সোমবার, ১৫ জুলাই ২০২৪, ৩১ আষাঢ় ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

সাধারণ মানুষের শক্তি অন্যায় থেকে মুক্তি

আপডেট : ১৪ জুন ২০২৪, ০১:২৩ এএম

আমরা এখন এক অসৎ, কপট পৃথিবীতে বাস করি; যেখানে মানুষকে তাদের মৌলিক অধিকারগুলোর জন্য আজও এই একবিংশ শতাব্দীতে এসে যেভাবে ভুগতে হচ্ছে। এমনটা কোনো সভ্য সমাজে নিশ্চয় কেউ আশা করে না। রাষ্ট্রের জন্ম হয়েছিল মানুষকে নিরাপত্তা দেওয়ার জন্য; অথচ আজ রাষ্ট্রই মানুষকে সবচেয়ে বেশি অনিরাপদ করে তুলেছে, অধিকার বঞ্চিত করেছে, এমনকি ন্যায়বিচার ছাড়া মানুষ হত্যা করতেও এই তথাকথিত আধুনিক রাষ্ট্রের হাত কাঁপে না। অধিকাংশ রাষ্ট্র খাদ্য, বাসস্থান, চিকিৎসা, শিক্ষার জন্য তেমন খরচ করে না; কিন্তু, অস্ত্র, গোলাবারুদ কিনে রাষ্ট্রের গ্যারিসনগুলো ভরিয়ে ফেলে। প্রায়, সব রাষ্ট্রেরই চমৎকার সংবিধান আছে, সেখানে লেখা থাকে তাবৎ মৌলিক অধিকারের কথা, নাগরিকত্বের নিশ্চয়তার কথা, জীবন ও বাক-স্বাধীনতার কথা, বিচার বিভাগের স্বাধীনতার কথা। কিন্তু দিনশেষে এগুলো শুধু তাত্ত্বিক বয়ান হিসেবে টিকে থাকে। রাষ্ট্র চলে ‘সরকার’ নামক কতিপয় ব্যক্তির সিদ্ধান্তে, যা বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই জনমতবিচ্ছিন্ন। এমনকি সংসদীয় গণতান্ত্রিক দেশগুলোতেও, সংসদগুলো আজ পলিটিক্যাল ক্লাবে পরিণত হয়েছে। মানবাধিকার বা নীতি-নৈতিকতাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে চলছে রাষ্ট্রের তাবৎ পরিকাঠামো।

দুই-দুটো বিশ্বযুদ্ধ দেখা এই পৃথিবীতে পাল্টায়নি তেমন কিছুই। এক সময়, ইউরোপে নির্বিচারে ইহুদি হত্যা হয়েছে, আফ্রিকা-আমেরিকায় কালো মানুষদের হত্যা করা হয়েছে, এখনো মুসলমান হত্যা করা হয় কখনো গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের নামে, কখনো রাষ্ট্র পুনরুদ্ধারের নামে, আবার কখনো সন্ত্রাস-নির্মূলের নামে। থেমে নেই, নিরীহ আর নিরপরাধী সাধারণ মানুষ হত্যার মিশন। নিষ্পাপ শিশুর রক্তাক্ত মুখ বা বোমায় ছিন্নবিচ্ছিন্ন মানুষের দেহগুলো রাষ্ট্রীয় বা বিশ্বনেতাদের বিবেককে আজ জাগ্রত করে না। এই সভ্য সমাজের যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশগুলোতে নিরন্ন মানুষের দল যখন ক্ষুধার জ্বালায় ঘাস আর লতাপাতা খাচ্ছে, তখন বিশ্বনেতারা আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা নিশ্চিতের নামে বিশ্বসভায়, ফাইভস্টার ক্যাটারিং-এ বাদশাহি ভোজ আস্বাদনে ব্যস্ত। ক্ষুধার্ত আর আর্ত মানুষের জন্য পাঠানো খাবার আর ওষুধের গাড়ি আটকে দিচ্ছে অমানুষের দল। যুদ্ধের দামামা ঠেকাতে আর মানবাধিকার লঙ্ঘন প্রতিহতের উদ্দেশ্য নিয়ে গড়ে ওঠা জাতিসংঘ ঠুঁটো জগন্নাথ হয়ে বসে থাকে বছরের পর বছর। অন্যায্য যুদ্ধ আটকানোর কঠোর নীতিমালা আজও তারা তৈরি করতে পারেনি।

এই একবিংশ শতাব্দীতেও নির্বিচারে মানুষ মরছে, নাগরিকত্ব হারাচ্ছে, নিঃস্ব-রিক্ত হয়ে যখন পথে পথে ঘুরছে শুধু একটু মাথা গোঁজার ঠাঁইয়ের জন্য। তখনো নিরাপত্তা পরিষদ কিছু করতে পারে না শুধু তাদের তথাকথিত সর্বসম্মতির অভাবে। আন্তর্জাতিক আদালতগুলো দামি শহরে বসে পুঁজিবাদী শান-শওকতে যখন মত্ত, তখন আন্তর্জাতিক যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করার এখতিয়ারহীনতার দোহাই দিয়ে এরা নির্লিপ্ত থেকে যায়। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো শুধু কিছু ত্রাণ বিতরণের মধ্যেই এদের কার্যক্রম সীমিত রেখে চলেছে, মূল অপরাধ নির্মূলে এদের কোনো কার্যত ক্ষমতা বা ভূমিকা নেই। অথচ, এরা আন্তর্জাতিক যুদ্ধ আইন প্রণয়ন করে যায়, যেখানে যুদ্ধ বন্ধের কোনো শক্ত আইনি ভাষা না থাকলেও, কোনো গুলি বা কোন বোমা ব্যবহার করা যাবে, তা নিয়ে তাদের নীতিমালা আছে। কীভাবে মানুষ মারলে, মানুষ একটু কম ব্যথা পেয়ে মরবে, এগুলো তাদের আইনের বিষয়বস্তু! অসহায় মানুষের সঙ্গে কী নির্মম তামাশা! আইন আছে, আদালত আছে, পারিষদবর্গ আছে, নেই শুধু কোনো কার্যকর ফলাফল। মধ্যযুগের বর্বরতা আজ শুধু আধুনিক ‘সংবেদনশীল’ রূপ পেয়েছে মাত্র। কাজের কাজ হয়নি কিছুই।

এত অনাচারের মধ্যে, অন্যতম আশার বিষয় হচ্ছে সাধারণ মানুষের এক সাধারণ ক্ষমতার চর্চা, যার নাম ‘বয়কট’। মূলত, বয়কট হচ্ছে মানুষের সফট পাওয়ার, যা কোনো রাষ্ট্র বা আন্তর্জাতিক শক্তি তাদের নিরাপত্তা বাহিনী দিয়ে দমন করতে পারে না। এই বয়কট সাধারণত কয়েকটা কারণে হয়। যখন অন্যান্য শক্তি বা সংস্থাগুলো কোনো অপরাধ বা অন্যায়ের বিরুদ্ধে কোনো শক্ত অবস্থান নেয় না, তখন সাধারণ মানুষ পণ্য বয়কটের মাধ্যমে অপরাধীদের অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও নৈতিক ভিত নাড়িয়ে দেয়। ইসরায়েল বা জায়নবাদী আগ্রাসনের বিরুদ্ধে যখন বিশ্ব মোড়লরা তাদের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থে নীরব, তখন ফুঁসে উঠেছে বিশ্বের সাধারণ মানবতাবাদী মানুষ। যেহেতু, তাদের হাতে কোনো অফিশিয়াল পাওয়ার নেই, আর জোটবদ্ধ কোনো আবেদনই যখন বিশ্বনেতাদের মধ্যে কোনো প্রতিক্রিয়া জানাতে ব্যর্থ, তখন বয়কটই একমাত্র মাধ্যম। ইসরায়েলের যাবতীয় আর্থিক উৎস যখন বিশ্বের তাবৎ নামিদামি পণ্য, তখন সেগুলো বয়কটের (বিডিএস মুভমেন্ট) মধ্য দিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সচেতন মানুষেরা তাদের প্রতিবাদ জারি রেখেছে। বয়কট আসলে সাধারণ মানুষের স্যাংশন। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে অপরাধীদের আর্থিক উৎসের ওপর। অন্যদিকে, বয়কটের বিশ্ব-ব্যাপকতা বিশ্বনেতাদের আন্তর্জাতিক শান্তি-নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণের ব্যর্থতার প্রমাণ দিচ্ছে প্রতিনিয়ত।

বয়কটের প্রভাবে স্টারবাক্স (বিখ্যাত কফিশপ) ২০২৪ সালে স্টক মার্কেটে প্রায় ১১ বিলিয়ন ডলার হারিয়েছে, ইউনিলিভার ইন্দোনেশিয়া হারিয়েছে ৩৫৬ মিলিয়ন ডলার, শুধু ২০২৪-এর প্রথম কোয়ার্টারে ম্যাক ডোনালস-এর বিক্রি কমেছে ৮.৮%। একই ভাবে, কেএফসি, পিজ্জাহাট, কোকা-কোলা, পেপসি, নেসলেসহ অসংখ্য কোম্পানি যারা জায়নবাদী আগ্রাসনে অর্থ জোগান দেয় বলে পরিচিত, তারা মারাত্মকভাবে আর্থিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বয়কট শুধু মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশগুলোতেই হচ্ছে না, বরং যে কোনো মানবতাবাদী মানুষই বয়কটে অংশ নিয়েছে।

তবে বয়কট যে শুধু পণ্য বর্জনের মাধ্যমেই হয়, তা নয়। বরং, বয়কটের মাধ্যমে আজ ইসরায়েল বিভিন্নভাবে কোণঠাসা। বিশ্বের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান আজ ইসরায়েলের সঙ্গে বিভিন্ন বাণিজ্যিক চুক্তি থেকে সরে দাঁড়িয়েছে। ইসরায়েলবিরোধী বয়কট চলছে বিশ্বের তাবৎ ক্রীড়াঙ্গনে। নামিদামি খেলোয়াড়রা ফিলিস্তিনের প্রতি সমর্থন জানানোর মাধ্যমে ইসরায়েলকে বয়কট করেছে। ইসরায়েলের বিরুদ্ধে বিশ্বের নামকরা সব বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা যখন প্রতিবাদ জানাচ্ছে, আর ফিলিস্তিনের প্রতি জানাচ্ছে সমর্থন, তখন এই আন্দোলনও ইসরায়েলকে বয়কটের প্রতি সহায়ক হয়েছে। বয়কটের প্রভাবে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় নড়ে বসেছে। গত ১০ মে জাতিসংঘের ১৯৩টি দেশের মধ্যে ১৪৩টি দেশ ফিলিস্তিনকে পূর্ণ রাষ্ট্রের মর্যাদা দিতে ভোট দিয়েছে। গত ১০ জুন নিরাপত্তা পরিষদে ১৫ ভোটের মধ্যে ১৪ ভোটের সমর্থনে গাজায় যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব পাস হয়। আমেরিকার বাইডেন সরকার ইসরায়েলের সঙ্গে তার প্রতিরক্ষা বিষয়ক নীতিমালা পুনর্বিবেচনা করতে বাধ্য হয়েছে। ‘বয়কট’ এই শতাব্দীতে সবচেয়ে মোক্ষম অস্ত্র। বঞ্চিত সাধারণ মানুষের ক্ষমতা এটি। এই ক্ষমতা আর তার চর্চা জারি থাকুক, এই প্রত্যাশা সাধারণ মানুষের। কপট নেতৃত্বের বা ক্ষমতার বিরুদ্ধে সাধারণ, সচেতন, মানবিক মানুষেরা বয়কটের মাধ্যমে সমস্ত অন্যায় ও অন্যায়কারীকে রুখে দিক, এমন সহজ-সরল আকাক্সক্ষার বিকল্প নেই।

লেখক: অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত