বগুড়ায় ঈদের দিন রাতে দুই তরুণকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে। এ ছাড়া একই ঘটনায় গুলিবিদ্ধ হয়েছেন নিহত দুই তরুণের আরেক বন্ধু। গত সোমবার রাত দেড়টার দিকে শহরের নিশিন্দারা চকরপাড়া এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। স্থানীয় এক আওয়ামী লীগ নেতার গাড়ির সঙ্গে নিহত এক তরুণের মোটরসাইকেলের ধাক্কা লাগাকে কেন্দ্র করে এ হামলার ঘটনা ঘটে বলে জানা গেছে।
এদিকে কক্সবাজারের রামুতে নিজেদের বাড়িতে ঘুমন্ত স্বামী-স্ত্রীকে গলা কেটে হত্যা করেছে দুর্বৃত্তরা। ঈদগড় ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের ওপরের খিল এলাকায় গত মঙ্গলবার রাত থেকে বুধবার ভোরের কোনো একসময় এ ঘটনা ঘটে। এ ছাড়া গত রবিবার সন্ধ্যা থেকে গতকাল বুধবার সকাল পর্যন্ত সময়ে দেশের বিভিন্ন জায়গায় এক স্কুলছাত্রসহ আরও তিনজনকে হত্যার খবর পাওয়া গেছে। এর মধ্যে কুষ্টিয়া সদরে জমির সীমানা নিয়ে বিরোধে ভাতিজার বঁটির কোপে চাচা বাদশা আলী (৫০), ময়মনসিংহের নান্দাইলে জমির বিরোধে ধারালো অস্ত্রের আঘাতে লাল মিয়া (২৫) নামে এক যুবক এবং গোপালগঞ্জের কাশিয়ানীতে বন্ধুদের হাতে আপন শেখ (১৫) নামে এক স্কুলছাত্র নিহত হয়েছে।
বগুড়ায় নিহত দুজন হলেন নিশিন্দারা চকরপাড়া এলাকার মোহাম্মদ শরীফ (১৮) ও মোহাম্মদ রোমান (১৬)। তাদের মধ্যে শরীফ পেশায় এলপি গ্যাসের ব্যবসায়ী এবং রোমান শহরের সাতমাথায় ফুটপাতে ভ্যানে করে কাপড়ের ব্যবসা করতেন।
নিহতের স্বজনদের অভিযোগ, এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় সৈয়দ সার্জিল আহম্মেদ জড়িত। তিনি বগুড়া শহরের ১ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক এবং বগুড়া জেলা পরিষদের সদস্য ও প্যানেল চেয়ারম্যান। ঈদের দিন বিকেলে হাকিরমোড় এলাকায় সৈয়দ সার্জিল আহমেদ টিপুর গাড়ির সঙ্গে রুমনের মোটরসাইকেলের ধাক্কা লাগে। এ সময় টিপু ও তার লোকজনের সঙ্গে শরীফ ও রুমনের কথা-কাটাকাটি ও ধাক্কাধাক্কি হয়। তখন টিপুর লোকজন শরীফ ও রুমনকে দেখে নেওয়ার হুমকি দিয়ে চলে যান।
এলাকাবাসী জানায়, রাতে ঘটনাস্থলে গোলাগুলির আওয়াজ শুনে বাইরে এসে শরীফ ও রোমানকে রক্তাক্ত অবস্থায় দেখতে পান তারা। পাশেই তাদের আরেক বন্ধু আজমির হোসেন গুলিবিদ্ধ হয়ে গোঙাচ্ছিলেন।
নিহতদের স্বজনদের অভিযোগ, শহরের নিশিন্দারা রাস্তা সংস্কারকাজ চলছিল। ঈদের দিন বিকেলে নিশিন্দারা সড়কের পাশে জেলা পরিষদের সদস্য সৈয়দ সার্জিল আহম্মেদের গাড়ি দাঁড় করানো ছিল। এ সময় রোমান মোটরসাইকেলে চকরপাড়ায় ফিরছিলেন। যাতায়াতের পথ বন্ধ করে প্রাইভেট কার সড়কের পাশে রাখা নিয়ে রোমানের সঙ্গে সার্জিলের গাড়িচালকের বিতণ্ডা হয়। এর জেরে রাত সাড়ে ১২টার দিকে মোটরশ্রমিক নেতা সৈয়দ কবির আহম্মেদ, তার ভাই সৈয়দ সার্জিল আহম্মেদ, সার্জিলের ভায়রা ১ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর ও জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক সভাপতি শাহ মেহেদী হাসানের নেতৃত্বে ১৫ থেকে ২০ জন সশস্ত্র ব্যক্তি চকরপাড়ায় আসে। তারা প্রথমে রোমানকে খুঁজতে থাকে। এমন পরিস্থিতিতে রোমান মোবাইল ফোনে কল করে শরীফকে ডেকে নেয়। পরে দুপক্ষের মধ্যে বাগ্বিতণ্ডার একপর্যায়ে রোমানকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। প্রতিবাদ করলে শরীফকেও কুপিয়ে হত্যা করা হয়। এরপর ১০ থেকে ১২ রাউন্ড গুলি ছুড়ে ঘটনাস্থল ছেড়ে যায় হামলাকারীরা। গুলিতে হোসেন নামে শরীফের আরেক বন্ধু আহত হন।
এ ঘটনায় মঙ্গলবার রাতে সদর থানায় ১৩ জনের নাম উল্লেখসহ ২৮ জনের বিরুদ্ধে নিহত শরীফের মা হেনা বেগম বাদী হয়ে মামলা করেছেন। এই হত্যাকাণ্ডে জড়িত অভিযোগে তিনজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
থানায় করা মামলার এজাহারে গুলিবিদ্ধ হোসেনের বরাতে বলা হয়েছে, সোমবার বিকেলের ঘটনাটি মীমাংসার কথা বলে হতাহতদের ডেকে নেয় হামলাকারীরা।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা সদর থানার পরিদর্শক (তদন্ত) শাহিনুজ্জামান জানান, মামলার অন্য আসামিদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে।
কক্সবাজারের রামুতে নিহতরা হলেন উপরেরখিল গ্রামের কামাল হোসেনের মেয়ে রুবি আক্তার (১৯) ও তার স্বামী চট্টগ্রামের রাউজানের নুর মোহাম্মদ (২৮)। এলাকাবাসীর ভাষ্য অনুযায়ী, বিয়ের আগে রুবির সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক ছিল পাশের চরপাড়া গ্রামের চিহ্নিত সন্ত্রাসী পরিবারের সদস্য রশিদ আহমদের ছেলে রমজানের। কিন্তু রুবির পরিবার দরিদ্র হওয়ায় ওই সম্পর্ক মেনে নেয়নি রমজানের বাবা-মা ও ভাইয়েরা। ওই প্রেমের সম্পর্কের কারণে রুবির বাবা-মাকে দুই দফা মারধর করে রমজানের পরিবার। শেষবার মারধর করে রুবিকে অন্য কোথাও বিয়ে দিয়ে দিতে বলে, নয়তো এলাকা ছাড়ার নির্দেশ দেয় রমজানের ভাই চিহ্নিত সন্ত্রাসী দেলোয়ার। তারই ধারাবাহিকতায় রাউজানের নুর মোহাম্মদের সঙ্গে রুবির বিয়ে হয়। কিন্তু রুবির বিয়ে হলেও থামেনি রমজানের বখাটেপনা। প্রায়ই সময় রুবির স্বামীকে মারধর করতে তেড়ে যেত রমজান ও তার সহযোগীরা। তারা এর আগে দুবার রুবির স্বামী নুরকে হত্যাচেষ্টা করলেও এলাকাবাসীর বাধার মুখে ফিরে যায়। এরই ধারাবাহিকতায় মঙ্গলবার রাতে প্রবল বৃষ্টির মধ্যে রুবিকে ধর্ষণ করে তাকে ও তার স্বামীকে গলা কেটে হত্যা করে রমজান ও তার সহযোগীরা। বিষয়টি আঁচ করতে পেরে এলাকাবাসী ধাওয়া করে রমজানের ভাই আনোয়ার ও মামুনকে ধরে পুলিশের হাতে তুলে দেয়। কিন্তু স্থানীয় চেয়ারম্যানের অনুসারী হিসেবে পরিচিত রমজানের ভাই দেলোয়ার ও বজল ডাকাত পুলিশ সদস্যদের লক্ষ্য করে গুলি চালিয়ে আনোয়ারকে ছিনিয়ে নেয়। পরে লোক মারফত পুলিশের হ্যান্ডকাফ ফেরত পাঠায়। নিহত রুবির মা আমিনা খাতুনও এই জোড়া হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে একই ধরনের বক্তব্য দেন।
এ বিষয়ে স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক সদস্য (মেম্বার) আবুল কাশেম টুলু বলেন, ‘রুবিদের পরিবার অত্যন্ত গরিব। রমজানের হাত থেকে মেয়েকে রক্ষা করতে আরেক গরিব ছেলেকে ঘরজামাই রেখে বিয়ে দেয়। কিন্তু রমজান ও তার পরিবার তাদের বাঁচতে দিল না।’
ঈদগড় ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ফিরোজ ভুট্টো বলেন, ‘এলাকাবাসী রমজানের ভাই আনোয়ারকে আটক করে পুলিশে দেয়। কিন্তু পুলিশের ওপর রমজানের স্বজনরা হামলা করে আনোয়ারকে ছিনিয়ে নিয়েছে বলে এলাকাবাসীর কাছ থেকে জেনেছি।’
তবে রামু থানার ওসি আবু তাহের দেওয়ান পুলিশের হাত থেকে আনোয়ারকে ছিনিয়ে নেওয়ার কথা অস্বীকার করেন।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে কক্সবাজারের পুলিশ সুপার মাহাফুজুল ইসলাম বলেন, ‘প্রেমিকার অন্যত্র বিয়ে হওয়ায় প্রতিশোধপরায়ণ প্রেমিক দুজনকে খুন করেছে বলে আমরা প্রাথমিকভাবে জানতে পেরেছি। আর আসামি ছিনিয়ে নেওয়ার বিষয়টি আমার জানা নেই। তবে খোঁজখবর নিচ্ছি।’
কুষ্টিয়ায় বাড়ির জায়গার সীমানা নিয়ে দ্বন্দ্বের জেরে ভাতিজার বঁটির কোপে চাচা বাদশা আলী (৫০) নিহত হয়েছেন। গত রবিবার সন্ধ্যায় সদর উপজেলার হাটশ হরিপুর গ্রামের আমজাদ মোড় এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। ঘটনার পর থেকে এই হত্যাকাণ্ডে জড়িত বলে অভিযোগ ওঠা ভাতিজা মাসুদ (৪০) পলাতক বলে জানিয়েছে পুলিশ।
ময়মনসিংহের নান্দাইলের খারুয়া ইউনিয়নের মাটিকাটা গ্রামে গতকাল সকালে জমি নিয়ে বিরোধের জেরে লাল মিয়া নামে এক যুবক খুন হন। জানা গেছে, লাল মিয়া ও তার বাবা সিরাজ উদ্দীন সকালে বাড়ির পাশে নিজেদের জমিতে ধানের বীজতলা তৈরির কাজ করছিলেন। এ সময় সিরাজ উদ্দীনের ভাই গিয়াসউদ্দিন ও তার ছেলে হাফেজ মিজান জমির আইল বেশি কেটে ফেলার অভিযোগ তুলে লাল মিয়া ও তার বাবার কাজে বাধা দেন। এ নিয়ে দুপক্ষের মধ্যে কথা-কাটাকাটির একপর্যায়ে হাফেজ মিজানের ধারালো অস্ত্রের আঘাতে লাল মিয়া নিহত হন।
গোপালগঞ্জের কাশিয়ানীতে বন্ধুদের বিরুদ্ধে স্কুলছাত্র আপন শেখকে হত্যার অভিযোগ উঠেছে। সে কাশিয়ানীর বাঘঝাপা গ্রামের তুহিন শেখের ছেলে এবং কাশিয়ানী পাইলট হাইস্কুলের নবম শ্রেণির ছাত্র ছিল। এ ঘটনায় জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পুলিশ আপনের চার বন্ধুকে আটক করেছে। জানা গেছে, মঙ্গলবার রাত ৮টার দিকে আপন শেখকে তার বন্ধুরা বাড়ি থেকে ডেকে নিয়ে যায়। তারা রেলব্রিজের ওপর বসে গল্প করে। কিছুক্ষণ পরে দুই বন্ধু সেতুটির নিচ থেকে আহত অবস্থায় উদ্ধার করে কাশিয়ানী ১০০ শয্যা হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসক আপনকে মৃত ঘোষণা করেন।
সংশ্লিষ্ট জেলা-উপজেলার প্রতিনিধিদের পাঠানো তথ্যে প্রতিবেদনটি তৈরি
