মঙ্গলবার, ২৫ জুন ২০২৪, ১১ আষাঢ় ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

কোরবানির পশুর বাজার করপোরেট-খামারিদের দখলে

আপডেট : ১২ জুন ২০২৪, ১২:৪০ এএম

ব্যাংক থেকে হাজার কোটি টাকা লুটের খবর যখন পত্রিকার পাতায় পড়ি, যখন দেশের শীর্ষ কর্মকর্তাদের হাজার হাজার কোটি টাকার সম্পদের হিসাব শুনি তখন মনে পড়ে মজিবরের কথা। বয়স ৬০ বছর হবে। রিমাল ঝড় যখন রাজধানীর ওপর দিয়ে তীব্র বাতাস এবং টানা বৃষ্টি ঝরাচ্ছে তখন রিকশার হ্যান্ডেল ধরে বৃষ্টিতে ভিজছে যাত্রীর জন্য। ইচ্ছে না থাকা সত্ত্বেও রিকশায় চড়ে নিজেকে বেশ অপরাধী মনে হচ্ছিল। কিন্তু গন্তব্যে যাওয়ার তাড়া পাশাপাশি দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়া কিছু করার ছিল না। গন্তব্যে পৌঁছে কৌতূহলে জানতে চাই ছেলেমেয়ে নেই। জবাব দেন আছে। গ্রামে থাকে। বাড়ি জামালপুর। ছেলে ছোট। এই বৃষ্টিতে রিকশা না চালালে হয় না। বলেন, কী করমু বাবা ঢাকা থাকলে সারা দিনে নিজেরই দুই আড়াইশ টাকা খরচ লাগে। বাড়ির লোকজনকেও টাকা পাঠাইতে হয়। কামাই না করলে বাচমু কেমনে। জিনিসপত্রের যা দাম। সারা দিন রিকশা চালিয়ে যে টাকা পাই তা দিয়ে কোনো মতে বাইচ্চা আছি। বৃষ্টির লাগি রিকশা না চালাইলে চলব? বললাম এখন যদি আপনার জ্বর বা শরীর খারাপ করে তাহলে। বলেন আল্লাহ ভরসা। আসলেই তাই। সেটাই তো শেষ আশ্রয়স্থল।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী দেশের মানুষের মাথাপিছু আয় বেড়ে এখন ২ হাজার ৭৮৪ ডলার। ডলারের হিসাবে বেড়েছে মাত্র সোয়া ১ শতাংশ। আর টাকার হিসাবে বেড়েছে ১২ শতাংশ। টাকার হিসাবে মাথাপিছু আয় ৩ লাখ ৬ হাজার ১৪৪ টাকা। অর্থাৎ আমরা প্রত্যেকে মাসে কামাই করি ২৫ হাজার ৫০৯ টাকা। আসলে কি তাই?

নিত্যপণ্যের বাজারে গেলে গা গা ছম ছম করে। খুঁজতে হয় কোন পণ্যে দাম কম হতে পারে। অথচ আগে বাজারে গিয়ে খোঁজা হতো কোনটি টাটকা হবে। বাজার পরিস্থিতি এতটাই নাজুক যে, একেবারেই নিত্যপণ্য কিনতেও হিসাব করতে হয়। এ পরিস্থিতি গত দুই-তিন বছর ধরেই চলছে। ফলে এখন গরিব আর মধ্যবিত্ত আলাদা কোনো পরিবার নয়। যদিও সরকারের পক্ষ থেকে ব্যবস্থা গ্রহণের আশ্বাস দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু আদতে কি তা হচ্ছে? গত সপ্তাহে বাজারে গিয়ে রুই কিনতে চাইলে মাছ বিক্রেতা বলে মাছের দাম অনেক বেড়ে গেছে। আগে যে মাছ আনতাম এখন তার অর্ধেক আনলেও থেকে যায়, বিক্রি হয় না। তাহলে লোকজন কি মাছ কিনছে না? কিনে কিন্তু অর্ধেক। আপনি যেমন আগের অর্ধেক কিনছেন, অন্যরাও তাই করে। সবার একই অবস্থা। কিছুটা বিব্রত হলেও কথা সত্য। হয়তো সে আমার পরিচিত বলে বিষয়টা মনে রেখেছে, খেয়াল করেছে। তার কাছেই জানতে চাই, মাছের দাম বাড়ার কারণ কী? জবাবে মাছ বিক্রেতা জানালেন মাছের খাবারের দাম অত্যধিক বেড়ে গেছে। দ্বিগুণ থেকেও বেশি। মাছ চাষ করে এখন পোষাতে পারেন না চাষিরা। এরপর ঘাটে ঘাটে আছে চাঁদা। এসবের যন্ত্রণায় অনেক ব্যাপারী মাছ ব্যবসা ছেড়ে দিয়েছেন। মাছ ব্যবসায়ীর কথা শুনে বাজারে মাছের খাবার সম্পর্কে জানার চেষ্টা করলাম। বিষয়টি সত্য। মাছের খাবারের দাম এমনিতেই বেশি ছিল। গত ছয় মাসে তা আরও বেড়েছে। যারা প্রধানত মাছের খাবারের ব্যবসা করছে তারা দেশের বড় বড় করপোরেট। যাদের নিয়ন্ত্রণে চলে দেশের ভোগ্যপণ্যের বাজার। শুধু মাছ না, পোলট্রিসহ গো-খাদ্যের বাজারও তাদের নিয়ন্ত্রণে। এর ফলে মুরগি, ডিম এবং গরুর মাংসের দাম কেবল ওপরে উঠছে। 

দরজায় কড়া নাড়ছে কোরবানির ঈদ। মুসলিম সম্প্রদায়ের অন্যতম বড় উৎসব। বলা হচ্ছে এবার কোরবানির জন্য প্রায় ১ কোটি ৩০ লাখ পশু প্রস্তুত রয়েছে। সরকারি হিসাবে গত বছরের চেয়ে এবার ২০ লাখের বেশি গবাদি পশুর জোগানও রয়েছে। বাস্তবতা হলো পর্যাপ্ত পশু থাকার পরও জনসাধারণকে আগের চেয়ে হয়তো বেশি দামেই কিনতে হবে কোরবানির পশু। কারণ কিছু না। গো-খদ্যের দাম ২৫ থেকে ৩৫ শতাংশ বেড়েছে। এর কারণ করপোরেটদের নিয়ন্ত্রণে দেশের গো-খাদ্য ও গবাদি পশুর প্রজননব্যবস্থা। এতে বেড়েছে পশুপালন ব্যয়। খামারি ও প্রাণিসম্পদ সংস্থার তথ্য মতে, ২০১৪ সালে ভারত থেকে গবাদি পশু পাচারের বিরুদ্ধে অভিযান শুরুর পর সাম্প্রতিক বছরগুলোয় দুগ্ধ ও গবাদি পশু মোটাতাজাকরণে বিনিয়োগ বেড়েছে। এই নিষেধাজ্ঞার ফলে ভারত থেকে গবাদি পশুর সরবরাহ কমে যায়, যা আগে বাংলাদেশের জন্য বছরে ২০ লাখ গবাদি পশুর উৎস ছিল। পশুপালনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে খাদ্যের উচ্চমূল্য। গো-খাদ্য উপকরণের একটি বড় অংশই আমদানিনির্ভর। সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন গম ও সয়াবিন। দুটিই আমদানি করতে হয় রাশিয়া-ইউক্রেন থেকে। যুদ্ধের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে খাদ্যের দাম গত বছর বাড়তি থাকলেও এখন তা অনেকটাই সহনীয় পর্যায়ে নেমে এসেছে। তবে ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়ন ও আমদানিকারকদের উচ্চ মুনাফা প্রবৃত্তির কারণে দেশে গো-খাদ্যের দাম বেড়েই চলেছে। এর নিয়ন্ত্রণ এবং সহনীয় রাখতে সরকারি কোনো সংস্থাই কার্যকর উদ্যোগ নেয়নি। শুধু মুখেই বলছে নিয়ন্ত্রণে রাখার কথা। যখন সরকারি পর্যায়ে বাজার নিযন্ত্রণের কথা বলা হচ্ছে তখন পণ্যের দাম যেন আরও বেড়ে যায়।

গো-খাদ্যের প্রধান উপকরণ গম, ভুট্টা, সয়াবিন, সরিষা, ভুসি। ভুসি ছাড়া অন্য সব উপকরণই আমদানিনির্ভর। বর্তমানে  গো-খাদ্যের প্রয়োজনীয় উপকরণ আমদানি করে দেশের প্রায় ৩০০ কোম্পানি। তবে এর মধ্যে ১০টি করপোরেট প্রতিষ্ঠান সিংহভাগ আমদানিতে জড়িত। এদের মধ্যে ১০ কোম্পানির হাতে গো-খাদ্য উপকরণের বাজার ৫০ শতাংশের বেশি। মূল্য নির্ধারণে এসব কোম্পানিই মুখ্য ভূমিকা রাখে। গো-খাদ্যের দাম বৃদ্ধিতে এসব প্রতিষ্ঠান দায়ী। ফলে গেল তিন বছরের ব্যবধানে গো-খাদ্যের সব উপকরণের দাম ৬০ থেকে ৬৬ শতাংশ বেড়েছে। কোম্পানিগুলো যে বেপরোয়াভাবে খাদ্যের দাম বাড়িয়েছে তার এক বড় উদাহরণ পাওয়া যায় বাংলাদেশ পোলট্রি ইন্ডাস্ট্রিজের কেন্দ্রীয় কাউন্সিলের (বিপিআইসিসি) পরিসংখ্যানে। সংস্থাটির পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত ৫ বছরের ব্যবধানে ফিডে ব্যবহৃত অত্যাবশ্যকীয় কাঁচামালের দাম গড়ে ৭৫ থেকে ১৪৪ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে।

গো-খাদ্যের দাম বৃদ্ধির ফলে স্বাভাবিকভাবে এর প্রভাব পড়বে কোরবানির পশু বাজারে। কারণ একজন খামারি একটি পশুকে লালন করেন লাভের আশায়। গো-খাদ্যের দাম, এর পরিচর্যার জন্য কর্মী নিয়োগ ব্যয়, পরিবহন এবং পথের চাঁদাবাজি পেরিয়ে কোরবানির হাটে এনে দাঁড় করানর তার কোরবানির পশু। সারা বছরের পরিশ্রমের বিনিময়ে লাভ তিনি চাইতেই পারেন। এ কারণে কোরবানির পশু বাজার নিয়ন্ত্রণের কোনো উপায় নেই। সরকার চাইলে তা নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে না। যেটা নিয়ন্ত্রণ বা নজরদারি করা যেত সেটা গো-খাদ্য ও এর পরিচর্যা ব্যয় নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে।   কোরবানির বাজরে গিয়ে সবাই মোটাতাজা গরু কিনতে চান। করপোরেটরা তাদের আমদানি করা খাদ্যের মাধ্যমে খামারিদের সে সুযোগ করে দেয়। ফলে গো-খাদ্যের দাম বেশি হলেও খামারিরা তা লুফে নেন। এসব কারণেই দেশে গরু উৎপাদন বাড়লেও বেশি দামেই কিনতে হবে কোরবানির পশু।

মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের চ্যালেঞ্জ নিয়ে বর্তমান সরকার নতুন মেয়াদে যাত্রা করে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বরাবরই বলছেন নিত্যপণ্য বাজার নিয়ন্ত্রণের কথা। সরকারের গত মেয়াদে একজন মন্ত্রী করপোরেটদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া যাবে না মন্তব্য করে বেশ সমালোচনার মুখে পড়েছিলেন। সমালোচনা যা-ই থাকুক, বাস্তবতা তাই। করপোরেটরা কখনো কখনো সরকারকেও ডমিনেন্ট করে। হয়তো সেটা সরকারি ভাষ্যে প্রকাশ পায় না। তা না হলে সারা বিশ্বে গো-খাদ্যের উপকরণের দাম কমলেও দেশের বাজারে বাড়ে কী করে? যদি বলি সরকার করপোরেট নিয়ন্ত্রণে আন্তরিক না। তবে কি তা ভুল হবে? হাতে গোনা কয়েকটি করপোরেট প্রতিষ্ঠান বাজার অস্থির করে তুলেছে। দেশের সাধারণ মানুষের মুখে মুখে পর্যন্ত তাদের নাম। কিন্তু এদের নিয়ন্ত্রণে যেন কোনো সরকারি কর্মপন্থাই নেই। কোনো আইন নেই। ভোক্তা অধিদপ্তরের ডিজি সম্প্রতি বলেছেন, খাদ্যপণ্যের ব্যবসা ৫-৬টি করপোরেট গ্রুপের হাতে চলে গেছে। তারা চাইলে খাদ্যপণ্যের সংকট তৈরি করতে পারে। আমি বলি তাদের সুযোগ দেওয়া হয়েছে বলেই তারা সংকট তৈরি করতে পারে। আর এ সুযোগ দিতে গিয়ে করপোরেটরা কাউকে না কাউকে সুবিধা দিয়েছে। তা না হলে করপোরেটরা ভয়ডরহীন ভাবে ব্যবসা করছে কী করে।

মজিবররা কোরবানির ঈদের স্বপ্ন দেখতে পারেন না। করোনা-পরবর্তী দুই তিন বছরে এমন অনেক মজিবর তৈরি হয়েছেন যারা বলতেও পারেন না। আজ মধ্যবিত্তরা সন্তানদের কাছ থেকে পালিয়ে বেড়ান। কোরবানির দিনটি পার করার জন্য। দেশ থেকে যখন হাজার কোটি টাকা পাচার হয়, ক্ষমতার জোরে যখন সম্পদের পাহাড় গড়া হয় তখন সরকারি কোনো সংস্থাকে তৎপর হতে দেখা যায় না। করপোরেটরা দিনের পর দিন সাধারণ মানুষকে পিষে হাজার হাজার কোটি টাকা হাতালেও সংস্থাগুলো নীরব থাকবে, এটাই যেন স্বাভাবিক।

লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক ও সংবাদ বিশ্লেষক

[email protected]

   
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত