গণমাধ্যমকে বলা হয় রাষ্ট্রের পাহারাদার। ঈদের ছুটিতে সবাই যখন পরিবার পরিজন নিয়ে ব্যস্থ সময় কাটাচ্ছেন তখন গণমাধ্যমকর্মীরা দেশের নানাপ্রান্তে সংবাদের সন্ধানে ঘুরে বেরিয়েছেন। দেশের মানুষের ঈদযাত্রা যাতে নির্মল হয়, এই ছুটিতে যেন জবাবদিহিতার অভাবে জনগণের ভোগান্তি না হয় তাই নিশ্চিত করতেই গণমাধ্যম কর্মীদের এই নিরন্তর ছুটে চলা। ঈদের ছুটিতে সংবাদপত্রের ছাপা সংস্করণ বন্ধ থাকায় অনলাইন ও ডিজিটাল বিভাগের ওপর চাপ পড়ে বেশি। অন্যদিকে টেলিভিশনে কর্মরত সাংবাদিকরাও মাঠে ছিলেন সংবাদ সংগ্রহ ও পরিবেশনের কাজে।
একবার ঈদে সড়ক দুর্ঘটনায় চট্টগ্রামে ১০ জন লোক জায়গাটেই মারা যান, দুর্ঘটনার ফলে গাড়িটির আয়ু সেখানেই ফুরিয়ে যায়। অনেকগুলো মানুষ আহত হয়, কিন্তু বিষয়টি দেশের মানুষের অজানা ছিল। কেননা তখন ঈদের ছুটি ছিল। দুর্ঘটনার পর ঈদের ছুটি শেষে সংবাদপত্র পড়ে মানুষ বিষয়টি জানতে পারলেও বিষয়টি পুরাতন হয়ে যায়। কারণ তখন অনলাইন ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম চালু ছিল না। এই একটি ঘটনাই যথেষ্ট- ছুটিতে গণমাধ্যম চালু থাকার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে।
ফলে মানুষকে খবরের সন্ধান দিতে জনগণের কাছে রাষ্ট্রের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে সাংবাদিকদের এই ছুটে চলা দরকার ছিল। পরিবার রেখে কর্মস্থলে কেমন ঈদ কেটেছে সে বিষয়ে দেশ রূপান্তরের এই প্রতিবেদক কথা বলেছেন কয়েকজন গণমাধ্যমকর্মীর সঙ্গে। চলুন জেনে নেওয়া যাক ঈদে ব্যস্ত থাকা কিছু সাংবাদিকের গল্প।
ঢাকায় কেটেছে নিরস ঈদ, মন পড়েছিল হাতিয়া দ্বীপে
সাইফুল মাসুম, স্টাফ রিপোর্টার,দৈনিক আজকের পত্রিকা
তৃতীয় বারের মতো ঢাকা শহরে কোরবানির ঈদ কাটাচ্ছি। কংক্রিটের এই নগরীতে গ্রামের মতো ঈদের আমেজ নেই। তবুও জীবন-জীবিকার প্রয়োজনে বাধ্য হয়ে ইট-পাথরের সঙ্গে ঈদের সময়টা পার করতে হচ্ছে। কারণ পেশায় আমি একজন গণমাধ্যমকর্মী, সাংবাদিক।
আমার বাড়ি প্রত্যন্ত হাতিয়া দ্বীপের নিভৃত এক গ্রামে। সাংবাদিকতায় উচ্চশিক্ষা নিতে ২০১৫ সালে গ্রামের মায়া ছেড়ে পাড়ি জমিয়েছিলাম রাজধানী ঢাকায়। ভর্তি হয়েছিলাম বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় স্টামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা বিভাগে। তখন ফেসবুকে লিখেছিলাম, 'জানি নিশ্চিত গন্তব্য, তবুও অনিশ্চিত পথচলা'। কারণ সাংবাদিকতা পেশায় যুক্ত হওয়ার উদ্দেশ্যে সাংবাদিকতায় পড়াশোনা শুরু করেছিলাম।
গণমাধ্যমের কাজ পাঠকদের সার্বক্ষণিক তথ্য সরবরাহ করা। তাই কাজের কোন বিরতি নেই। ঈদের সময় প্রিন্ট পত্রিকা প্রকাশিত না হলেও অনলাইন ভার্সন ঠিকই সচল থাকে। তবে গণমাধ্যম কর্মীরা আগে-পরে শিডিউল করে ছুটি কাটিয়ে থাকে। অফিস থেকে বলা হয়েছিল, এক ঈদ ছুটি কাটালে, অন্য ঈদ কাটানো যাবে না। আমি রমজানের ঈদে বাড়ি গিয়েছি, তাই কোরবানির ঈদে থাকতে হবে ঢাকায়।
বিট ভিত্তিক সাংবাদিকতায় আমার কাজের ক্ষেত্র সিটি করপোরেশন ও কৃষি সেক্টর। সিটি করপোরেশনের সঙ্গে কোরবানির ঈদের অনেক বিষয় জড়িয়ে রয়েছে। যেমন- পশুর হাট, পশু কোরবানির জন্য স্থান নির্ধারণ, ঈদের জামাত আয়োজন, পশুর চামড়া বিক্রির হালচাল, কোরবানি শেষে পশু বর্জ্য অপসারণ। এসব বিষয় সম্পর্কে সর্বশেষ তথ্য অনলাইনে সরবরাহ করাই মূল কাজ হয়ে থাকে। তবে অফিসের শেষ মুহূর্তের সিদ্ধান্তে এবার ঈদের ডিউটি পালন করতে হয়নি। এদিকে মাত্র তিনদিনের ছুটি আর হাতিয়া দ্বীপ দুর্গম অঞ্চল হওয়ায় যাতায়াত বিড়ম্বনার কথা ভেবে আর বাড়ি যাওয়া হয়নি।
ঈদের দিনের পুরো সময়ই মন পড়েছিল গ্রামে। চোখের সামনে ভাসছে কেবল শৈশবের সোনালী স্মৃতি। ঈদের আগে দলবেঁধে কোরবানির গরু দেখতাম। বাবা সাধারণত অন্য শরিকদের সঙ্গে ভাগাভাগি করে গরু কোরবানি দেয়। এছাড়া আলাদা করে ছাগল দিয়েও কোরবানি করেন। শৈশবে কোরবানির জন্য আনা ছাগলকে কাঁঠাল পাতা খাওয়ানো দায়িত্ব পড়তো আমার ওপর। তবে ঢাকায় এসে আর কোন ছাগলকে কাঁঠাল পাতা খাওয়ানোর সুযোগ পাইনি।
হাসপাতাল ও কর্মস্থলে কেটেছে ঈদ
আবু বকর সিদ্দিক, গণমাধ্যমকর্মী নিউজ ২৪
ঈদের সময় পরিবার-পরিজন ছেড়ে অফিস করাটা কষ্টদায়ক মনে হলেও সমাজের প্রতি গণমাধ্যম কর্মীদের দায়বদ্ধতার জায়গা থেকে সেটা মেনে নেওয়ার চেষ্টা করে থাকি। তবে, এবারের ঈদটা একটু ভিন্নভাবেই কেটেছে। বাবার অসুস্থতার কারণে হাসপাতাল-অফিসসহ সবকিছু ম্যানেজ করেই ঈদ পার করলাম। কিছুটা খারাপ লাগলেও হাসপাতালে পরিবারের সব সদস্য এবং অফিসের কলিগদের সঙ্গে ঈদের দিনটা কাটিয়েছি।
সকালে ঈদের নামাজ পড়ে সরাসরি চলে যাই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে। সেখানে গত এক সপ্তাহ ধরে আব্বা অসুস্থ হয়ে চিকিৎসা নিচ্ছেন। আম্মা ও আমাদের ৫ ভাই হাসপাতালে আব্বার পাশে বসে ঈদ কাটিয়েছি। হাসপাতাল থেকে বিকেলে চলে যাই নিউজ ২৪ অর্থাৎ আমার কর্মক্ষেত্রে। সেখানে অফিস থেকে সরবরাহ করা খাবার খেয়ে নিজের ডেস্কে বসি।তারপর একে একে স্টোরি সম্পাদনা করা, ভয়েস দেওয়াসহ আরও একাধিক কাজ করতে হয়।
পরিবার ছাড়া প্রথমবার ঈদ
কেএম হিমেল আহমেদ, এখন টিভি
ঢাকার পিচ পাথরের রাস্তা এখন নিবর। সারাদেশে চলছে ঈদুল আজহার আমেজ। পরিবার ছাড়া এবারই প্রথম ঈদ করলাম রাজধানী শহরে। এ নিয়ে রাত থেকে একদিকে মন খারাপ ছিল, অন্যদিকে চাকরির পর প্রথমবার কর্মস্থলে ঈদ ছিল এ নিয়ে উত্তেজনা কাজ করছিল।
সকালে ঘুম থেকে উঠে মায়ের হাতের পায়েসের কথা খুব মনে পড়েছে।মনে পড়েছে গ্রামে দল বেধে ঈদের জামায়াত পড়তে যাওয়া। এখানে ব্যাচেলর জীবন ঈদের সকাল শুরু হয়েছে অন্যদিনের মতো করে।মোড়ের দোকানে চা খেয়ে অফিসের উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম।
এরপর অন্য দিনের মতোই সকালে অফিসে পৌঁছাই। অফিস থেকে বের হই খবরের খোঁজে। এই দিনও কর্মব্যস্ত আমার অফিস। দেশবাসীর কাছে খবর পৌঁছে দেয়ায় ঈদ আনন্দ খুঁজে পেতে চেষ্টা করি।এসাইনমেন্ট কাভার করতে একাধিক জায়গায় যেতে হয়।অফিসের গাড়ি সঙ্গে ছিল তাই কিছুটা সুবিধা হয়েছে।এসাইনমেন্ট শেষ করে অফিসে ফিরি এরপর বাসায়।
সারাদিন পরিবারের কথা মনে পড়লেও সহকর্মীদের সাথে হাসি ঠাট্টা আনন্দে মেতে ছিলাম। ঈদে রাজধানী ছেড়েছে প্রায় কোটি মানুষ। বন্ধ সব অফিস-আদালত। আর কাজ নিয়ে ব্যাস্ত ঢাকায় গণমাধ্যম কমীরা। উৎসবের এই সময় সবাই ছুটি পেলেও কয়েকটি পেশায় এ সুযোগটি অনেকটাই সীমিত যার একটি হলো সাংবাদিকতা।মানুষের জন্য কাজ করতে পেরে নিজের বিবেকের জায়গা থেকে আনন্দ লাগছে। মানুষকে বস্তুনিষ্ঠ খবর জানাতে ত্যাগ স্বীকার করতে হয় আমাদের। এটা হাসি মুখে নিতেও আনন্দ উপভোগ করি।
আবু সাইদ জনি
গণমাধ্যমকর্মী, চ্যানেল ২৪
ঈদ মানেই আনন্দ, ঈদ মানেই খুশি। তবে এবারের ঈদ আমার কাছে একেবারেই ভিন্ন। বন্ধু-বান্ধব, পরিবার-পরিজন ছাড়া এই প্রথম কর্মস্থলে ঈদ করলাম। কর্মব্যস্ততায় অনেক বন্ধু-বান্ধব আমাদের থেকে দূরে থাকে। কেবল দুই ঈদে সবাই বাড়িতে আসে। সবাই একসঙ্গে ঈদগাহে গিয়ে নামাজ পড়তাম। একসঙ্গে সবাই মিলে কুরবানীর পশু কাটতাম। বিকেল বেলা সবাই মিলে ঘুরতে যেতাম। কত আনন্দ করতাম সবাই মিলে। আজ তা চোখের সামনে ভেসে উঠছে। মনে হচ্ছে কত-শত মায়া আর মমতা থেকে বঞ্চিত হলাম।
ঈদের দিন ভোরে ফজরের নামাজের জন্য মা ডেকে দিত। মা সেমাই রান্না করতো। গোসল করে পরিবারের সবাই মিলে নাস্তা করে বের হতাম ঈদের নামাজে যাওয়ার জন্য।
এদিকে প্রথমবারের মতো স্ত্রী-সন্তান রেখে ঢাকায় ঈদ করলাম। মেয়েটার জন্মের পর এটাই প্রথম ঈদ।অথচ আমি তার থেকে কয়েক শত কিলোমিটার দূরে। মেয়ে যখন বড় হবে তখন যদি প্রশ্ন করে, বাবা আমার প্রথম ঈদ তোমাকে ছাড়া কেন করতে হল?তখন আমি কি উত্তর দেব চিন্তা করে খুজে পাই না।নাকি মেয়ে বুঝে নেবে তার বাবার পেশাটা এমনি। মা-বাবা, আত্মীয়-স্বজনের কথাও খুব মনে পড়ছে। পরিবার ছাড়া ঈদ উদযাপন কত যে কষ্টের তা বলে বা লিখে শেষ করা যাবে না।
তবে কষ্টের সঙ্গে রয়েছে স্বস্তি। এটা মানতেই হবে। কর্মস্থলও যে পরিবার হতে পারে এটাও আমাদের মানতে হবে। এই যে সেই কষ্ট অনেকটা লাঘব করেছে সহকর্মীরা। সকালে অফিসে এসে সবাই যেন এক উৎফুল্ল মেজাজে কুশলাদি বিনিময় করলেন। ফিরে ফেলাম স্বস্তি। সবাই মিলে ঈদের নামাজ জামায়াতের সঙ্গে আদায় করলাম। তারপর একসঙ্গে সকালের নাস্তা করে কাজে ফিরে এলাম। এর ফাঁকে সবাই মিলে সেলফি তুললাম। এভাবে সারাদিন সবাই খুব ভালোভাবে দিনটা পার করলাম। এভাবে কেটে গেল আমাদের আনন্দের ঈদ।