মঙ্গলবার, ২৫ জুন ২০২৪, ১১ আষাঢ় ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

তৃতীয় যাত্রায় শরিকনির্ভর প্রধানমন্ত্রী মোদি

আপডেট : ১০ জুন ২০২৪, ০১:৫১ এএম

টানা তৃতীয়বারের মতো ভারতের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিলেন নরেন্দ্র মোদি। গতকাল রবিবার সন্ধ্যা সোয়া ৭টায় শপথগ্রহণ করেন তিনি। শপথবাক্য পাঠ করান রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মু। তিনি ভারতের দ্বিতীয় প্রধানমন্ত্রী যিনি পরপর তিন মেয়াদে প্রধানমন্ত্রী হলেন। এর আগে কংগ্রেস নেতা জওহরলাল নেহরু টানা তিন মেয়াদে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন।

শপথগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয় রাষ্ট্রপতি ভবন প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে। রাষ্ট্রপতি এর আগে নরেন্দ্র মোদি ও ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) অন্য নেতাদের নতুন সরকার গঠনের আমন্ত্রণ জানান। মোদির পরই শপথ নিয়েছেন রাজনাথ সিং। পাশাপাশি তার মন্ত্রিপরিষদের আরও কয়েকজন সদস্য।

অনুষ্ঠানে হাজির হয়েছেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও শ্রীলঙ্কা, মালদ্বীপ, ভুটানসহ বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রনেতারা। কেবল বিদেশিই নয়, ভারতের রাজনৈতিক নেতা, অভিনেতা ও বিভিন্ন সেক্টরের বিশিষ্টজনদের আমন্ত্রণ জানানো হয় শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানে।

এর মধ্যে রয়েছেন কংগ্রেস প্রেসিডেন্ট মল্লিকার্জুন খাড়গে। তবে পশ্চিমবঙ্গের তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী মমতা ব্যানার্জি অনুষ্ঠানে যাননি।

মোদির শপথগ্রহণের অনুষ্ঠান উপলক্ষে সাজ সাজ রব ছিল দিল্লিতে। কড়া নিরাপত্তার চাদরে মুড়ে ফেলা হয় রাজধানী। তিন স্তরের নিরাপত্তা বলয়ের ব্যবস্থা নেয় দিল্লি পুলিশ। শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানের কারণে দিল্লির আকাশসীমাতেও কড়াকড়ি আরোপ করা হয়।

শপথের আগে সকালে মোদি গিয়েছিলেন রাজঘাটে। মহাত্মা গান্ধীর স্মৃতিসৌধের সামনে গিয়ে শ্রদ্ধাজ্ঞাপন করেন তিনি। সাবেক প্রধানমন্ত্রী অটলবিহারী বাজপেয়ির সৌধ ‘সদৈব অটল’-এর কাছেও গিয়ে শ্রদ্ধাজ্ঞাপন করেছেন।

এবারের লোকসভা নির্বাচনে ২৯২টি আসনে জয় পেয়েছে বিজেপির নেতৃত্বাধীন এনডিএ জোট। বিরোধী জোট ‘ইনডিয়া’ পেয়েছে ২৩৩টি আসন। সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে এনডিএ সরকার গঠন করলেও একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়নি বিজেপি। ফলে তারা চাপে রয়েছে।

সরকার গঠনের ক্ষেত্রে বিজেপিকে শরিক দলগুলোর ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। এনডিএ শরিকরা মোদিকেই প্রধানমন্ত্রী হিসেবে বেছে নিয়েছে।

শপথ নেওয়ার আগে রাষ্ট্রপতির সঙ্গে বৈঠকের পর মোদি বলেছিলেন, ‘আজ সকালে এনডিএ জোটের সব শরিক আমাকে নেতা হিসেবে বেছে নিয়েছে এবং রাষ্ট্রপতিকে তা জানিয়েছে। রাষ্ট্রপতি এরপর আমাকে ডেকেছেন এবং প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দিয়েছেন। তারপরই আমি সন্ধ্যায় শপথগ্রহণের সিদ্ধান্ত রাষ্ট্রপতিকে জানিয়েছি।’

এনডিএকে জয়যুক্ত করার জন্য জনগণকে ধন্যবাদ জানিয়ে মোদি বলেন, ‘এনডিএকে তৃতীয়বারের মতো দেশের সেবা করার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। আমাদের এই সুযোগ দেওয়ার জন্য আমি দেশের মানুষকে ধন্যবাদ জানাতে চাই আমি এও বলতে চাই, গত দুই মেয়াদে দেশ যে গতিতে উন্নতি করেছে এবারও আমরা একই গতিতে, একই দিশায় কাজ করে যাব।’

মন্ত্রিসভায় কারা থাকছেন : মোদির তৃতীয় মেয়াদের সরকারের পুরনোরা যেমন থাকছেন, আবার কেউ কেউ বাদও পড়ছেন। এবার মোদির দল বিজেপি জোটের শরিক, বিশেষ করে টিডিপি ও জেডিইউর ওপর নির্ভর করেই সরকার গড়ছে। কারণ এবার এককভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়নি বিজেপি। বিজেপির এনডিএ জোটের শরিক দলগুলোকে কোন কোন মন্ত্রণালয় দেওয়া হচ্ছে সেদিকে সবার নজর।

বিজেপি সূত্রের বরাত দিয়ে আনন্দবাজার অনলাইন জানিয়েছে, স্বরাষ্ট্র, প্রতিরক্ষা, অর্থ, শিক্ষা ও সংস্কৃতির মতো গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়গুলো নিজেদের হাতেই রাখছে তারা। অন্য গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়গুলোর মধ্যে শরিক দল চন্দ্রবাবু নাইডুর টিডিপি, নিতিশ কুমারের জেডিইউ, চিরাগ পাসোয়ানের এলজেপি (আর), একনাথ শিন্ডের শিবসেনা, এইচডি দেবগৌড়ার জেডিএস ও জয়ন্ত্র চৌধুরীর আরএলপির মধ্যে।

গতকাল শপথের আগে মোদি তার লোককল্যাণ মার্গের বাড়িতে এনডিএর বেশ কয়েকজন সংসদ সদস্যকে চা-চক্রে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। মনে করা হচ্ছে, মোদির ডাক পাওয়া এ সংসদ সদস্যরা প্রায় প্রত্যেকেই মন্ত্রিসভায় ঠাঁই পেতে চলেছেন।

বিজেপি সূত্রে খবর, বিদায়ী মন্ত্রিসভার মতোই নতুন মন্ত্রিসভায় থাকতে পারেন বিজেপির রাজনাথ সিংহ, অমিত শাহ, নির্মলা সীতারমন, পীযূষ গয়াল, এস জয়শঙ্কর। চা-চক্রে হাজির ছিলেন বিজেপি সভাপতি জেপি নড্ডা। যা দেখে অনেকেরই অনুমান, সাংগঠনিক দায়িত্ব থেকে ফের তাকে মন্ত্রিসভায় আনা হচ্ছে। মন্ত্রী হওয়ার দৌড়ে রয়েছেন তিন প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী, মধ্যপ্রদেশের শিবরাজ সিংহ চৌহান, হরিয়ানার মনোহরলাল খট্টর এবং কর্ণাটকের বাসবরাজ বোম্মাই। তিনজনেই চা-চক্রে হাজির ছিলেন। চন্দ্রবাবুর দল থেকে পূর্ণমন্ত্রী হতে পারেন কে রামমোহন নাইডু এবং চন্দ্রশেখর পেম্মাসানি। নিতিশের দল থেকে মন্ত্রী হতে পারেন লাল্লন সিংহ এবং সঞ্জয় ঝায়ের মধ্যে যেকোনো একজন। মন্ত্রী হতে পারেন জেডিইউর রাজ্যসভার সদস্য রামনাথ ঠাকুর। এলজেপি থেকে মন্ত্রী হতে পারেন প্রয়াত রামবিলাস পাসোয়ানের ছেলে চিরাগ।

‘ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’ বিজেপি সূত্রকে উদ্ধৃত করে একটি প্রতিবেদনে জানিয়েছে, একটি পূর্ণমন্ত্রী এবং একটি প্রতিমন্ত্রীর পদ পেতে চলেছে চন্দ্রবাবুর দল। শিবসেনার (শিন্ডে) প্রতাপরাও যাদব পূর্ণমন্ত্রী হতে চলেছেন। জেডিএস থেকে মন্ত্রী হতে পারেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী দেবগৌড়ার ছেলে এইচডি কুমারস্বামী। এ ছাড়াও এনডিএর ছোট শরিক দলগুলোর মধ্যে হিন্দুস্তান আওয়াম মোর্চার (হাম) জিতনরাম মাঝি, রিপাবলিক পার্টি অব ইন্ডিয়ার (আরপিআই-এ) রামদাস অঠওয়ালে, আজসুর চন্দ্রশেখর চৌধুরী পূর্ণমন্ত্রী হতে পারেন।

বিজেপির যারা এই মন্ত্রিসভায় ঠাঁই পেতে পারেন, তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন অসমের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী তথা কেন্দ্রীয় মন্ত্রী সর্বানন্দ সোনোয়াল, কেরলের একমাত্র বিজেপি সংসদ সদস্য সুরেশ গোপী, নিতিন গডকডী, ধর্মেন্দ্র প্রধান, প্রহ্লাদ জোশী, অশ্বিনী বৈষ্ণব, জ্যোতিরাদিত্য শিন্ডে, কিরেন রিজিজু, গিরিরাজ সিংহ, জিতিন প্রসাদ।

এবার ভোটে হেরেও মোদি মন্ত্রিসভার সদস্য হতে পারেন তামিলনাড়ুর বিজেপি সভাপতি কে আন্নামালাই। তাকে প্রতিমন্ত্রী করা হতে পারে। বিদায়ী মোদি মন্ত্রিসভায় ছিলেন পশ্চিমবঙ্গের চারজন। নিশীথ প্রামাণিক (স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী), শান্তনু ঠাকুর (জাহাজ প্রতিমন্ত্রী), জন বার্লা (সংখ্যালঘুবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী) ও সুভাষ সরকার (শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী)। এবার অবশ্য বিজেপির আসনসংখ্যা ১৮ থেকে কমে ১২ হয়েছে। হেরেছেন সুভাষ, নিশীথ। আর বার্লা টিকিটই পাননি। মন্ত্রিসভাতেও কমছে বাংলার প্রতিনিধিত্ব। প্রাথমিকভাবে জানা গেছে, বিজেপি রাজ্য সভাপতি বালুরঘাটের সংসদ সদস্য সুকান্ত মজুমদার এবং বনগাঁর সংসদ সদস্য শান্তনু ঠাকুর প্রতিমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিতে চলেছেন। দুজনই মোদির বাসভবনে হওয়া চা-চক্রে যোগ দেওয়ার আমন্ত্রণ পেয়েছিলেন।

এনডিটিভি জানিয়েছে, এবার মন্ত্রিসভা থেকে বাদ পড়তে পারেন গতবার উত্তর প্রদেশের আমেথি আসনে কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধীকে হারানো স্মৃতি ইরানি। তিনি এবার একই আসনে কংগ্রেস প্রার্থী কিশোরীলাল শর্মার কাছে ১ লাখ ৫০ হাজার ভোটে হেরে গেছেন। স্মৃতি ইরানি বিজেপির গত সরকারে নারী ও শিশু উন্নয়নমন্ত্রী ছিলেন। তবে হিমাচল থেকে জিতেও মন্ত্রিসভায় ঠাঁই পাচ্ছেন না অনুরাগ ঠাকুর। তিনি গতবার ক্রীড়া, তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে ছিলেন। বাদ পড়াদের তালিকায় থাকতে পারেন গতবারের আরেক মন্ত্রী নারায়ণ রানে। তিনি ছিলেন ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি উদ্যোগবিষয়ক মন্ত্রী।

   
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত