শনিবার, ১৫ জুন ২০২৪, ১ আষাঢ় ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

এবারের মার্কিন নির্বাচন সম্পূর্ণ আলাদা কিছু

আপডেট : ১১ জুন ২০২৪, ১২:৩০ এএম

আমেরিকার ইতিহাসে প্রথমবারের মতো আসামি হওয়া একজন সাবেক প্রেসিডেন্টের বিচারের মধ্যে পুরো বিষয়টি সীমাবদ্ধ থাকছে না। এর বাইরে ফৌজদারি মামলা হিসেবেও এর আলাদা গুরুত্ব আছে। এই লড়াইয়ের এক পক্ষে আছে আইনের একটি উদার গণতান্ত্রিক ধারণা। অন্য পক্ষে আছে এমন একটি অনুদার ধারণা, যা বিদ্যমান আইনি ব্যবস্থার বাইরে একটি একগুঁয়ে কর্র্তৃত্বের প্রতিনিধিত্ব করে। ট্রাম্পের সঙ্গে যৌন সম্পর্কের বিষয়ে মুখ না খোলার জন্য পর্নো অভিনেত্রী স্টর্মি ড্যানিয়েলসকে ট্রাম্পের প্রতিষ্ঠান থেকে অর্থ দেওয়া হয়েছিল এবং সে-সংক্রান্ত নথিপত্র নষ্ট করতে ট্রাম্প ইচ্ছাকৃত ও বেআইনিভাবে তার নিজস্ব ব্যবসায়িক রেকর্ডে মাজাঘষা করেছিলেন বিষয়টি সরকারি কৌঁসুলিরা সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। রাষ্ট্রপক্ষ আরও দাবি করছে, মুখ বন্ধ রাখার অর্থকে ট্রাম্প ও তার আইনজীবীরা আইনানুগ প্রাপ্য পারিশ্রমিক হিসেবে দেখিয়েছিলেন এবং এর মাধ্যমে তারা ২০১৬ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রচারাভিযানের শেষ দিনগুলোয় প্রার্থী সম্পর্কে জনসাধারণের কাছে প্রাসঙ্গিক তথ্য গোপন করেছিলেন। এসব অভিযোগ প্রমাণ করার পাশাপাশি যদি কৌঁসুলিরা এটিও প্রমাণ করতে পারেন যে ট্রাম্পের এসব কাজ তার কর জালিয়াতি কিংবা প্রচার-সংক্রান্ত জমা-খরচের হিসাবের আইন লঙ্ঘনের মতো অন্যান্য বেআইনি কার্যকলাপকেও বেগবান করেছিল, তাহলে তার প্রাথমিক অপরাধটি একটি ছোট অপকর্ম থেকে বড় একটি অপরাধে রূপ নেবে। ট্রাম্প যে ধরনের রাজনৈতিক কর্র্তৃত্ব হাতের মুঠোয় নেওয়ার আকাক্সক্ষা করেন, তা নিচ থেকে ওপরের দিকে উঠে আসা সর্বস্তরের জনগণের ক্ষমতার উদার গণতান্ত্রিক বোধের সঙ্গে সম্পূর্ণ সাংঘর্ষিক।

সার্বভৌম ক্ষমতার ব্যক্তিকেন্দ্রিক দাবি ট্রাম্পের কর্র্তৃত্ববাদী বক্তব্যে প্রতিধ্বনিত হয়: ‘আমিই তোমাদের ন্যায়বিচার, আমিই ইনসাফ, আমিই তোমাদের প্রতিশোধ’। যে জনগণ স্বাধীনভাবে তাদের রাজনৈতিক প্রতিনিধিদের হাতে তাদের ক্ষমতা অর্পণ করতে চান, সেই জনগণের স্বাধীনতার চেতনার সঙ্গে ট্রাম্পের আকাক্সক্ষা সাংঘর্ষিক হয়ে পড়ে। ট্রাম্প এমন একটি অনুদার গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার অভিলাষ পোষণ করেন, যেখানে ক্ষমতা জনগণ থেকে শীর্ষে অবস্থানরত সর্বোচ্চ নেতার কাছে যায় না, বরং শীর্ষে থাকা নেতার কাছ থেকে নিচের দিকে চুইয়ে পড়ে। আজ সহজেই অনুমান করা যাচ্ছে, রাজতন্ত্রবিরোধী যে নেতারা আজকের উদার আমেরিকাকে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, তারা যদি জানতেন একজন প্রেসিডেন্ট সপ্তদশ শতকের একজন নিরঙ্কুশবাদী শাসকের (ফ্রান্সের রাজা চতুর্দশ লুই) ‘আমিই রাষ্ট্র, আমিই জাতি’ উক্তিটিকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার অভিলাষ পোষণ করছেন, তাহলে তারা কতটা হতবাক হতেন। ইতিহাসে নতুন একটি জায়গায় ডোনাল্ড ট্রাম্পকে বসাতে নিউ ইয়র্ক জুরির ৯ ঘণ্টার সামান্য কিছু বেশি সময় লেগেছে। যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান ও সাবেক প্রেসিডেন্টদের মধ্যে ট্রাম্প নিজেকে বেশ আগেই এমন একজন প্রথম ব্যক্তি হিসেবে দাঁড় করিয়েছেন, যিনি গুরুতর অপরাধের জন্য বিচারের মুখোমুখি হয়েছেন। আর এখন তিনিই প্রথম কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্ট, যিনি আদালতের রায়ে দোষী সাব্যস্ত হলেন। ট্রাম্পের বিরুদ্ধে এখনো তিনটি গুরুতর মামলা চলমান। সেগুলোর কোনোটিতেই তিনি দোষী সাব্যস্ত হননি। কুখ্যাত আমেরিকান ব্যবসায়ী ও গ্যাংস্টার আল ক্যাপোনের মতো ট্রাম্পের তুলনামূলক ছোট একটি মামলা নিষ্পত্তি হলো। এর মধ্য দিয়ে আইন তাকে শেষ পর্যন্ত ধরতে পারল। এখানেই ঘটনার শেষ না।

ট্রাম্পের দিন শেষ হয়েছে এবং তার হোয়াইট হাউজে ফিরে আসার সব আশাও শেষ হয়ে গেছে। বিশ্ব স্বাভাবিকভাবে চললে এ কথায় কেউ দ্বিমত করত না। একটি স্বাভাবিক বিশ্বে আমরা দাঁড়িয়ে থাকলে অবশ্যই বলা যেত, আমেরিকানরা কখনোই তাদের প্রেসিডেন্ট হিসেবে একজন অপরাধীকে নির্বাচিত করবে না। ১৯৮৮ সালে ব্রিটিশ রাজনীতিক নিল কিনকের বক্তব্য চুরি করে নিজের ভাষণে চালিয়ে দেওয়ার কারণে জো বাইডেনকে যে ভোটাররা অযোগ্য ঘোষণা করেছিল; সেই ভোটাররা বাইডেনের চেয়ে অন্তত ৩৪ গুণ অন্যায় করা অপরাধীকে হোয়াইট হাউজে পাঠাবে, এটা হতেই পারে না। কিন্তু কথা হচ্ছে সেই স্বাভাবিক বিশ্বকে আমরা অনেক আগেই পেছনে ফেলে এসেছি। বাস্তবতা হলো, আজকের ‘ট্রাম্প ওয়ার্ল্ডে’ ট্রাম্পকে দোষী সাব্যস্ত করা রায় তার সহানুভূতি কুড়ানোর হাতিয়ার হয়ে দাঁড়িয়েছে; তার নির্বাচনী তহবিল সংগ্রহের সুযোগ হিসেবে দাঁড়িয়ে গেছে। সাবেক এই প্রেসিডেন্টের অনুচররা এখন তাদের সেই রাজনৈতিক প্যাটার্নের দিকে ঝুঁকবে যা তারা একটু একটু করে প্রতিষ্ঠিত করে ফেলেছেন। ট্রাম্পের অনুসারীরা ট্রাম্পের ওপর আসা আইনি আঘাতকে রিপাবলিকান প্রাইমারি চলাকাল থেকে চক্রান্ত হিসেবে দেখাচ্ছেন। রিপাবলিকান প্রাইমারি থেকে ট্রাম্প নিজেকে রাষ্ট্রক্ষমতার গভীরে থাকা উদারপন্থিদের চক্রান্তের শিকার হিসেবে দাবি করে আসছেন। সুতরাং ট্রাম্পের যেকোনো সাজাকে টিম ট্রাম্প আদালতের অবিচার বলে প্রচার করতে থাকবে। অর্থাৎ তার জনপ্রিয়তা কমবে না বলে ধারণা করা যেতে পারে। কেননা ট্রাম্প একবার নিজের মুখে বলেছিলেন, তিনি যদি ফিফথ অ্যাভিনিউতে ‘কাউকে গুলি করেন’, তা হলেও তার সমর্থকেরা তাকে ছেড়ে যাবেন না। তা সত্ত্বেও, এই রায় ঘোষণার পর আপনি ট্রাম্প এবং তার উপদেষ্টাদের চেহারায় চিন্তার রেখা দেখতে পাবেন।

কারণ তারা ভালো করেই জানতেন, ১৫৩০ নম্বর বিচারকক্ষে ১২ জন বিচারক যে রায় দিয়েছেন, তা জো বাইডেনের জন্য প্রাণসঞ্চারী হয়ে উঠেছে। প্রেসিডেন্ট প্রার্থীদের জনপ্রিয়তা নিয়ে যেসব জরিপ হয়েছে, সেসব জরিপে বাইডেনের অবস্থা খুবই খারাপ দেখা গেছে। এই পরিস্থিতির মধ্যেও একটি সান্ত্বনা পাওয়া গেছে। সাম্প্রতিক একটি জরিপে দেখা গেছে, প্রতি পাঁচজন রিপাবলিকান ভোটারের মধ্যে প্রায় একজনকে খুঁজে পাওয়া গেছে, যারা বলেছেন ট্রাম্পের প্রতি তাদের সমর্থন পুনর্বিবেচনা করবেন অথবা যদি তিনি দোষী সাব্যস্ত হন, তাহলে তাকে সম্পূর্ণভাবে ত্যাগ করবেন। এখন যেহেতু রায় হয়ে গেছে, সেহেতু বলা যায়, সেই দিন এসে গেছে। তবে জনপ্রিয়তা বাইডেনের কাছে হেঁটে এসে ধরা দেবে না। রিপাবলিকানদের মধ্যে যারা ভিন্নমত পোষণকারী, তাদের কাছে বাইডেনের সরাসরি আবেদন করতে হবে; তাদের দলীয় আনুগত্য ভাঙতে এবং বাইডেনকে তাদের ভোট দিতে অনুরোধ করতে হবে।

সাবেক প্রেসিডেন্ট প্রার্থী ক্রিস ক্রিস্টি, যিনি জানুয়ারিতে ট্রাম্পের ওপর উত্তেজনাপূর্ণ আক্রমণ করে নির্বাচনী দৌড় থেকে ছিটকে পড়েছিলেন, তিনি গত সপ্তাহে বলেছেন, বাইডেন বা তার দলের কেউ তার সঙ্গে যোগাযোগ করেননি বা তার সমর্থন এমনকি পরামর্শও চাননি। এটি বাইডেনের অত্যধিক আত্মতুষ্টিকে আমাদের সামনে প্রকাশ করে দেয়। ট্রাম্পকে দোষী সাব্যস্ত করে দেওয়া রায় বাইডেনকে দ্বিতীয়বারের মতো সুযোগ এনে দিলেও এই বিষয়টিকে ব্যবহার করার ক্ষেত্রে বিপদের ঝুঁকিও আছে। রায়ের পয়েন্টটির ওপর খুব বেশি চাপাচাপি করলে ট্রাম্পবাদীরা এমন একটি ভাষ্য প্রতিষ্ঠা করে ফেলতে পারে যে ম্যানহাটানের বিচার একটি পক্ষপাতমূলক ‘উইচ হান্টের’ অংশ, যেখানে বাইডেন রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীকে ঘায়েল করার জন্য বিচারব্যবস্থাকে কাজে লাগিয়েছেন। বাইডেন এমন কিছু বলতে পারবেন না, যা থেকে মনে হতে পারে তিনিই ট্রাম্পের আইনি পতনের মূল অনুঘটক।

২০২৪ সালের এই নির্বাচনকে একটি স্বাভাবিক ও গতানুগতিক নির্বাচন বলে মনে করার সুযোগ নেই। এটা সম্পূর্ণ আলাদা কিছু। বর্তমানে যিনি বাইডেনের প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন, তিনি ২০২০ সালে হেরে গিয়ে ভোটের ফল উল্টে দিতে চেষ্টা করেছিলেন এবং আদালতের ভাষ্যমতে, ২০১৬ সালে তিনি নির্বাচনে প্রতারণার আশ্রয় নিয়েছিলেন। এবার তিনি ভোটে জেতার জন্য মরিয়া হয়ে গেছেন। কারণ, একমাত্র আগামী ৫ নভেম্বরের নির্বাচনের জয়ই তাকে জেলে যাওয়ার হাত থেকে বাঁচাতে পারবে। চলতি মাসে ক্রিস্টি বলেছেন, ট্রাম্প তার নিজের কোমর ভেঙে যাওয়াকে যতটা ভয় পান, সেভাবেই জেলে যাওয়ার বিষয়টিকে ভয় পান। এমন একজন ব্যক্তির পুনরায় ক্ষমতায় আসাটা আমেরিকান প্রজাতন্ত্রের জন্য, গণতন্ত্রের জন্য এবং আইনের শাসনের জন্য মহাবিপদের বিষয়। এর চেয়ে গুরুতর বিপদ আর হতে পারে না।

সুতরাং চোখ বুজে বলে দেওয়া যায়, আমরা আমেরিকার ইতিহাসে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে আছি। এ অবস্থায় আমাদের প্রতিক্রিয়া কী হবে? বা কী হওয়া উচিত? আমরা কিছু না দেখার ভান করে খবর পড়া বন্ধ করতে পারি না কিংবা টিভি বন্ধ করে রাখতে পারি না। বিশ্বে যা কিছু ঘটার, তা ঘটে যাচ্ছে। আমাদের অবশ্যই ২০২৪ সালের মার্কিন নির্বাচনে সক্রিয়ভাবে ভূমিকা রাখতে হবে। কারণ, এই নির্বাচনের সঙ্গে আমাদের সবার ভালো থাকা মন্দ থাকার প্রশ্ন জড়িয়ে রয়েছে। বাইডেন কিন্তু টেকসই জ্বালানি ও জ্বালানি দক্ষতায় ইতিহাসের যেকোনো প্রেসিডেন্টের চেয়ে বেশি অর্থ বিনিয়োগ করতে সহায়তা করেছেন। ইসরায়েলের বিষয়ে বাইডেনের অবস্থান নিয়ে যদি আপনার নেতিবাচক ধারণা থাকে, তাহলে আপনাকে বুঝতে হবে, এ ক্ষেত্রে ট্রাম্পের অবস্থান বাইডেনের চেয়ে অনেক বেশি খারাপ। বাইডেন একজন প্রথাগত আমেরিকান রাজনীতিবিদ, যিনি গণতন্ত্র, অবাধ নির্বাচন এবং ভিন্নমতের অধিকারে বিশ্বাস করেন। আর ট্রাম্প এর কোনোটাতেই বিশ্বাস করেন না। আর এখানেই ট্রাম্প ও বাইডেনের মধ্যে পার্থক্য।

লেখক: গবেষক ও কলাম লেখক

[email protected]

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত