শনিবার, ১৫ জুন ২০২৪, ১ আষাঢ় ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

রাষ্ট্রায়ত্ত ও ইসলামি ব্যাংকগুলোর আমানতে পতন

আপডেট : ১২ জুন ২০২৪, ০১:২৭ এএম

ঋণ নিয়ে তা ফেরত না দেওয়া ও আস্থার সংকটের কারণে বেশ কয়েক মাস ধরেই তারল্য সংকটে ভুগছে দেশের বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো। তবে নানা অনিয়ম ও ব্যাংক একীভূতকরণের ঘোষণার পর থেকে পরিস্থিতি কিছুটা খারাপের দিকে যেতে থাকে। অনেকেই ব্যাংক থেকে টাকা তুলে নিজের হাতে রাখতে শুরু করেন। এর ফলে পুরো ব্যাংকিং ব্যবস্থায় আমানতের প্রবৃদ্ধি কমে যায়। চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকে (জানুয়ারি-মার্চ) দেশের ব্যাংক খাতে আমানতের প্রবৃদ্ধি হয়েছে শূন্য দশমিক ৭৫ শতাংশ, যা ডিসেম্বর প্রান্তিকে ছিল ২ দশমিক ১ শতাংশ।

বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে প্রাপ্ত তথ্যে জানা যায়, গত ডিসেম্বরের তুলনায় চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকে সব ধরনের ব্যাংকেই আমানত কমেছে। তবে আমানতে ঋণাত্মক প্রবৃদ্ধি ছিল সরকারি, বিদেশি ও ইসলামিক ধারার ব্যাংকগুলোতে। এর মধ্যে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর আমানত কমেছে শূন্য দশমিক ৪৪ শতাংশ, দেশে কার্যরত বিদেশি ব্যাংকগুলোর আমানত কমেছে শূন্য দশমিক ৫৯ শতাংশ এবং ইসলামি ব্যাংকগুলোর আমানত কমেছে ১ দশমিক ২১ শতাংশ। যদিও বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর কারণে সার্বিক আমানত বেড়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রকাশিত সর্বশেষ হালনাগাদ প্রতিবেদন সূত্রে জানা যায়, ২০২৩ সালের ডিসেম্বর শেষে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক সোনালী, জনতা, অগ্রণী, রূপালী, বেসিক ও বিডিবিএলের আমানতের স্থিতি ছিল ৪ লাখ ২৯ হাজার ৫৬৩ কোটি টাকা। আর চলতি বছরের মার্চ শেষে রাষ্ট্রায়ত্ত এসব ব্যাংকের আমানতের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ৪ লাখ ২৭ হাজার ৬৫৭ কোটি টাকা। সেই হিসাবে তিন মাসে (জানুয়ারি-মার্চ) রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর আমানত কমেছে ১ হাজার ৯০৬ কোটি টাকা বা শূন্য দশমিক ৪৪ শতাংশ।

পর্যালোচনায় দেখা যায়, গত বছর সেপ্টেম্বরের পর থেকেই রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোতে আমানতের প্রবৃদ্ধি ঋণাত্মক। গত ডিসেম্বর প্রান্তিকেও এসব ব্যাংকের আমানত ৪ হাজার ২২৩ কোটি টাকা বা প্রায় এক শতাংশ কমেছিল।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৩ সালের ডিসেম্বর শেষে শরিয়াহভিত্তিক পরিচালিত ইসলামি ব্যাংকগুলোর আমানতের স্থিতি ছিল ৩ লাখ ৭৯ হাজার ৭৮৩ কোটি টাকা, যা চলতি বছরের মার্চ শেষে দাঁড়িয়েছে ৩ লাখ ৭৫ হাজার ১৯৯ কোটি টাকায়। সেই হিসাবে তিন মাসে (জানুয়ারি-মার্চ) ইসলামি ধারার ব্যাংকগুলোতে আমানত কমেছে ৪ হাজার ৫৮৪ কোটি টাকা বা ১ দশমিক ২১ শতাংশ।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্যানুযায়ী, ২০২৩ সালের ডিসেম্বর শেষে দেশে কার্যরত বিদেশি ব্যাংকগুলোর আমানতের স্থিতি ছিল ৮৩ হাজার ৭৩৭ কোটি টাকা। আর চলতি বছরের মার্চ শেষে বিদেশি ব্যাংকগুলোর আমানতের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ৮৩ হাজার ২৪০ কোটি টাকা। সেই হিসাবে চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকে বিদেশি ব্যাংকগুলোর আমানত কমেছে ৪৯৬ কোটি ৮৪ লাখ টাকা বা শূন্য দশমিক ৫৯ শতাংশ।

তবে মার্চ শেষে প্রবৃদ্ধি অনেকটা কমলেও বেসরকারি খাতের বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর আমানত বেড়েছে। তথ্য বলছে, ২০২৩ সালের ডিসেম্বর শেষে বেসরকারি খাতের বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর আমানতের স্থিতি ছিল ১১ লাখ ৮৮ হাজার ৭২৬ কোটি টাকা, যা মার্চ শেষে দাঁড়ায় ১২ লাখ ৪ হাজার ৫৫ কোটি টাকায়। সেই হিসাবে চলতি প্রথম প্রান্তিকে বেসরকারি খাতের ব্যাংকগুলোর আমানত বেড়েছে ১৫ হাজার ৩২৯ কোটি টাকা বা ১ দশমিক ২৯ শতাংশ। গত ডিসেম্বরে এ খাতের ব্যাংকগুলোর আমানত বেড়েছিল ৩ দশমিক ৪৩ শতাংশ।

অন্যদিকে, গত বছর ডিসেম্বর শেষে বিশেষায়িত ব্যাংকের আমানতের স্থিতি ছিল ৪৭ হাজার ১০৫ কোটি টাকা, যা চলতি বছরের মার্চ শেষে দাঁড়িয়েছে ৪৭ হাজার ৩৪৯ কোটি টাকা। তিন মাসে বিশেষায়িত ব্যাংকগুলোর আমানত বেড়েছে ২৪৪ কোটি টাকা।

ব্যাংকাররা বলছেন, ব্যাংক খাতে সুদহারের সীমা তুলে দেওয়ার পর রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন সরকারি ব্যাংকগুলো সেভাবে সুদ সমন্বয় করেনি। এ ছাড়া দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে অনেকেই সংসারের খরচ মেটাতে ব্যাংক থেকে তাদের আমানত তুলে নিচ্ছে। অন্যদিকে বেসরকারি খাতের বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো উচ্চ সুদে আমানত আকৃষ্ট করছে। ফলে তাদের আমানত বেড়েছে।

এ বিষয়ে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, দুটি কারণে সরকারি খাতের ব্যাংকগুলোর আমানত কমতে পারে। প্রথমত মানুষ এখন বন্ডের দিকে ঝুঁকছে। দ্বিতীয়ত, বেসরকারি খাতের ব্যাংকগুলো টিকে থাকতে আগ্রাসীভাবে সুদহার বাড়িয়ে আমানত সংগ্রহ করছে। কিছু ব্যাংক ১৪ শতাংশ সুদেও আমানত অফার করছে। আর সরকারি ব্যাংকগুলো চাইলেও তাদের মতো করতে পারবে না। সরকারি ব্যাংকগুলোর পর্যাপ্ত আমানত আছে। তাই কোনো ঝুঁকি নিয়ে আমরা আমানত নিচ্ছি না।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, প্রথমত দিন দিন ব্যাংকের যে দুরবস্থা তৈরি হচ্ছে তাতে মানুষের ব্যাংকগুলোর প্রতি আস্থা কমে যাচ্ছে। ইসলামি ব্যাংকগুলো কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে আবারও টাকা ধার নিচ্ছে। সার্বিকভাবে এর একটা প্রভাব পড়ছে। দ্বিতীয়ত মানুষ মূল্যস্ফীতির ভারে টাকা তুলছে বেশি। যাদের সঞ্চয় আছে তারা তা তুলে খরচ করছে। জমাচ্ছে কম। এতে ডিপোজিট কমে যাওয়াটা স্বাভাবিক।

এদিকে আমানত কমলেও রেকর্ড পরিমাণ বেড়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণ। চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮৫ হাজার ৮৭০ কোটি। ২০২৩ সালের ডিসেম্বর শেষে এসব খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ৬৫ হাজার ৭৮১ কোটি টাকা। তিন মাসের ব্যবধানে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর খেলাপি বেড়েছে ৩০ দশমিক ৫৩ শতাংশ।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত