মূল্যস্ফীতি কমানোর লক্ষ্যকে প্রাধান্য দিয়ে এবারও ২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রথম ষাণ¥াসিকে (জুলাই-ডিসেম্বর) জন্য মুদ্রানীতি ঘোষণা করতে যাচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক। নতুন মুদ্রানীতিতে অর্থের সরবরাহ কমাতে সুদের হার বৃদ্ধির ইঙ্গিত মিলেছে। আর ক্রলিং পেগের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত ডলার ব্যবস্থা শতভাগ বাজারের ওপরে ছেড়ে দেওয়ার ঘোষণা আসতে পারে বলে জানিয়েছেন মুদ্রানিতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একাধিক কর্মকর্তা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, রিজার্ভ ইস্যুতে বাংলাদেশ ব্যাংক উদ্বিগ্ন। অনেকে পদক্ষেপের পরেও ডলারের সরবরাহ স্বাভাবিক হয়নি। এজন্য ডলারের রেট বাজারের ওপর ছেড়ে না দেওয়াটাকে দায়ী করে তা পুরোপুরি বাজারের ওপর ছেড়ে দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। আর ক্রলিং পেগের মাধ্যমে টাকার বিপরীতে ডলারের দর এক দিনে ৭ টাকা বৃদ্ধি করে ১১০ টাকা ১১৭ টাকা করায় ডলার নিয়ে দুই-এক দিন হাউকাউ সৃষ্টি হলেও পরবর্তী সময়ে তা অনেকটাই স্থির হয়ে পড়ে। ব্যাংকগুলোতে আমদানি বিল পরিশোধ নিয়ে আগের মতো ঝামেলার অভিযোগ নেই। কার্ব মার্কেটেও (খোলাবাজার) ব্যাংক রেটের কাছাকাছি ডলার পাওয়া যাচ্ছে। আগের ১২৯ বা ১৩০ টাকা পর্যন্ত ডলারের দাম ওঠার খবর হয়েছে। সম্প্রতি তা কমে এসেছে। আবার আইএমএফের তৃতীয় কিস্তির ১ দশমিক ১৫ বিলিয়ন ডলারের ঋণ যোগ হচ্ছে। আর জুন মাসে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ডলার বিক্রি বন্ধ রেখেছে। এমনকি সোয়াপের মাধ্যমেও ডলার সংগ্রহ করছে না কেন্দ্রীয় ব্যাংক। সার্বিকভাবে ডলার পরিস্থিতি অনেকটা স্বাভাবিক বলা যায়। আর বাজারের ওপর ডলারের রেট ছেড়ে দিতে গভর্নর প্রাথমিকভাবে একমত হয়েছেন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘দেশের বিদ্যমান অর্থনৈতিক কাঠামোতে মুদ্রানীতির সংখ্যাগত কিছু পরিবর্তন-পরিমার্জন করা হয়। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণসহ অর্থনৈতিক অন্য সংকটগুলো কাটিয়ে উঠতে হলে সুশাসন ও সংস্কার লাগবে। বিশেষ করে ব্যাংক খাতের ওপর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কার্যকর সুপারভিশন দরকার। করপোরেট সুশাসনের বিষয়ে সুস্পষ্ট বার্তা না থাকলে মুদ্রানীতি প্রণয়ন কিংবা ঘোষণা দিয়ে কোনো কাজ হবে না।’
বাংলাদেশ ব্যাংকে অপর একজন কর্মকর্তা জানান, বর্তমানে গভর্নর ফ্রান্স রয়েছেন। আর মনিটরি কমিটির একজন সদস্য রবিবার রাতে চার দিনের জন্য চীনে গেছেন। এজন্য আগামী ৭ জুলাই থেকে মুদ্রানীতি নিয়ে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে বৈঠক হবে। ১১ তারিখে মুদ্রানীতি সংক্রান্ত কমিটির চূড়ান্ত বৈঠক হবে। সেখান থেকে গভর্নরের কাছে একটি তারিখ চাইবে কমিটি। তবে সবকিছু স্বাভাবিক থাকলে ১৪ বা ১৫ জুলাই মুদ্রানীনিতি ঘোষণা করা হবে। তবে সেই তারিখ ১৭ জুলাই পার করার সুযোগ নেই।
জানা গেছে, বাংলাদেশ ব্যাংক ২০২৪-২৫ অর্থবছরের জুলাই-ডিসেম্বর সময়ে চাহিদা কমাতে ও দাম নিয়ন্ত্রণে সংকোচনমূলক নীতি ধরে রাখতে বদ্ধপরিকর। যদিও গত তিনবছর ধরে সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি দিয়ে মূল্যস্ফীতি কমাতে ব্যর্থ। তবুও যেন একেবারে লাগামছাড়া না হয় সেজন্য টাকার প্রবাহ কমাতে কাজ করে যাচ্ছে। তবে কিছু নন-ইকোনমিক ফ্যাক্টর (হুন্ডি, সিন্ডিকেট, ফটকাকারবারি) নিয়ন্ত্রণে এবারেও সুপারিশ করা হবে। আর বাজেটে ঘোষিত মূল্যস্ফীতি সমন্বয় করা হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর ও সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. হাবিবুর রহমান বলেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রধান কাজ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখা। আর এ মুহূর্তে আমাদের প্রধান চ্যালেঞ্জ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনা। লক্ষ্য বাস্তবায়নে সংকুলানমুখী মুদ্রানীতিই প্রণয়ন করা হচ্ছে। সেক্ষেত্রে ডলারের দাম এবং সুদের হার নির্ধারণে চুলচেরা বিশ্লেষণ করা হবে। সবকিছু ঠিক থাকলে মধ্য জুলাইতে মুদ্রানীতি ঘোষণা করা হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুদ্রানীতি বিশ্লেষণে জানা গেছে, তিন বছর ধরে দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির সবচেয়ে বড় সংকট হয়ে দেখা দিয়েছে উচ্চ মূল্যস্ফীতি। জ্বালানি তেলসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপে নাজেহাল সাধারণ মানুষ।
