এক শতাংশের হাতেই ৭৫% ঋণ

আপডেট : ১৪ জুন ২০২৪, ০৩:০৫ এএম

অর্থনীতির মেরুদ- ব্যাংক খাত এখন অনেকটাই ঝুঁকির মুখে। সুশাসনের অভাব কিংবা খেলাপি ঋণের কারণে সবচেয়ে বেশি আলোচনা-সমালোচনাও ব্যাংক খাত ঘিরে। দেশের সব শ্রেণি-পেশার মানুষ ব্যাংকে তাদের কষ্টার্জিত অর্থ সঞ্চয় রাখেন, যা দিয়ে দেশের উন্নয়ন-প্রয়োজন কিংবা চাহিদা মেটানো হয়। তবে এ আমানতের সবচেয়ে বড় সুবিধাভোগী দেশের ব্যবসায়ীরা, বিশেষ করে প্রভাবশালী ব্যবসায়ীরা। ঋণের নামে তারা ব্যাংক থেকে টাকা নিচ্ছেন, যাদের অনেকেই ফেরত দিচ্ছেন না। বর্তমানে ব্যাংক ঋণের ৭৫ শতাংশই নিয়ে গেছেন এক শতাংশ হিসাবধারী, যারা মূলত কোটিপতি ব্যবসায়ী।

চলতি বছর মার্চ পর্যন্ত ব্যাংকে ১৫ কোটিরও বেশি আমানতকারীর সঞ্চয় রয়েছে ১৭ লাখ ৬২ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে ১৫ লাখ ৬১ হাজার কোটি টাকা ঋণ হিসেবে বিতরণ করেছে ব্যাংক, যার বেশিরভাগই গেছে কোটিপতিদের কাছে। দেশে মোট ঋণ গ্রহণকারী হিসাব রয়েছে ১ কোটি ২৬ লাখ ৬৬ হাজার ৫৮৫টি। এর মধ্যে ১ লাখ ৪৭ হাজার ৮৫৯ জন কোটিপতি ব্যাংক থেকে ১২ লাখ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছেন, যা মোট ঋণগ্রহণকারীর ১ দশমিক ১৬ শতাংশ।

কোটিপতিদের নেওয়া এ ঋণের উল্লেখযোগ্য অংশই ফেরত আসেনি। গত মার্চ পর্যন্ত দেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থায় খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৮২ হাজার ২৯৫ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ১১ দশমিক ১১ শতাংশ। তবে আনুষ্ঠানিক এ খেলাপি ঋণের বাইরে মামলা, উচ্চ আদালতে স্থগিত ও অবসায়নের নামে আরও ৩ লাখ কোটি টাকারও বেশি ঋণ আটকে আছে, যার ৯৮ শতাংশই কোটিপতিদের। সব মিলিয়ে প্রায় ৫ লাখ কোটি টাকার ঋণ ফেরত না আসার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে, যা বিতরণ করা মোট ঋণের প্রায়

এক-তৃতীয়াংশ।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, দেশের মোট আমানতের ৪২ শতাংশ হচ্ছে কোটিপতিদের। অবশিষ্ট ৫৮ শতাংশ সাধারণ খেটে খাওয়া মজুর, চাকরিজীবী, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীসহ নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষ। আমানতের বেশিরভাগ এ শ্রেণি-পেশার মানুষের হলেও প্রয়োজনের সময় তাদের অধিকাংশই ব্যাংক ঋণ থেকে বঞ্চিত।

ব্যাংকে লাখ টাকার নিচের আমানত ও ঋণগ্রহীতাদের সাধারণত নিম্ন আয়ের মানুষ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিক (জানুয়ারি-মার্চ) শেষে এ শ্রেণির গ্রাহকরা মোট ব্যাংক ঋণের ২ শতাংশও পাননি। যদিও মোট সঞ্চয়কারীর মধ্যে ৯০ শতাংশের বেশি এ শ্রেণির। আর ক্ষুদ্র ও মাঝারি গ্রাহকদের ভাগ্যে জুটেছে ঋণের মাত্র ২৪ শতাংশ। বিশেষজ্ঞদের মতে, বড়দের ঋণের চাপে কোণঠাসা হয়ে পড়েছেন ক্ষুদ্র ঋণের গ্রাহকরা। কিন্তু দেশের অর্থনীতি সচল রাখতে মুখ্য ভূমিকা পালন করেন ছোট উদ্যোক্তারাই। সবচেয়ে বেশি কর্মসংস্থানও হচ্ছে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগে।

ব্যাংক থেকে নেওয়া ঋণ ফেরত না দিয়ে অনেক কোটিপতি তাদের বিত্তবৈভব বাড়াচ্ছেন। ঋণের অর্থ ফেরত না দিয়ে আদালতের শরণাপন্ন হচ্ছেন, যাতে তাদের খেলাপি ঘোষণা না করা হয়। নিয়মিত খেলাপির বাইরে ৩ লাখ কোটি টাকারও বেশি আটকে আছে এমন প্রক্রিয়ায়। এর মধ্যে অনেক ঋণ আদায় করতে না পেরে অবসায়নও করেছে ব্যাংকগুলো। অন্যদিকে অনেক ব্যবসায়ী ব্যাংকের ঋণ ফেরত না দিয়ে নিখোঁজ হয়ে যাচ্ছেন। ঋণের টাকা পাচার করে কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র, মালয়েশিয়াসহ বিভিন্ন দেশে স্থায়ী হচ্ছেন অনেকে। গত ৩ জুন এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতি জানিয়েছে, স্বাধীনতার পর থেকে এখন পর্যন্ত দেশ থেকে প্রায় ১২ লাখ কোটি টাকা পাচার হয়েছে।

ব্যাংক খাতসংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, ব্যাংকের ঋণ ফেরত না দিয়ে একটি শ্রেণি শত শত কোটি টাকার মালিক হয়েছেন।

বোস্টন কনসালটিং গ্রুপ (বিসিজি) সমীক্ষায় ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে যে, বাংলাদেশের মধ্য আয়ের এবং ধনী ভোক্তা (এমএসি) শ্রেণি দ্রুত বাড়ছে। ২০২৫ সালের মধ্যে তারা মোট জনসংখ্যার ১৭ শতাংশে পৌঁছবে। একই সঙ্গে দেশটিতে সম্পদের বৈষম্য বাড়ছে।

নিউ ইয়র্কভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ওয়েলথ-এক্স জানিয়েছে, ২০১০ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত সম্পদ বৃদ্ধিতে বাংলাদেশ বিশ্বব্যাপী শীর্ষস্থানীয় ছিল। গবেষণায় দেখানো হয়েছে, ৫০ লাখ ডলার বা তার চেয়ে বেশি সম্পদের মালিক এমন মানুষের সংখ্যা বছরে ১৪ দশমিক ৩ শতাংশ হারে বাড়ছে। এ হার ভিয়েতনামকেও ছাড়িয়ে গেছে। ভিয়েতনামে এ হার ১৩ দশমিক ২ শতাংশ। ওয়েলথ-এক্স-এর প্রতিবেদনে আরও পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে যে, বাংলাদেশ উচ্চ সম্পদ বৃদ্ধি ব্যক্তিদের সংখ্যা শীর্ষ পাঁচটি দ্রুত বর্ধনশীল দেশের মধ্যে থাকবে, যা আগামী পাঁচ বছরে ১১ দশমিক ৪ শতাংশ বৃদ্ধি পাবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, মাত্র ৩ হাজার ৭০৪ জন গ্রাহক ব্যাংক খাতের মোট ঋণের ২৭ দশমিক ৮৭ শতাংশই দখলে নিয়েছেন, যা ৪ লাখ ৩১ হাজার ৯৬০ কোটি টাকা। ১-৫ কোটি টাকা পর্যন্ত ঋণ নিয়েছেন ১ লাখ ৫ হাজার ৭৬৪ জন। যাদের ঋণের পরিমাণ ২ লাখ ১২ হাজার ২২৫ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ১৩ দশমিক ৫৯ শতাংশ। ৫-১০ কোটি টাকার বেশি ঋণ বিতরণ করা হয়েছে, এমন গ্রাহকের সংখ্যা ১৯ হাজার ৩৯৬ হাজার জন। তাদের কাছে বিতরণ করা হয়েছে ১ লাখ ৩৭ হাজার ১০৫ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৮ দশমিক ৭৮ শতাংশ। ১০-১৫ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছেন ৮ হাজার ১৭৫ জন, যাদের ঋণ গ্রহণের পরিমাণ ৯৪ হাজার ৫৯২ কোটি বা ৬ দশমিক ০৬ শতাংশ। ১৫-২০ কোটি টাকা পর্যন্ত ঋণ নিয়েছেন ৩ হাজার ৩১৪ জন। যাদের ঋণ গ্রহণের পরিমাণ ৫৬ হাজার ৮৭৫ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৩ দশমিক ৬৪ শতাংশ। ২০-২৫ কোটি টাকা পর্যন্ত ঋণ নিয়েছেন ২ হাজার ৩৫২ জন। যাদের ঋণ গ্রহণের পরিমাণ ৫১ হাজার ৭২১ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৩ দশমিক ৩১ শতাংশ। ২৫-৩০ কোটি টাকা পর্যন্ত ঋণ নিয়েছেন ১ হাজার ৪২৮ জন। যাদের ঋণ গ্রহণের পরিমাণ ৩৮ হাজার ৭৯৫ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ২ দশমিক ৪৮ শতাংশ। ৩০-৩৫ কোটি টাকা পর্যন্ত ঋণ নিয়েছেন ১ হাজার ২১৬ জন। যাদের ঋণ গ্রহণের পরিমাণ ৩৯ হাজার ৯১ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ২ দশমিক ৫০ শতাংশ। ৩৫-৪০ কোটি টাকা পর্যন্ত ঋণ নিয়েছেন ৮০৩ জন। যাদের ঋণ গ্রহণের পরিমাণ ২৯ হাজার ৯৯৪ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ১ দশমিক ৯২ শতাংশ। ৪০-৫০ কোটি টাকা পর্যন্ত ঋণ নিয়েছেন ১ হাজার ৭০৭ জন। যাদের ঋণ গ্রহণের পরিমাণ ৭৭ হাজার ২৭১ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৪ দশমিক ৯৫ শতাংশ। সব মিলিয়ে ১ লাখ ৪৭ হাজার ৮৫৯ জন কোটিপতি দখল করে আছেন ১১ লাখ ৬৯ হাজার ৬২৯ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৭৪ দশমিক ৬৫ শতাংশ।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, বড় বড় প্রভাবশালীর সঙ্গে ব্যাংকগুলোর একটা সখ্য আছে। তারা চাইলেই ব্যাংক ঋণ দিয়ে দেয়। কিছু কর্মকর্তা ব্যাংকের কী ভালো হবে না হবে সেটা চিন্তা করে না। ৪০ শতাংশ আমানতের বিপরীতে ৭৫ শতাংশ ঋণ তাদেরই পকেটে। এটা যৌক্তিক না। আর্থিক দিক দিয়ে এটা ঝুঁকির মুখে পড়ছে। এসব বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে কঠোর হতে হবে।

ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (এসএমই) ফাউন্ডেশনের পরিচালক ও ন্যাশনাল অ্যাসোসিয়েশন অব স্মল কটেজ ইন্ডাস্ট্রি অব বাংলাদেশের (নাসিব) সাবেক সভাপতি মির্জা নুরুল গনি শোভন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমাদের ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা ঋণ সহায়তা পেলে অনেক কিছুই করতে পারবে। কিন্তু তাদের ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো ঋণ দিতে খুব বেশি অনীহা দেখায়। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকও খুব আগ্রহী। বেশ কিছু দিকনির্দেশনাও আছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের। সেটাও ব্যাংকগুলো মানে না। ব্যাংকগুলো নিজেদের মতো করে তাদের ঋণ কার্যক্রম পরিচালনা করে। এতে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা বঞ্চিত হচ্ছে।’

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে দেশে কোটিপতি আমানতকারী ছিল ৫ জন, যা ১৯৭৫ সালে তা ৪৭ জনে উন্নীত হয়। ১৯৮০ সালে কোটিপতি হিসাবধারীর সংখ্যা ছিল ৯৮টি। এরপর ১৯৯০ সালে ৯৪৩, ১৯৯৬ সালে ২ হাজার ৫৯৪, ২০০১ সালে ৫ হাজার ১৬২, ২০০৬ সালে ৮ হাজার ৮৮৭ এবং ২০০৮ সালে ছিল ১৯ হাজার ১৬৩টি। ২০২০ সালে ডিসেম্বর শেষে দাঁড়ায় ৯৩ হাজার ৮৯০টিতে। ২০২১ সালের ডিসেম্বর বেড়ে কোটিপতি হিসাব দাঁড়ায় ১ লাখ ১ হাজার ৯৭৬টিতে। ২০২২ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত কোটা টাকার হিসাবের সংখ্যা ছিল ১ লাখ ৯ হাজার ৯৪৬। আর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্যানুযায়ী, ২০২৩ সালের শেষে দেশে ১ লাখ ১৩ হাজার ৫৮৬টি কোটিপতি আমানতকারী রয়েছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত