বৃহস্পতিবার, ১৮ জুলাই ২০২৪, ৩ শ্রাবণ ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

আনকাট

বিক্ষোভ-বিদ্রোহের মধ্যে সাংবাদিক ট্যাক্সি ড্রাইভারের বন্ধুত্ব

আপডেট : ১৪ জুন ২০২৪, ১১:৩৩ এএম

একটি এলাকায় বিক্ষোভ হচ্ছে। সেখানকার বিদ্রোহীদের ঠেকাতে নির্বিচারে গুলি করছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। বিদ্রোহীরা মাটিতে লুটিয়ে পড়ছে। তাদের উদ্ধার করতে যারা যাচ্ছে তাদেরও গুলি করা হচ্ছে। হাসপাতালে আহতদের ভিড়; ঠাসাঠাসি। পত্রিকা-টিভিতেও কোনো খবর প্রকাশ করতে দেওয়া হচ্ছে না। পত্রিকার প্রেস ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। পুড়িয়ে দেওয়া হয় টিভি স্টেশনও।

এসব ঘটনা কাভার করতে গিয়ে ধাওয়া খেয়ে একটি বাড়িতে আশ্রয় নেন একজন সাংবাদিক। তার সঙ্গে ছিলেন তার ভাড়া করা ট্যাক্সি ক্যাবের ড্রাইভারও। ওই বাড়ির মালিক তাকে বলেন, আপনি কেন সাংবাদিকতা করেন? ওই সাংবাদিক তার হাতের তর্জনী ও বৃদ্ধাঙুল দিয়ে টাকা গোনার ভঙ্গি করে বলেন, টাকার জন্য। কিন্তু ওই বাড়ির মালিক তাকে বলেন, তাহলে আপনার পায়ের মোজা ছেঁড়া কেন? সাংবাদিক তার পায়ের আঙুলের কাছ থেকে মোজাটি টেনে ছেঁড়া জায়গাটি ঢাকার চেষ্টা করেন।

ঘটনাটি একটি ঐতিহাসিক কোরিয়ান অ্যাকশন সিনেমার। একজন সাংবাদিক ও একজন ট্যাক্সি ড্রাইভারের জীবনে ঘটে যাওয়া একটি বাস্তব ঘটনাকে কেন্দ্র করে তৈরি করা হয়েছে সিনেমাটি। ১৯৮০ সালের গোয়াংজু গণহত্যার সময়ে একজন জার্মান সাংবাদিক কীভাবে বিশ্বের কাছে ঘটনাটি তুলে ধরেছেন সেটি দেখানো হয়েছে।

সিনেমার গল্পটি শুরু হয় উইলিয়ামস নামক একজন ট্যাক্সি ড্রাইভারকে দিয়ে। তিনি সারা দিন ট্যাক্সি চালিয়ে রাতে বাসায় ফেরেন। দেখেন, বাসায় তার ১১ বছর বয়সী একমাত্র মেয়ে মেঝেতে জড়োসড়ো হয়ে শুয়ে আছে। তার স্ত্রী নেই, মেয়েকে দেখভালেরও কেউ নেই। তিনি তার মেয়েকে ডেকে তুলেন। দেখেন কপালে মার খাওয়ার দাগ। মেয়েকে জিজ্ঞাসা করেন, কে মেরেছে? বলে বাড়িওয়ালার ছেলে। তিনি সঙ্গে সঙ্গে বাড়িওয়ালাকে ডেকে তাকে প্রশ্ন করেন। কিন্তু জানতে পারেন তারা দুজনেই ঝগড়ায় জড়িয়েছিল। দেখেন বাড়িওয়ালা ছেলের মাথাতেও মার খাওয়ার দাগ। উইলিয়ামস ফিরে এসে তার মেয়েকে বলেন, জীবনে অনেক কিছুই ইগনোর করতে হয়।

এরপর গোয়াংজু বিদ্রোহের রিপোর্ট করার জন্য জার্মান সাংবাদিক পিটার দক্ষিণ কোরিয়া আসেন। ঘটনাক্রমে তাকে নিয়ে উইলিয়ামস রওনা হন। কিন্তু গোয়াংজু যাওয়ার প্রত্যেকটা সড়কই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী চেকপোস্ট বসিয়ে বন্ধ করে রেখেছে। কাউকে ঢুকতে দিচ্ছে না। উইলিয়ামস বুদ্ধি করে চেকপোস্ট পার হয়ে যান। গোয়াংজু শহরে গিয়ে তারা দেখেন রাস্তা-ঘাট ফাঁকা, দোকানপাট বন্ধ। রাস্তায় কাগজ-লাঠি-জুতা-সেন্ডেল ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। একদম অন্য পরিবেশ। হঠৎ তারা দেখতে পান একদল তরুণ একটি ট্রাকে করে যাচ্ছে। তাদের হাতে ব্যানার-ফেস্টুন। ওই সাংবাদিক তার ব্যাগ থেকে ক্যামেরা বের করে ভিডিও করেন।

পুরো এলাকায় কারফিউ চলছে। বিদ্রোহীদের গুলি করে মারা হচ্ছে। সাংবাদিকদেরও গ্রেপ্তার করা হচ্ছে। কেউ কোনো নিউজ করতে পারছেন না। একমাত্র ভরসা হয়ে দাঁড়ায় এই বিদেশি সাংবাদিক। কিন্তু তাকেও ধরার জন্য ধাওয়া করা হয়। তার গাড়ি খোঁজা হয়। এমন পরিস্থিতিতে ড্রাইভার উইলিয়ামস নিজের দেশের বাস্তবতা তুলে ধরার জন্য ওই সাংবাদিকের সঙ্গে থেকে যান। তিনি জীবনের পরোয়া না করে শুধু দেশের মানুষের কথা ভেবে নিজের জীবনকে চরম বিপদে ফেলেন।

পুরো সিনেমাটিতে বিদ্রোহ-বিক্ষোভ থাকলেও সাংবাদিকের দায়িত্ববোধ ও ড্রাইভারের দেশপ্রেম যেমন আছে তেমনি তাদের মধ্যে একটা নির্মল বন্ধুত্বও ছিল। তারা দুজনে গোয়াংজু গণহত্যার মর্মান্তিক-ভয়াবহতার সাক্ষী। তারা একসঙ্গে বিশৃঙ্খল রাস্তায় ব্যানার-ফেস্টুনের সঙ্গে মৃতদেহ পড়ে থাকতে দেখে কেঁদেছেন, তাড়া খেয়ে একসঙ্গে দৌড়ে পালিয়েছেন আবার হাসপাতালের ভয়ংকর দৃশ্য ভিডিও করেছেন। যদিও পরে আর কেন তাদের দেখা হলো না যেটা এখনো আক্ষেপ রয়ে গেছে আমার। এখনো কানে বাজে, সাংবাদিককে লোকজন বলছেন ‘আমাদের জন্য চিন্তা করবেন না, শুধু বিশ্বকে বলুন কী ঘটছে এখানে।’

সিনেমাটির নাম ‘এ ট্যাক্সি ড্রাইভার’, পরিচালনা করেছেন কোরিয়ান সিনেমার খ্যাতিমান পরিচালক জাং হুন। ড্রাইভারের চরিত্রে অভিনয় করেছেন সং কাং-হো আর সাংবাদিক চরিত্রে থমাস ক্রেচম্যান। দক্ষিণ কোরিয়ায় ২০১৭ সালে মুক্তি পাওয়া ব্যবসা সফল এ সিনেমাটির বর্তমান আইএমডিবি রেটিং ৭.৯।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত