলেন, আগামী অর্থবছরের জন্য ৭ লাখ ৯৭ হাজার কোটি টাকার বাজেট ঘোষণা করা হয়েছে। বিশ্ব অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে বিভিন্ন সংকটের মধ্যেও উন্নয়ন, জনকল্যাণ ও ব্যবসাবান্ধব বাজেট দিয়েছে সরকার। এফবিসিসিআই মনে করে, এ বাজেট বাস্তবসম্মত ও বাস্তবায়নযোগ্য।

তবে এফবিসিসিআই সভাপতি বাজেটকে বাস্তবায়নযোগ্য বললেও তার লিখিত বক্তব্য ও সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবের বেশিরভাগ আলোচনা ছিল বাজেটের নানা চ্যালেঞ্জ নিয়ে। তার মতে, বাজেট বাস্তবায়নের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার জন্য দরকার সুশাসন ও যথাযথ তদারকি। এ ছাড়া দক্ষতা, স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং তদারকির মান ক্রমাগতভাবে উন্নয়নের জন্য সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা ও পরিকল্পনা নিশ্চিত করা জরুরি। পাশাপাশি আরও জোরদার করতে হবে সরকারি এবং বেসরকারি খাতের অংশীদারত্ব।

মাহবুবুল আলম বলেন, বাজেটে জিডিপির প্রবৃদ্ধি ধরা হয়েছে ৬ দশমিক ৭৫ শতাংশ এবং মূল্যস্ফীতির লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৬ দশমিক ৫ শতাংশ। চলতি অর্থবছরের জন্যও বাজেটে মূল্যস্ফীতির লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৬ দশমিক ৫ শতাংশ। কিন্তু গত মে মাসে মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ৮৯ শতাংশ। মূল্যস্ফীতি কমিয়ে লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা বিশাল চ্যালেঞ্জ হবে। মূল্যস্ফীতির লাগাম টানতেই হবে। তা না হলে সাধারণ মানুষের কষ্ট ও ভোগান্তি বাড়বে।

এ বিষয়ে আরও ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, ভূরাজনৈতিক ও পারিপার্শ্বিক কারণে দেশের অর্থনীতিতে এমনিতেই বিরূপ প্রভাব দেখা যাচ্ছে। বিশেষ করে বৈদেশিক মুদ্রার উচ্চ বিনিময় হার, ঋণের সুদহার, মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ প্রভৃতি। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে বাজেট বাস্তবায়নে সর্বাত্মক চেষ্টা করতে হবে। প্রস্তাবিত বাজেটে মোট রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৫ লাখ ৪১ হাজার কোটি টাকা, যা জিডিপির ৯ দশমিক ৭ শতাংশ। রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য ধরা হয়েছে ৪ লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকা। অন্যান্য খাত থেকে আসবে ৬৫ হাজার ৪০০ কোটি টাকা। বিশাল অঙ্কের এই রাজস্ব সংগ্রহ করা সরকারের জন্য বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ হবে। এমনিতেই দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির সূচকসহ রাজস্ব আহরণ প্রক্রিয়া বিশ্বব্যাপী বিরাজমান কঠিন পরিস্থিতির কারণে চাপের মুখে।

তবে রাজস্ব আদায়ে ব্যবসা-বাণিজ্যবান্ধব রাজস্ব ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সংস্কার জরুরি। সেই সঙ্গে ট্যাক্স-জিডিপি অনুপাত বাড়াতে করের আওতা বাড়ানো এবং উপজেলা পর্যন্ত কর অফিস বিস্তৃত করার পরামর্শ দেন এই ব্যবসায়ী নেতা।

জীবনযাত্রার ব্যয় ও মূল্যস্ফীতি বিবেচনায় নিয়ে ব্যক্তি খাতে করমুক্ত আয়সীমা সাড়ে ৪ লাখ টাকা নির্ধারণের জন্য আবারও দাবি জানিয়েছেন এফবিসিসিআই সভাপতি।

অগ্রীম আয়কর এবং আমদানি পর্যায়ে অগ্রীম কর ব্যবসার খরচ বাড়াচ্ছে উল্লেখ করে মাহবুবল আলম বলেন, এ দুটি কর বিলুপ্ত করার জন্য অনুরোধ করেছিল এফবিসিসিআই। কিন্তু করা হয়নি। অগ্রীম আয়কর যথাযথভাবে সমন্বয় না হওয়ায় ব্যবসায় পরিচালন ব্যয় বাড়ে এবং চলতি মূলধনে প্রভাব পড়ে। তাই বিষয়টি পুনর্বিবেচনার অনুরোধ করেন তিনি। একই সঙ্গে রপ্তানি বাজার ধরে রাখতে রপ্তনিতে উৎসে কর ১ শতাংশ থেকে কমিয়ে শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ নির্ধারণের আহ্বান জানান শীর্ষ এই ব্যবসায়ী নেতা।

কর কর্মকর্তাদের কর ফাঁকি বের করতে পুরস্কৃত করা হয়। এর ফলে আইনের অপপ্রয়োগ হয় বলে অভিযোগ এফবিসিসিআই সভাপতির। তিনি বলেন, কর্মকর্তাদের স্বেচ্ছা ক্ষমতা কমানোর জন্য পুরস্কার প্রথা বাতিল করে বিকল্প প্রণোদনার ব্যবস্থা করা যায়। রাজস্ব-সংক্রান্ত মামলা নিষ্পত্তি ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে এডিআর পদ্ধতি চালু করার পাশাপাশি কর ন্যায়পাল নিয়োগের বিষয়টি বিবেচনা করার পরামর্শ দেন তিনি। পাশাপাশি কর আপিলাত ট্রাইব্যুনাল নিরপেক্ষ ও স্বাধীন করা এবং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার জন্য বিচার বিভাগীয় সদস্যকে ট্রাইব্যুনালের প্রেসিডেন্ট করার আবেদনটি বিবেচনার জন্য আবারও সরকারকে অনুরোধ করেন এফবিসিসিআই সভাপতি।

১৫ শতাংশ কর দিয়ে কালো টাকা সাদা করার বিষয়ে তিনি বলেন, অনেকেই বৈধ আয়ের কর না দেওয়ায় তা কালো টাকার আওতায় পড়ে গেছে। সেসব অর্থ কর দিয়ে বৈধ করার সুযোগ দেওয়া হয়েছে বাজেটে। কিন্তু অবৈধ উপায়ে অর্জিত অর্থ কর দিয়ে সাদা করা যাবে এমন সিদ্ধান্ত ভালো ব্যবসায়ীরা প্রত্যাশা করেন না। তাই কর দিয়ে অবৈধ অর্থ সাদা করার বিষয়ে সংশোধন করা দরকার।

অর্থনৈতিক অঞ্চল (ইজেড) সংক্রান্ত এক প্রশ্নের জবাবে এফবিসিসিআই সভাপতি বলেন, ইজেড হাইটেক পার্কে কারখানার মূলধনী যন্ত্রপাতি ও নির্মাণ সামগ্রী আমদানিতে এত দিন কোনো শুল্ক ছিল না। বাজেটে নতুন করে ১ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হয়েছে। এতে বিদেশি বিনিয়োগ কমে যাবে। তাই শূন্য শুল্কের সুবিধা আরও অন্তত পাঁচ বছর রাখতে হবে।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত